জনতার আদালতে তৃণমূল: কেন উঠছে ‘চোর চোর’ স্লোগান?
TMC corruption allegations: ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম আমলের অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তারপর গত দেড় দশকে একের পর এক বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি আর দুর্নীতির অভিযোগে বারবার নাম জড়িয়েছে এই দলের প্রথম সারির নেতাদের।
পশ্চিমবঙ্গের রাস্তা-ঘাটে, পাড়ার মোড়ে বা চায়ের দোকানে ইদানীং একটা স্লোগান প্রায়ই কানে আসে—“তৃণমূল চোর!” সাধারণ কোনো জনসভা হোক কিংবা কোনো নেতার জনসংযোগ কর্মসূচি, হুটহাট ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ না কেউ এই স্লোগান তুলে দিচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাজ্যের বড় বড় মন্ত্রী-নেতারা যখনই সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হচ্ছেন, তখনই তাঁদের তাড়া করছে এই ‘চোর চোর’ রব। চারপাশের এই ক্ষোভ আর প্রতিবাদের আওয়াজ শুনে আমাদের মাথায় গত ১৫ বছরের তৃণমূলের শাসনকাল এক ঝলকে চোখের সামনে চলে আসে। ভাসতে থাকে সারদা কাণ্ড, নারদা কাণ্ড, রোজ ভ্যালি স্কিম—
বঙ্গবাসীর মনে এই ক্ষোভ একদিনে তৈরি হয়নি। ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হওয়া ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এই ঘটনাগুলি। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম আমলের অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তারপর গত দেড় দশকে একের পর এক বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি আর দুর্নীতির অভিযোগে বারবার নাম জড়িয়েছে এই দলের প্রথম সারির নেতাদের। সাধারণ মানুষের জমানো টাকা থেকে শুরু করে ঘরের ছেলেমেয়েদের চাকরি—সব জায়গাতেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে দেখা গিয়েছে এই ১৫ বছরে।
১. সারদা ও রোজ ভ্যালি কেলেঙ্কারি (২০১৩)
এই চুরির অভিযোগের শুরুটা ২০১৩ সালে। তখন হঠাৎ করেই সামনে আসে 'সারদা গ্রুপ' নামের একটা চিটফান্ডের গল্প।
সহজ কথায়, এটা ছিল একটা পনজি স্কিম। গ্রামের ও মফস্বলের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে বলা হয়েছিল, "আমাদের এখানে টাকা রাখুন, অল্প দিনে দ্বিগুণ সুদ পাবেন।" ঘরের কোণে জমানো টাকা, পেনশনের টাকা, এমনকী ঘাম রক্ত বিক্রি করা পুঁজি বিশ্বাস করে সাধারণ মানুষ সেখানে ঢেলেছিলেন। প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তুলেছিল এই সংস্থাটি। কিন্তু ২০১৩ সালের এপ্রিলে হঠাৎ করেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে এই সাম্রাজ্য।
তৃণমূলের যোগ কোথায় ছিল?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Trinamool Congress: তৃণমূল কংগ্রেস কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের সংকট, পদত্যাগের মিছিল এবং বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল কি নিজেদের পুনর্গঠন করে আবারও বাংলার রাজনীতিতে শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে সক্ষম হবে?
তদন্তে নেমে কেন্দ্রীয় সংস্থা সিবিআই (CBI) দেখতে পায়, এই সারদা গ্রুপের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান (CEO) ছিলেন তৃণমূলের তৎকালীন সাংসদ কুণাল ঘোষ। এছাড়া তৎকালীন প্রভাবশালী পরিবহন মন্ত্রী মদন মিত্র এবং সাংসদ শ্রীঞ্জয় বসুসহ অনেকের নাম জড়িয়ে যায় এই ঘটনায়। মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষকে জেলেও যেতে হয়। সাধারণ মানুষের রাগ ছিল এখানেই—যাঁদের যে সরকারকে তাঁরাই ভরসা করে এনেছিলেন, সেই সরকারেরই প্রভাবশালী নেতারা এই চিটফান্ড কর্তাদের সঙ্গে একমঞ্চে ঘুরেছেন, ফলে মানুষ বিশ্বাস করে, তারা সরকারের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন।
এর ঠিক পরপরই সামনে আসে 'রোজ ভ্যালি' কেলেঙ্কারি। এটাও ছিল একই রকম এক চিটফান্ড, যার ব্যবসার জাল ছড়িয়েছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকার। এখানেও তৃণমূলের সাংসদ ও অভিনেতা তাপস পাল এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়ায় এবং তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। যদিও এই কেলেঙ্কারির পর তৎকালীন রাজ্য সরকার তদন্ত কমিশন গড়েছিল এবং সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা ফেরতের আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলছে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ পরিবার আজও তাঁদের সর্বস্ব হারিয়ে সর্বস্বান্ত।
২. ক্যামেরার সামনে ক্যাশ লেনদেন: নারদা স্টিং অপারেশন (২০১৬)
সারদার ক্ষত যখন দগদগে, ঠিক তখনই ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে একটা ভিডিও বোমা ফাটল রাজ্য রাজনীতিতে। নাম 'নারদা স্টিং অপারেশন'।
ম্যাথু স্যামুয়েল নামের এক সাংবাদিক একটা ভুয়া কোম্পানি সাজিয়ে তৃণমূলের একের পর এক হেভিওয়েট নেতা, মন্ত্রী আর সাংসদদের ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ব্যবসায়ী সুবিধার বদলে তিনি তাঁদের সামনে তুলে ধরেছিলেন লক্ষ লক্ষ টাকার বান্ডিল। আর ক্যামেরার সামনে ধরা পড়ল সেই দৃশ্য—টাকা নিচ্ছেন ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখার্জি, মদন মিত্র, শোভন চট্টোপাধ্যায়, সৌগত রায়ের মতো প্রথম সারির নেতারা।
নেতারা দাবি করেছিলেন, এটা কোনো ঘুষ নয়, দলের জন্য দেওয়া চাঁদা বা অনুদান। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে ছবিটা তৈরি হওয়ার, তা হয়ে গিয়েছিল। টিভির পর্দায় নিজেদের ভোট দিয়ে জেতানো নেতাদের এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা নিতে দেখে মানুষের বিশ্বাসে বড় ধাক্কা লেগেছিল। ২০২১ সালে এই মামলায় ফিরহাদ হাকিমসহ চার নেতাকে সিবিআই গ্রেফতারও করে, যদিও পরে তাঁরা জামিন পান।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Trinamool Congress: ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের যাত্রা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলটি সত্যিই সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিতর্ক, অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই এর ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দেখা যাক, ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই রাজনৈতিক পথচলার আসল চিত্রটা ঠিক কেমন।
৩. ঘরের খাট থেকে কোটি কোটি টাকা: এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা বোধহয় লেগেছে বাংলার যুবসমাজের মনে। যে দুর্নীতির ধাক্কায় প্রায় ২৫,০০০ শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর চাকরি বাতিল হওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে আদালতের নির্দেশে। এটা হলো স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) বা শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি।
অভিযোগটা ছিল খুব সহজ কিন্তু মারাত্মক—টাকার বিনিময়ে অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে, আর মেধা তালিকায় থাকা যোগ্য ছেলেমেয়েরা বছরের পর বছর রাস্তায় বসে কেঁদেছেন। ওএমআর শিট (OMR Sheet) বা উত্তরপত্র জালিয়াতি করে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সার্ভারে।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখার্জির ফ্ল্যাট থেকে ইডির উদ্ধার করা কোটি কোটি টাকা
২০২২ সালে যখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অর্পিতা মুখার্জির বাড়িতে হানা দিল, তখন পুরো রাজ্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। খাটের তলা থেকে, আলমারি থেকে উদ্ধার হলো প্রায় ৫০ কোটি টাকা নগদ আর কেজি কেজি সোনা! টিভির পর্দায় সেই টাকার পাহাড় দেখার পর মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। ২০২৬ সালেও সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, জালিয়াতির মাধ্যমে হওয়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ কলুষিত ছিল।
৪. রেশন দুর্নীতি ও অন্যান্য কেলেঙ্কারি
চাকরি আর জমানো টাকার পর দুর্নীতি গিয়ে পৌঁছল মানুষের পেটের ভাতে। অভিযোগ উঠল রেশনে গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি চাল ও গম খোলা বাজারে কালোবাজারি করে পাচার করে দেওয়া হয়েছে। ইডির দাবি অনুসারে, এই কেলেঙ্কারির পরিমাণ প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি! এই ঘটনায় গ্রেফতার হন রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক।
এখানেই শেষ নয়, আরও বেশ কিছু অভিযোগ এই তালিকায় রয়েছে:
গরু ও কয়লা পাচার: সীমান্ত এলাকা দিয়ে কোটি কোটি টাকার গরু ও কয়লা পাচারের সমান্তরাল নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগ ওঠে, এতে বীরভূমের দাপুটে তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল জড়িয়ে পড়েন।
কাটমানি ও সিন্ডিকেট রাজ: একশো দিনের কাজ, আবাসন যোজনা বা সাধারণ বাড়ি তৈরি—সব কিছুতেই তৃণমূলের স্থানীয় স্তরের নেতাদের বিরুদ্ধে একটা নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা 'কাটমানি' নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এই 'তোলাবাজি' সবচেয়ে বেশি বিরক্তি তৈরি করেছে।
সন্দেশখালি ও সিগনেচার স্ক্যাম: সন্দেশখালির ঘটনা বা নথিপত্রে জাল সই করে দুর্নীতির মতো ঘটনায় দলের বিধায়কদের নাম জড়ানো এবং দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনা মানুষের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে।
স্বভাবতই, তৃণমূল কংগ্রেস এই সবকটি অভিযোগকে ঢালাওভাবে স্বীকার করে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি—এই সমস্ত তদন্তই আসলে বিজেপি (BJP) শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের এক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। সিবিআই এবং ইডি-কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তৃণমূলকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তা ছাড়া, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের সততা নিয়ে সরাসরি কোনো দাগ লাগেনি, কিন্তু তাঁর প্রশাসনের মন্ত্রীদের এই হাল দলের ইমেজকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
বিরোধী দলগুলির বক্তব্য আবার অন্য। তাদের মতে, এই দুর্নীতি উপর থেকে নিচতলা পর্যন্ত একেবারে 'সিস্টেম্যাটিক' বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে ফেলেছে। বাম আমলেও দুর্নীতি ছিল, কিন্তু তৃণমূলের আমলে এর পরিধি এবং টাকার অঙ্ক যেন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে।









