খাবার-খেলনা আর সাহস নিয়েই সহ-নাগরিকদের পাশে তেল আভিভ
Israel-Gaza War: ওই একটা হামলার ঘটনা সেসবকে দূরে সরিয়ে মানুষকে কাছে এনেছে। হামলায় ঘর হারিয়েছেন যাঁরা, যাঁরা স্বজনবান্ধব হারিয়ে রাস্তায়, তাঁদের কাছে সাহায্য় পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষ।

এক সপ্তাহ আগেই সব কিছু ছিল শান্ত, যেমনটা থাকে। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে উলট পালট হয়ে গিয়েছে সবটা। শহরের যে রাস্তাগুলোয় আগে বইত প্রাণের স্রোত, সেসব এখন শ্মশান। গত ৭ অক্টোবর দিনটা পাল্টে দিয়েছে সব কিছু। সকাল হতে না হতেই প্যালেস্টাইনের দিক থেকে ছুটে এসেছিল পাঁচ হাজার রকেট। আর তার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইজরায়েলের ভিতরে ঢুকে এসেছিল হাজার হাজার হামাস সেনা। গাজা সীমান্ত সংলগ্ন শহরগুলি সবচেয়ে আক্রান্ত হয়েছে। অজস্র বাসিন্দাকে অপহরণ করা হয়। অজস্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করে হামাস সেনা।
সেই ঘটনার পরে প্যালেস্টাইনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ যাওয়ার কথা ঘোষণা করে দেয় নেতানিয়াহু সরকার। তার পর থেকে গাজায় একের পর এক হামলা শানিয়েছে ইজরায়েল সরকার। হামাস সেনা দমনে শেষ পর্যন্ত যাওয়ার হুমকি দিয়েছে ইজরায়েল। ইতিমধ্যেই উত্তর গাজাকে জনশূন্য করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইজরায়েল সরকার।
কিন্তু এ যুদ্ধ কি চায় দু'দেশের সাধারণ মানুষ? দুদেশের এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বলি হয়েছে যাঁরা। ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় শহর তেল আবিব। যেখানে প্রচুর বিদেশি নাগরিকেরা থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দা তো বটেই। হামাস জঙ্গিদের নিশানায় ছিল এই শহরটিও। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বাস তেল আবিবে। সেদিনের ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে শহরে বহু বাসিন্দারই। ৭ অক্টোবরের ওই হামলার পরে পালিয়েওছেন বহু মানুষ। তার পরেও যাঁরা বেঁচে গিয়েছেন, তাঁরা হয়ে উঠেছেন যুদ্ধশান্তির দূত। তাঁরা তৈরি করেছেন স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দল। তারা খাবারদাবার, পোশাক নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন গাজা সীমান্তের কাছাকাছি। সেখানে হামাস আক্রান্ত বাসিন্দাদের দিকে তাঁরা বাড়িয়ে দিচ্ছেন সাহায্যের হাত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel-Gaza War: গত সাত দিনে অন্তত পাঁচশো শিশুর মৃত্যু হয়েছে গাজায়। বাবা-মা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তাঁদের সন্তানকে চারপাশের পরিস্থিতি থেকে, অসংখ্য মৃত্যুমিছিলের অভিশাপ থেকে বাঁচানোর। কিন্তু তেমনটা ঘটছে না আদপেই।
৭ অক্টোবরের হামলায় ইজরায়েলে অন্তত ১৩০০ জন নিহত হয়েছেন। এদিকে গাজায় ইজরায়েলের একের পর এক হামলায় মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ১৮০০ ফিলিস্তিনির। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের কাছে অধিকৃত এলাকায় মৃত্যু হয়েছে ৪৬ জনের। রাজায় রাজায় যুদ্ধে উলুখাগড়ার মতো মরছেন অসংখ্য নিরপরাধ বাসিন্দা। অথচ এ যুদ্ধ কাঙ্ক্ষিত নয় তাঁদের কারওরই। অথচ প্রাণ গিয়েছে তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি।

৭ অক্টোবরের আগে তেল আভিভ শহরে রাজনীতি, নানাবিধ সামাজিক বিষয়আশয় নিয়ে বহু মতামত ছিল, ভাগাভাগিও ছিল। কিন্তু ওই একটা হামলার ঘটনা সেসবকে দূরে সরিয়ে মানুষকে কাছে এনেছে। এক করে তুলেছে। পরস্পরের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ওই দিনের হামলায় ঘর হারিয়েছেন যাঁরা, যাঁরা স্বজনবান্ধব হারিয়ে রাস্তায়, তাঁদের কাছে সাহায্য় পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষ। বহু গৃহহীনকে আশ্রয় দিয়েছে শহরের একাধিক হোটেল। শরণার্থীদের মুখে তুলে দিয়েছে একটু খাবার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel Palestine Attack : ইজরায়েল বলছে, হামাস সেদেশের সাধারণ মানুষকে 'মানব ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করছে।
পেশায় মনোবিদ ইয়েল কাজ করতেন তেল আভিভের জাফা মিউসিপ্যালিটিতে। হামলার দিনে সর্বশান্ত হয়ে কোনওমতে ঠাঁই পেয়েছেন একটি হোটেলের বেসমেন্টে। তার পরেও চোট সারিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এগিয়ে এসেছেন তিনি। সেদিনের হামলায় ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের সুস্থ জীবনে ফেরারনোর চেষ্টা করে চলেছেন। একটু অনুষ্ঠান দেখতে জড়ো হয়েছিলেন মানুষ। সেখানে হামলা চালায় হামাস। অসংখ্য মারা যায়, জখম হন। আর যাঁরা বেঁচে গিয়েছেন তাঁদের তাড়া করছে শুধু আতঙ্ক। সেই আতঙ্কের পরিবেশ থেকে আক্রান্তদের বের করে আনার চেষ্টা করছেন ইয়েল।

সেদিনের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়ে দিয়েছে তাকেও। ফিরিয়ে দিয়েছে সেই হলোকাস্টের ভয়ঙ্কর স্মৃতি। ইয়েল জানিয়েছেন, নিজের শহরেই আর সুরক্ষিত বোধ করছেন না তাঁরা। এমন আগে কখনও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়নি তাঁদের। নিজের দেশ, নিজের দেশের সেনার উপর থেকে সমস্ত রকম বিশ্বাস, ভরসা উঠে গিয়েছে তাঁদের।
সমুদ্রের পাশেই ডাউনটাউন হোটেল, যা আজ হয়ে উঠেছে ত্রাণবিতরণের কেন্দ্র। সেখানেই চলছে কাউন্সিলিং সেশন, কোথাও বা চুল কেটে মনোবল ফেরানোর চেষ্টা চলছে আক্রান্তদের। হোটেলের কর্মীরা সব দিক দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। হোটেলের বলরুম থেকে শুরু করে কনফারেন্স রুম জুড়ে এখন মানুষের ভিড়। আর সেখানে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক। স্যান্ডুইচ, স্ন্যাকস, বাচ্চাদের জন্য খেলনা, জামাকাপড় এসব নিয়ে হাজির হচ্ছেন তেলআভিভ-সহ বেশ কয়েকটি শহরের বাসিন্দা। বহু রেস্তোরাঁ থেকে বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে খাবারদাবার।
শুধু ইজরায়েলের বাসিন্দাদের দিকেই নয়, গাজায় বিপদে পড়া মানুষগুলোর কাছেও অন্নবস্ত্রের সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন এই স্বেচ্ছাসেবকেরা। যুদ্ধ মানেই তো সাধারণ নিরাপরাধ মানুষের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি। দেশ জুড়ে খাদ্য-বাসস্থানের সঙ্কট। আর সেই সঙ্কটের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর সেই মন্ত্রকেই পাথেয় করেছে তেল আভিভের ওই সব মানুষেরা। রাষ্ট্র যুদ্ধ চায়, হানাহানি চায়। কিন্তু রাষ্ট্রের মানুষের মনের কথাটি যে আদতে কী, তা তাঁরা সাফ বুঝিয়ে দিচ্ছেন নিজের কাজের মাধ্যমে।







