কেন জামা খুলে উড়িয়েছিলেন সৌরভ, সেই ম্যাচের যে গল্প আজও অজানা

সাধারণ মানুষের মনে রয়েছে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে মাঠের মধ্যে জার্সি খুলে ফ্লিনটফের উল্লাসের জবাবে ভারতীয় অধিনায়কের লর্ডসের ব্যালকনিতে জার্সি খুলে হাওয়ায় ঘোরানোর দৃশ্য। এই গুরুত্বপূর্ণ জয় এবং উল্লাসের পিছনে থাকা বহু কাহিনি আজও বহু মানুষের কাছে অজানা গল্প হিসাবেই রয়ে গিয়েছে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
কেন জামা খুলে উড়িয়েছিলেন সৌরভ, সেই ম্যাচের যে গল্প আজও অজানা

১৩ জুলাই, ২০০২। ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা লর্ডসের ব্যালকনিতে এক বাঙালির জয়োল্লাস দেখে গর্ব অনুভব করেছিল। সাধারণ মানুষের মনে রয়েছে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে মাঠের মধ্যে জার্সি খুলে ফ্লিনটফের উল্লাসের জবাবে ভারতীয় অধিনায়কের লর্ডসের ব্যালকনিতে জার্সি খুলে হাওয়ায় ঘোরানোর দৃশ্য। এই গুরুত্বপূর্ণ জয় এবং উল্লাসের পিছনে থাকা বহু কাহিনি আজও বহু মানুষের কাছে অজানা গল্প হিসাবেই রয়ে গিয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৫০ পার, নানা মাঠে সৌরভের দাদাগিরি চলছে চলবে

সিনেমার গল্পের মতো জীবনের হাফ সেঞ্চুরি করলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।

২০০২ সালের ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনাল খেলা-সংক্রান্ত এক সাক্ষাৎকারে রাহুল দ্রাবিড়, মহম্মদ কাইফ এবং অজিত আগরকার বহু অজানা গল্প বলেছিলেন। তাঁদের মতে সেই সময় ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন যুগ শুরু হয়েছে। দেশ-বিদেশের মাটিতে তারা কিছু ম্যাচ জিততে শুরু করেছে। তারা ম্যাচ জিতলেও রান তাড়া করে ম্যাচ জেতা দল হিসেবে তাদের সুনাম ছিল না। সেই পরিস্থিতিতে ৩২৫ রান তাড়া করে জয় কার্যত অসম্ভব ছিল। ভারতীয় দলের ব্যাটিংয়ের শুরুটা ভালো হলেও দেড়শো রানের মধ্যে তারা পাঁচ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল। মহম্মদ কাইফ বলেছিলেন যে, শচীন তেন্ডুলকর আউট হওয়ার পরে তিনি ব্যাট করতে নেমেছিলেন। লর্ডসের ড্রেসিংরুম থেকে লংরুম পেরিয়ে গ্রাউন্ডে পৌঁছতে হয়। সেই সময় কাইফের মনে হয়েছিল লংরুমে উপস্থিত সকল মানুষ যেন তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল, শচীন তো আউট হয়ে গিয়েছে। এইবার তুমি কী করবে? কাইফ যখন মাঠে প্রবেশ করে হাঁটতে শুরু করেন তখন দেখেন যে, বহু লোক স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

এই কথাটা অবিশ্বাস্য কিছু নয়। কারণ সৌরভ, শেহবাগ, দ্রাবিড়, শচীন আউট হয়ে গিয়েছেন তখন। মাঠে রয়েছে বয়স এবং অভিজ্ঞতার বিচারে নবীন যুবরাজ সিংহ এবং মহম্মদ কাইফ। কাইফ নিজে এই ঘটনার ফলে খুব একটা বিস্মিত হননি, কারণ তাঁর পরিবার শচীন তেন্ডুলকর আউট হওয়ার পর খেলা বন্ধ করে সিনেমা দেখতে চলে গিয়েছিল। কাইফ ক্রিজে পৌঁছনোর আগে ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক নাসের হুসেন তাকে বলেছিলেন যে, তোমার তুলনায় একটা বাস ড্রাইভারের কাছে বেশি সুযোগ থাকবে। কাইফ ম্যাচ জেতার পর তার জবাব দিয়ে বলেছিলেন যে, বাস ড্রাইভার হিসেবে আজকের ইনিংস মন্দ নয়।

অজিত আগরকার এই ম্যাচ সম্পর্কে বলেছেন যে, সেই সময় খুব আশাবাদী মানুষও হয়তো ভারতের এই জয় আশা করেননি। লক্ষ্য ১৮০-২০০ হলে হয়তো দুই অল্পবয়সি খেলোয়াড় কিছু বোলারের সাহায্য নিয়ে কোনওভাবে সেই লক্ষ‍্যে পৌঁছে যেতে পারত, কিন্তু পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরেও ৩২৫-এর লক্ষ্য তাড়া করে জিতে যাওয়ার কারণেই এই ম্যাচ এত গুরুত্বপূর্ণ। এই ম্যাচের আগেও ভারতীয় দল অনেকবার এইরকম লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করেছিল কিন্তু সফল হয়নি। তৎকালীন ভারতীয় দলের অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে এই ম্যাচ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সেই সময় তিনশো রানের বেশি তাড়া করে ম্যাচ জেতা সহজ ছিল না। তাই ইংল্যান্ড দল ৩০০ রানের বেশি করে ফেলার কারণে তিনি নিজের এবং দলের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সেই কারণেই তিনি এবং শেহবাগ ভারতীয় ইনিংসের মজবুত ভিত গড়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং সফল হয়েছিলেন। রাহুল দ্রাবিড় সেই ম্যাচে ভালো খেলতে পারেননি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তিনি পাঁচ রান করে আউট হয়ে যাওয়ার পরে ড্রেসিংরুমে একটা টেবিলের ওপর বসেছিলেন। যখন যুবরাজ সিংহ এবং মহম্মদ কাইফের পার্টনারশিপ তৈরি হয়, তখন তিনি সেই টেবিলে বসে। তিনি নিজের মনে ছোট ছোট লক্ষ্যমাত্রা রেখেছিলেন, আর সেইগুলো পূর্ণ হওয়ার পর নিজেই মনে মনে খুশি হচ্ছিলেন। তার মনে হচ্ছিল, যেন তাঁর যোগদান পাঁচ রানের থেকে অনেক বেশি। ভারতীয় দল তিনশো রান বানানোর পরে তিনি ব্যালকনিতে এসেছিলেন।

ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির সেই ম্যাচের বহু মুহূর্ত আজও বহু মানুষের কাছে ছবির মতো স্পষ্ট। ইংল্যান্ড দলের অসাধারণ ব্যাটিং দেখে হতাশ হয়ে পড়া থেকে তিনশোর ওপর রান দেখে ভারতীয় দলের খেলার সমালোচনা, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের অসাধারণ ব্যাটিং থেকে শেহবাগের অনবদ্য কিছু শট, পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরে বেশিরভাগ মানুষের খেলা দেখা বন্ধ করে দেওয়া থেকে যুবরাজ কাইফের জুটিতে ভর করে ভারতীয় দলের ম্যাচে ফেরার চেষ্টা দেখে আশাবাদী হয়ে ওঠা, আউট হওয়ার পরে যুবরাজ সিংহর কেঁদে ফেলা ছবি দেখে মন খারাপ করা, জাহির খানের মহম্মদ কাইফের সেই শেষ দুই রানের সময় উৎকণ্ঠা এবং শেষে ভারতীয় অধিনায়কের লর্ডসের ব্যালকনিতে উল্লাস। ভারতের বিভিন্ন এলাকায় সেই বর্ষার রাতে রং খেলা এবং বাজি ফাটানো হয়েছিল। এই ম্যাচ ভারতীয় দলের সৌরভ-যুগে দ্বিতীয়বার সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, আমরাও যোগ্য, আমরাও পারি।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।