রক্তাক্ত মুঘল ইতিহাসেও ভালবাসার ছোঁয়া! 'উড়ন্ত তারাদের ছায়া' দর্শককে মুড়ে রাখে মায়ায়

Theatre Review: কেমন হলো 'সংস্তব'-এর 'উড়ন্ত তারাদের ছায়া'?

Rajarshi Dhara
৪ মিনিট
রক্তাক্ত মুঘল ইতিহাসেও ভালবাসার ছোঁয়া! 'উড়ন্ত তারাদের ছায়া' দর্শককে মুড়ে রাখে মায়ায়

কলকাতা শহরে এখন এক মায়ানাটক চলছে। মায়ার নাটক, মায়া ধরানো নাটক। চলতি প্রজন্মের লোকজন একটা শব্দবন্ধ খুব ব্যবহার করে, ‘হ্যাল খাওয়া’। সেই সূত্র ধরেই বলা যায়, এই নাটক দেখে দর্শক ‘হ্যাল’ খেতে বাধ্য। তা এত বিশেষণ কোন প্রযোজনার জন্য? কথা হচ্ছে, 'সংস্তব' নাট্যদলের নবতম প্রযোজনা ‘উড়ন্ত তারাদের ছায়া’ নিয়ে।

যদি নাটকের আখ্যান নিয়ে কথা বলি, তাহলে তা যে খুব মনকে উৎফুল্ল করার মতো, তা বলা যায় না। নাটক শুরু হয় নাদির শাহ্-এর ভারত আক্রমণ দিয়ে এবং শেষ হয় নাদির শাহ্-এর করুণ পরিণতি ও মৃত্যু দিয়ে। কিন্তু এই যাপন যে যাত্রাপথ অতিক্রম করে আসছে, তা যে-কোনও দর্শককে মুগ্ধ করতে বাধ্য।

এই নাটকের নায়ক কে? নাদির শাহ্? অবশ্যই না, বরং নায়ক বলা যায় নাদির শাহ্-এর মনের ওপর আধিপত্য করা মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ্-কে। এই মোহাম্মদ শাহ্ মোগল সাম্রাজ্যের তথাকথিত কুলাঙ্গার শাসক, যে সমরযন্ত্র পরিচালনার থেকে সংগীত ও নৃত্যসাধনায় বেশি মনোযোগী এবং যার জীবনটাই দাঁড়িয়ে আছে মানুষের ওপর বিশ্বাস করায় (রবীন্দ্রনাথ বা ঋত্বিক ঘটকের দর্শনের পূর্বসূত্র যেন)।

এই মোহাম্মদ শাহ্-এর সংস্পর্শে এসে ভারতকে চিনছেন নাদির। বিষ আছে কি না, এই সন্দেহ ছেড়ে এক চুমুকে শেষ করছেন মোগল দরবারের সরবৎ। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যখন মোহাম্মদ প্রশ্ন করছেন,

মোহাম্মদ-আপনি এভাবে সরবৎটা খেলেন? ওতে যদি বিষ মেশানো থাকত?

নাদির- ইচ্ছে হলো, আপনাকে বিশ্বাস করতে।

মোহাম্মদ- তাহলে ভারতবর্ষ আপনাকে কী শেখাল?

নাদির- বিশ্বাস করতে! মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখলাম ভারতবর্ষে এসে!

এই বিশ্বাস নাদির শিখছেন মোহাম্মদের কাছে, ভারতের কাছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হিংসাই শেষ কথা নয়! স্বাধীনতার ইতিহাসকে অন্য চোখে দেখাবে 'দিল্লি চলো'

Theatre Review: 'নাট‍্য আনন'-এর 'দিল্লি চলো' প্রসঙ্গে কী বলছেন অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়?

তবে এই শিক্ষালাভের পর নাদিরের কী হলো? এই বিশ্বাসই কি নাদিরের জীবন গুলিয়ে দিল? নাদির শাহ্ অবিশ্বাসের বশে চোখ উপড়ে নিলেন নিজের ছেলে রেজা কোলি-র, আবার নিজের প্রাণ খোয়ালেন নিজেরই বিশ্বস্ত অনুচরের হাতে।

কী, বিশ্বাসের ধারণাটা ঘেঁটে গেল না?

গল্পের বিভিন্ন পরত নিয়ে কোনও তথাকথিত স্পয়লার দেব না, তবে এটাও সত্যি, যদি গোটা নাটকটাও এখানে টুকে দেওয়া হয়, পাঠক তা পড়লেও মাত্র ১ শতাংশ স্বাদ পাবেন, বাকি ৯৯ শতাংশ স্বাদ পেতে আপনাকে এই মায়ানাটক দেখতেই হবে।

বাংলা থিয়েটারের ক্ষেত্রে নাটককার ও নাট্যকার এক ব্যক্তি, এটা প্রায়শই দেখা যায়, তবে একজন ব্যক্তি, যিনি একসঙ্গে মঞ্চ, আলো, আবহ, নাটক ও নির্দেশনা প্রদান করছেন, এটি বিরলতম। দেবাশিস রায় এমনই একজন ব্যক্তি, যিনি এই প্রতিটা দিক কেবল সামলেছেন নয়, কাজটিকে এমন একটি মাত্রায় নিয়ে গেছেন যে, একজন দর্শক নিজের জীবৎকালে চেষ্টা করলেও প্রযোজনাটিকে কোনও দিন ভুলে যেতে পারবেন না।

যদি প্রতিটি বিভাগ ধরে ধরে কথা বলি, সংগীত বিভাগে সরোদ, ব্যাঞ্জ, ডারবোকা, ম‍্যান্ডোলিন ও কণ্ঠসংগীত সহযোগে যে মায়া রচনা করেছেন নির্দেশক, তা যে না শুনেছে- তাকে বোঝানো অসম্ভব (অনেকটা সেই বারাণসীর গলির বর্ণনার মতো)। যে-ক'টা গান ব্যবহার হয়েছে, প্রতিটাই অনবদ্য, তবে মোহাম্মদ শাহের গলায় ‘আল্লা আল্লা কা মাজা’ গানটি আজ নাটক দেখার এতদিন পরেও কানে বাজছে। মঞ্চ পরিকল্পনায় গোটা স্টেজটিকে বিভিন্ন খোপ বা প্যানেলে ভাগ করা আর নেট ও দড়ির ব্যবহার নজরকাড়া।

এবার আসা যাক আলোর কথায়। আমার মতে, বাংলা নাটকের একটা প্রধান শত্রু এলইডি পার নামক কিম্ভূত পদার্থটি। একটি আলো কী করে বিয়েবাড়ির গেট, ভাসানের গাড়ি থেকে আরম্ভ করে সব বড় দলের নাট্যপ্রযোজনায় ঠাঁই পায়, আমার মাথায় ঢোকে না। কিন্তু বহুদিন পর ‘উড়ন্ত তারাদের ছায়া’-য় ধ্রুপদী পদ্ধতিতে কেবল জেলপেপার ব্যবহার করে মঞ্চ-ক্যানভাসে এরকম রঙের পোঁচ অবাক করেছে, চমকে দিয়েছে। এর সঙ্গে অবশ্যই বলতে হবে, অডিটোরিয়ামের ছাদে লেজারের ব্যবহার করে তারাদের খেলা দেখানোর ঘটনাটিও।

গোটা নাটকে বহু বহু মনে রাখার মতো আবেগপ্রবণ মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছে, তবে দু'টি দৃশ্যের কথা ব্যক্তিগতভাবে বলতে ইচ্ছা করছে।

প্রথমটি নাটকের ওপেনিং সিন, যেখানে কিলা-এ-মুবারকের ছাদে উঠে মোহাম্মদ শাহ্ ও উবাইদুল্লা বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন ও তারাদের খেলা দেখছেন। একটি নাটক এতটা নিস্তব্ধতা দিয়ে শুরু হতে পারে, এটা যে নির্দেশক ভেবেছেন, এর জন্যই ওঁকে কুর্নিশ জানাতে হয়।

দ্বিতীয় যে মুহূর্তটির কথা না বললেই নয়, সেটি হলো বিরতির ঠিক আগের দৃশ্যে, যেটিতে মোহাম্মদ শাহ্-কে নাদির শাহ্ জড়িয়ে ধরেন ও চারদিক থেকে সহচরিত্ররা প্রদীপ নিয়ে এগিয়ে আসে। একটু আবেগপ্রবণ দর্শক হলে এই দৃশ্যে কেঁদে ফেলতে বাধ্য।

অভিনয়ের কথা যদি বলি, নাদির শাহ্-এর চরিত্রে সঞ্জীব সরকার... সত্যি বলতে, এরপর কী বিশেষণ দেব ভেবে পাচ্ছি না, একটা কথাই কেবল বলার, নিজেকে মাঝে মাঝে ভাগ্যবান মনে হয় মঞ্চে সঞ্জীব সরকারের মতো অভিনেতাকে দেখতে পাচ্ছি। মোহাম্মদের চরিত্রে তথাগত চৌধুরী নিজের অভিনয়ে ও গানের গলায় দর্শকদের বারবার তাক লাগান। এছাড়াও অভিনেতাদের মধ্যে সুস্নাত, অমৃতা, কঙ্কাবতী, সায়ন্তন প্রত্যেকেই স্ব স্ব চরিত্রে খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে ছাপ রেখে গিয়েছেন।

'সংস্তব'-কে বাংলা নাট্যসমাজ চিনত দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল হিসেবেই। দ্বিজেনবাবুর চলে যাওয়ার প্রায় ৫ বছর পর সংস্তব এরকম একটা নাট্যপ্রযোজনা আমাদের উপহার দিলেন দেখে এই চরম অন্ধকার সমাজের মধ্যে দাঁড়িয়ে একটা কথাই বলতে ইচ্ছা হয়, এই সময়, এই অতিমারী-উত্তর কালেও সব শেষ হয়ে যায়নি! শত প্রতিকূলতার পরও, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ!

নাটকে অনেক মনে রাখার মতো সংলাপও আছে, তবে যে সংলাপটি আমার ব্যক্তিগতভাবে সবথেকে প্ৰিয়, তা দিয়েই লেখা শেষ করি।

-জীবন, আজকাল জীবন কেমন লাগে আপনার মুহাম্মদ?

-ভালবাসার মতো করুণ।

-আর মৃত্যু আপনার কেমন লাগছে নাদির?

-ঘেন্নার মতো উজ্জ্বল।

লিখেছেন
Rajarshi Dhara
Rajarshi Dhara
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।