তরুণ তেজপাল কাণ্ড: বেকসুর খালাস থেকে দোষী সাব্যস্ত, কী কী ঘটেছে এই ১৩ বছরে?
Tarun Tejpal Case Timeline: তরুণ তেজপালের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে কী অভিযোগ উঠেছিল? গোয়ার সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কীভাবে শুরু হয়েছিল দীর্ঘ আইনি লড়াই? কেন ২০২১ সালে নিম্ন আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস করেছিল? ২০২৬ সালে বম্বে হাইকোর্ট কোন যুক্তিতে সেই রায় বদলে তেজপালকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিল? এই তেরো বছরে মামলায় কী কী ঘটেছিল?
তেরো বছর আগে গোয়ার একটি ফাইভস্টার হোটেলের লিফটে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। অভিযুক্ত ছিলেন দেশের অন্যতম পরিচিত সাংবাদিক ও ‘তেহেলকা’-র প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক তরুণ তেজপাল। অভিযোগ করেছিলেন তাঁরই এক তরুণ সহকর্মী। ২০১৩ সালের সেই অভিযোগের পর মামলা গড়িয়েছে থানা থেকে আদালতে, নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্টে। মাঝখানে এসেছে গ্রেফতার, জামিন, দীর্ঘ তদন্ত, চার্জশিট, কয়েক বছরের বিচারপ্রক্রিয়া, কোভিডের কারণে স্থগিতাদেশ, ২০২১ সালে নিম্ন আদালতের বেকসুর খালাস এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালে বম্বে হাইকোর্টের রায়। ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিণতি এল প্রায় তেরো বছর পরে। ঠিক কী ছিল?
২০১৩ সালের নভেম্বরে গোয়ায় ‘তেহেলকা’-র আয়োজিত THiNK Fest চলছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। সেই অনুষ্ঠানের সময় তেহেলকার এক তরুণী সাংবাদিক অভিযোগ করেন, তরুণ তেজপাল তাঁকে গোয়ার একটি ফাইভস্টার হোটেলের লিফটে যৌন নির্যাতন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ৭ এবং ৮ নভেম্বর, পরপর দু’দিন লিফটের ভিতরে তাঁর সঙ্গে এই ঘটনা ঘটে। সেই সময় তরুণী সাংবাদিকটি তেজপালের অধীনে কাজ করতেন। কর্মক্ষেত্রে তেজপাল ছিলেন তাঁর সিনিয়র। ২০২৬ সালের বম্বে হাইকোর্টও তেজপাল ও ওই তরুণীর মধ্যে ক্ষমতার পার্থক্যকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখেছে।
ঘটনার কয়েক দিন পর বিষয়টি প্রথমে প্রকাশ্যে পুলিশের কাছে নয়, তেহলকার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার কাছে আসে। ওই তরুণী সংস্থার কর্তৃপক্ষকে ই-মেল করে অভিযোগ জানান। সেই ই-মেল পরে প্রকাশ্যে চলে আসে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। অভিযোগ সামনে আসার পর তেজপাল নিজেও একটি ই-মেলে নিজের আচরণকে ‘bad lapse of judgement’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং কিছু সময়ের জন্য সম্পাদকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানান। পরে তাঁর পাঠানো ক্ষমাপ্রার্থনামূলক ই-মেলগুলিও মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।
এরপর বিষয়টি আর শুধু সংবাদমাধ্যমটির অভ্যন্তরীণ অভিযোগের মধ্যে থাকেনি। গোয়া পুলিশ এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে। ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর, তেজপালকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পর এই গ্রেফতার হয়। কয়েক মাস জেলে থাকার পর ২০১৪ সালের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে জামিন দেয়।
তদন্তও ছিল দীর্ঘ। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গোয়া পুলিশ প্রায় ২,৮৪৬ পাতার চার্জশিট জমা দেয়। সেখানে ১৫২ জন সাক্ষীর বক্তব্য ছিল। পরে আরও সাক্ষীকে যুক্ত করার চেষ্টা হয়। মামলার বিচারও দ্রুত শেষ হয়নি। ২০১৭ সালে আদালত তেজপালের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে। ২০১৮ সালে অভিযোগকারিণীর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট তেজপালের এফআইআর বাতিল করার আবেদন খারিজ করে নিম্ন আদালতকে দ্রুত বিচার শেষ করার নির্দেশ দেয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Park Street Gangrape Case: ভিড়ের ঝাঁকে মিশে থাকা সুপার কনফিডেন্ট পুরুষটি কখন সুপার অ্যাকটিভ হয়ে উঠতে পারে সে কথা হাড়ে মজ্জায় জেনেছিলেন সুজেট জর্ডন।
কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি অপেক্ষা। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় থমকে যায়। সুপ্রিম কোর্ট পরে নিম্ন আদালতকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশ দেয়। অবশেষে ২০২১ সালের মার্চে যুক্তিতর্ক শেষ হয়। কিন্তু রায় ঘোষণার তারিখ বারবার পিছোয়। কখনও কর্মী-সংকট, কখনও গোয়ার ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট—বিভিন্ন কারণে রায় পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের ২১ মে গোয়ার সেশনস কোর্ট তেজপালকে সমস্ত অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস করে।
এই খালাসের রায়ই পরবর্তী পাঁচ বছরের আইনি লড়াইয়ের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২১ সালের ৫২৭ পাতার রায়ে নিম্ন আদালত অভিযোগকারিণীর বক্তব্যের বিভিন্ন অসঙ্গতি, তাঁর আচরণ, ঘটনার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া, মেডিক্যাল প্রমাণের অভাব এবং সিসিটিভি ফুটেজের ব্যাখ্যার উপর জোর দিয়েছিল। আদালতের মতে, অভিযোগ প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত corroborative evidence ছিল না।
কিন্তু এই রায় নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে অভিযোগকারিণীর ব্যক্তিগত জীবন এবং ঘটনার পর তাঁর আচরণকে যেভাবে বিচার করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে গোয়া সরকার ওই খালাসের বিরুদ্ধে বম্বে হাইকোর্টের গোয়া বেঞ্চে আবেদন করে। সেখানেই মামলাটি আবার নতুন মোড় নেয়।
২০২৬ সালে বম্বে হাইকোর্টে যখন মামলার শুনানি শুরু হয়, তখন মূল প্রশ্ন ছিল, নিম্ন আদালত কি প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন করেছিল? অভিযোগকারিণীর বক্তব্যের অসঙ্গতিগুলিকে কি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল? যৌন নির্যাতনের শিকার একজন নারীকে একটি নির্দিষ্ট ‘আদর্শ আচরণ’-এর কাঠামোর মধ্যে বিচার করা যায়?
২০২৬ সালের জুন-জুলাইয়ে শুনানি চলাকালীন গোয়া সরকার যুক্তি দেয়, নিম্ন আদালতের রায় ছিল গুরুতরভাবে ভুল। সরকার পক্ষ অভিযোগ করে, বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযোগকারিণীকেই কার্যত কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল। অন্যদিকে তেজপালের আইনজীবীরা অভিযোগকারিণীর বক্তব্যের অসঙ্গতি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণের উপর জোর দিয়ে তাঁর বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Aruna Shanbaug Rape Case: হাসপাতালের তৎকালীন ডিন, ডঃ দেশপান্ডে ওই জুনিয়র ডাক্তারকে বাঁচতে 'পায়ুপথে ধর্ষণ' বা সোডোমি-র বিষয়টি উল্লেখ করেননি।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট বম্বে হাইকোর্টের গোয়া বেঞ্চ ২০২১ সালের খালাসের রায় বাতিল করে তেজপালকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পাশাপাশি মোট ১০.১ লক্ষ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়, যা অভিযোগকারিণীকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্টের রায়ে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, আদালত অভিযোগকারিণীর সাক্ষ্যকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেছে। দীর্ঘ জেরা সত্ত্বেও তাঁর বক্তব্যের মূল কথা বদলায়নি। আদালতের হিসাবে, তাঁকে প্রায় ১,০০০ পৃষ্ঠা জেরা করা হয়েছিল এবং ১৮টি শুনানিতে তাঁর সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে আরও কয়েকজন সাক্ষীর বক্তব্যের মিলও আদালত বিবেচনায় নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তেজপালের পাঠানো ক্ষমাপ্রার্থনামূলক ই-মেল আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উঠে আসে। তেজপালের আইনজীবীদের বক্তব্য ছিল, চাপের মুখে ওই ই-মেল লেখা হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। আদালতের মতে, ই-মেলগুলির বিষয়বস্তু অভিযোগকারিণীর বক্তব্যের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তৃতীয়ত, হোটেলের লিফটের ভিতরে কী ঘটেছিল, তার সরাসরি সিসিটিভি ফুটেজ ছিল না। কিন্তু লিফটের বাইরের ক্যামেরার ফুটেজ আদালত বিবেচনা করে। সেই ফুটেজে তেজপালকে অভিযোগকারিণীর হাত ধরে লিফটের দিকে নিয়ে যেতে এবং কিছু সময় পরে দু’জনকে আবার বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। হাইকোর্ট মনে করেছে, এই ফুটেজ ঘটনার সময়কাল ও পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোগকারিণীর বক্তব্যকে সমর্থন করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ‘আদর্শ ভিকটিম’ বা ‘ideal victim’ ধারণা নিয়ে। ২০২১ সালের নিম্ন আদালত অভিযোগকারিণীর আচরণ এবং ঘটনার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিল, ২০২৬ সালের হাইকোর্ট তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। হাইকোর্টের বক্তব্য, যৌন নির্যাতনের শিকার প্রত্যেক নারী একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন—এমন কোনো আইনি নিয়ম নেই। কেউ সঙ্গে সঙ্গে কাঁদতে পারেন, কেউ চুপ হয়ে যেতে পারেন, কেউ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে পারেন। সেই আচরণ দিয়ে অভিযোগের সত্যতা বিচার করা যায় না।
আদালত আরও বলেছে, অভিযোগকারিণীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা যৌন ইতিহাসকে এমনভাবে ব্যবহার করা যায় না যাতে তাঁকেই অপমানিত বা অভিযুক্তের মতো অবস্থায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। হাইকোর্টের মতে, আগের বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁকে যেভাবে জেরা করা হয়েছিল, তা ছিল কিছুটা অপ্রয়োজনীয়ভাবে আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক।
তেজপাল শুধু অভিযোগকারিণীর সম্পাদক বা কর্মক্ষেত্রের ঊর্ধ্বতন ছিলেন না, তিনি তাঁর পেশাগত মেন্টরও ছিলেন এবং তাঁর বাবার পরিচিত ও বন্ধু ছিলেন। তাই হাইকোর্ট মনে করেছে, তেজপালের সঙ্গে ওই তরুণীর সম্পর্কে ক্ষমতার পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই কারণেই আদালত ঘটনাটিকে সাধারণ যৌন অপরাধের চেয়ে গুরুতর হিসেবে দেখেছে।
তবে ২০২৬ সালের রায়ের পরেও আইনি লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। তেজপাল নিজেকে নির্দোষ বলেই দাবি করছেন এবং হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। হাইকোর্ট তাঁকে আত্মসমর্পণের জন্য চার সপ্তাহ সময় দিয়েছে। অর্থাৎ, উচ্চতর আদালতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের সুযোগ এখনও রয়েছে।








