খাবার-খেলনা আর সাহস নিয়েই সহ-নাগরিকদের পাশে তেল আভিভ

Israel-Gaza War: ওই একটা হামলার ঘটনা সেসবকে দূরে সরিয়ে মানুষকে কাছে এনেছে। হামলায় ঘর হারিয়েছেন যাঁরা, যাঁরা স্বজনবান্ধব হারিয়ে রাস্তায়, তাঁদের কাছে সাহায্য় পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষ।

Sohini Das
৩ মিনিট
খাবার-খেলনা আর সাহস নিয়েই সহ-নাগরিকদের পাশে তেল আভিভ

এক সপ্তাহ আগেই সব কিছু ছিল শান্ত, যেমনটা থাকে। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে উলট পালট হয়ে গিয়েছে সবটা। শহরের যে রাস্তাগুলোয় আগে বইত প্রাণের স্রোত, সেসব এখন শ্মশান। গত ৭ অক্টোবর দিনটা পাল্টে দিয়েছে সব কিছু। সকাল হতে না হতেই প্যালেস্টাইনের দিক থেকে ছুটে এসেছিল পাঁচ হাজার রকেট। আর তার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইজরায়েলের ভিতরে ঢুকে এসেছিল হাজার হাজার হামাস সেনা। গাজা সীমান্ত সংলগ্ন শহরগুলি সবচেয়ে আক্রান্ত হয়েছে। অজস্র বাসিন্দাকে অপহরণ করা হয়। অজস্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করে হামাস সেনা।

সেই ঘটনার পরে প্যালেস্টাইনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ যাওয়ার কথা ঘোষণা করে দেয় নেতানিয়াহু সরকার। তার পর থেকে গাজায় একের পর এক হামলা শানিয়েছে ইজরায়েল সরকার। হামাস সেনা দমনে শেষ পর্যন্ত যাওয়ার হুমকি দিয়েছে ইজরায়েল। ইতিমধ্যেই উত্তর গাজাকে জনশূন্য করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইজরায়েল সরকার।

কিন্তু এ যুদ্ধ কি চায় দু'দেশের সাধারণ মানুষ? দুদেশের এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বলি হয়েছে যাঁরা। ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় শহর তেল আবিব। যেখানে প্রচুর বিদেশি নাগরিকেরা থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দা তো বটেই। হামাস জঙ্গিদের নিশানায় ছিল এই শহরটিও। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বাস তেল আবিবে। সেদিনের ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে শহরে বহু বাসিন্দারই। ৭ অক্টোবরের ওই হামলার পরে পালিয়েওছেন বহু মানুষ। তার পরেও যাঁরা বেঁচে গিয়েছেন, তাঁরা হয়ে উঠেছেন যুদ্ধশান্তির দূত। তাঁরা তৈরি করেছেন স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দল। তারা খাবারদাবার, পোশাক নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন গাজা সীমান্তের কাছাকাছি। সেখানে হামাস আক্রান্ত বাসিন্দাদের দিকে তাঁরা বাড়িয়ে দিচ্ছেন সাহায্যের হাত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাসপাতাল থেকে আর কখনও ফিরবে বাবা? গাজায় পথ চেয়ে একরত্তি মেয়ে

Israel-Gaza War: গত সাত দিনে অন্তত পাঁচশো শিশুর মৃত্যু হয়েছে গাজায়। বাবা-মা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তাঁদের সন্তানকে চারপাশের পরিস্থিতি থেকে, অসংখ্য মৃত্যুমিছিলের অভিশাপ থেকে বাঁচানোর। কিন্তু তেমনটা ঘটছে না আদপেই।

৭ অক্টোবরের হামলায় ইজরায়েলে অন্তত ১৩০০ জন নিহত হয়েছেন। এদিকে গাজায় ইজরায়েলের একের পর এক হামলায় মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ১৮০০ ফিলিস্তিনির। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের কাছে অধিকৃত এলাকায় মৃত্যু হয়েছে ৪৬ জনের। রাজায় রাজায় যুদ্ধে উলুখাগড়ার মতো মরছেন অসংখ্য নিরপরাধ বাসিন্দা। অথচ এ যুদ্ধ কাঙ্ক্ষিত নয় তাঁদের কারওরই। অথচ প্রাণ গিয়েছে তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি।

৭ অক্টোবরের আগে তেল আভিভ শহরে রাজনীতি, নানাবিধ সামাজিক বিষয়আশয় নিয়ে বহু মতামত ছিল, ভাগাভাগিও ছিল। কিন্তু ওই একটা হামলার ঘটনা সেসবকে দূরে সরিয়ে মানুষকে কাছে এনেছে। এক করে তুলেছে। পরস্পরের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ওই দিনের হামলায় ঘর হারিয়েছেন যাঁরা, যাঁরা স্বজনবান্ধব হারিয়ে রাস্তায়, তাঁদের কাছে সাহায্য় পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষ। বহু গৃহহীনকে আশ্রয় দিয়েছে শহরের একাধিক হোটেল। শরণার্থীদের মুখে তুলে দিয়েছে একটু খাবার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২৪ ঘণ্টায় শহর খালি করার নির্দেশ! ইজরায়েল ঠিক কী করতে চলেছে গাজায়?

Israel Palestine Attack : ইজরায়েল বলছে, হামাস সেদেশের সাধারণ মানুষকে 'মানব ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করছে।

পেশায় মনোবিদ ইয়েল কাজ করতেন তেল আভিভের জাফা মিউসিপ্যালিটিতে। হামলার দিনে সর্বশান্ত হয়ে কোনওমতে ঠাঁই পেয়েছেন একটি হোটেলের বেসমেন্টে। তার পরেও চোট সারিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এগিয়ে এসেছেন তিনি। সেদিনের হামলায় ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের সুস্থ জীবনে ফেরারনোর চেষ্টা করে চলেছেন। একটু অনুষ্ঠান দেখতে জড়ো হয়েছিলেন মানুষ। সেখানে হামলা চালায় হামাস। অসংখ্য মারা যায়, জখম হন। আর যাঁরা বেঁচে গিয়েছেন তাঁদের তাড়া করছে শুধু আতঙ্ক। সেই আতঙ্কের পরিবেশ থেকে আক্রান্তদের বের করে আনার চেষ্টা করছেন ইয়েল।

সেদিনের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়ে দিয়েছে তাকেও। ফিরিয়ে দিয়েছে সেই হলোকাস্টের ভয়ঙ্কর স্মৃতি। ইয়েল জানিয়েছেন, নিজের শহরেই আর সুরক্ষিত বোধ করছেন না তাঁরা। এমন আগে কখনও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়নি তাঁদের। নিজের দেশ, নিজের দেশের সেনার উপর থেকে সমস্ত রকম বিশ্বাস, ভরসা উঠে গিয়েছে তাঁদের।

সমুদ্রের পাশেই ডাউনটাউন হোটেল, যা আজ হয়ে উঠেছে ত্রাণবিতরণের কেন্দ্র। সেখানেই চলছে কাউন্সিলিং সেশন, কোথাও বা চুল কেটে মনোবল ফেরানোর চেষ্টা চলছে আক্রান্তদের। হোটেলের কর্মীরা সব দিক দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। হোটেলের বলরুম থেকে শুরু করে কনফারেন্স রুম জুড়ে এখন মানুষের ভিড়। আর সেখানে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক। স্যান্ডুইচ, স্ন্যাকস, বাচ্চাদের জন্য খেলনা, জামাকাপড় এসব নিয়ে হাজির হচ্ছেন তেলআভিভ-সহ বেশ কয়েকটি শহরের বাসিন্দা। বহু রেস্তোরাঁ থেকে বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে খাবারদাবার।

শুধু ইজরায়েলের বাসিন্দাদের দিকেই নয়, গাজায় বিপদে পড়া মানুষগুলোর কাছেও অন্নবস্ত্রের সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন এই স্বেচ্ছাসেবকেরা। যুদ্ধ মানেই তো সাধারণ নিরাপরাধ মানুষের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি। দেশ জুড়ে খাদ্য-বাসস্থানের সঙ্কট। আর সেই সঙ্কটের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর সেই মন্ত্রকেই পাথেয় করেছে তেল আভিভের ওই সব মানুষেরা। রাষ্ট্র যুদ্ধ চায়, হানাহানি চায়। কিন্তু রাষ্ট্রের মানুষের মনের কথাটি যে আদতে কী, তা তাঁরা সাফ বুঝিয়ে দিচ্ছেন নিজের কাজের মাধ্যমে।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।