কোথায় দাঁড়িয়ে আমেরিকা-ইরান সংঘাত?

US Iran conflict: শান্তি আলোচনা চলার মধ্যেই কেন ফের ইরানে হামলা চালাল আমেরিকা? এই হামলার পর কি ভেঙে যেতে পারে যুদ্ধবিরতি? মধ্যপ্রাচ্য কি আবার বড় যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে?

Tanvia Barua
৪ মিনিট
কোথায় দাঁড়িয়ে আমেরিকা-ইরান সংঘাত?

মধ্যপ্রাচ্যে ফের উত্তেজনা ছড়াল আমেরিকার নতুন সামরিক হামলাকে ঘিরে। দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বাহিনীর হামলার পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাহলে কি যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেল? নাকি এটি শুধুই 'সীমিত প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ', যেমনটা দাবি করছে ওয়াশিংটন?

২৫ মে রাতে ঘটনার সূত্রপাত হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানায়, ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং নৌকা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। আমেরিকার দাবি, ওই নৌকাগুলি স্ট্রেট অব হরমুজ এলাকায় মাইন পেতে বা মার্কিন জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

কিন্তু ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল একেবারেই অন্যরকম। তেহরান এই হামলাকে 'যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন' বলে আখ্যা দিয়েছে। ইরানের সরকারি মহল জানায়, শান্তি আলোচনা চলাকালীন আমেরিকার এই হামলা কার্যত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর বড় ধাক্কা। যদিও একইসঙ্গে ইরান এটাও জানিয়েছে যে তারা এখনও আলোচনার টেবিল ছাড়েনি।

গত কয়েক মাস ধরেই আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত ভয়াবহ আকার নিয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া সংঘর্ষের পর ইরান স্ট্রেট অব হরমুজে নিয়ন্ত্রণ কড়া করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড়সড় চাপ তৈরি হয়। আমেরিকা পরে ইরানের বিরুদ্ধে কার্যত নৌ অবরোধ শুরু করে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহণ হয়। ফলে সংঘর্ষ যত বেড়েছে, ততই বিশ্ব অর্থনীতিতে উদ্বেগ বেড়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হরমুজ সংকটে দেশের অর্থনীতি, কেন কোভিড যুগে ফিরতে বলছেন মোদি?

মিডিয়ার একাংশ প্রচার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং কানাডায় জ্বালানি তেলের দামের গড় বৃদ্ধি ৩০% থেকে ৪০%, সেখানে ভারত ব্যতিক্রম। কারণ এদেশে লিটার প্রতি দাম বেড়েছে মাত্র তিন টাকা। এই বয়ানটি আসলে অর্ধসত্য।

এই পরিস্থিতিতে কাতার, পাকিস্তান-সহ একাধিক দেশের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু হয়। গত কয়েক দিনে দু'পক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে আলোচনা 'ইতিবাচক' দিকে এগোচ্ছে। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োও বলেন, চুক্তি হতে 'আর কয়েক দিন' লাগতে পারে। অন্যদিকে ইরানের সংবাদমাধ্যমও জানায়, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। ঠিক এই সময়েই নতুন হামলার ঘটনা সামনে আসে। ফলে অনেকের আশঙ্কা, যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া কি তাহলে ভেস্তে যেতে চলেছে?

তবে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ। কারণ হামলার পরেও ইরান সরাসরি বড়সড় পাল্টা আক্রমণ করেনি। বরং আলোচনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার কথাই বলেছে। কাতারের দোহায় ইরানি প্রতিনিধিদল এখনও আলোচনায় রয়েছে বলেও খবর।

এই সংঘর্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে স্ট্রেট অব হরমুজ। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ এই পথ দিয়ে হয়। যুদ্ধের কারণে এই জলপথে জাহাজ চলাচল কমে যায়। বহু তেলবাহী জাহাজ আটকে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। নতুন হামলার খবর সামনে আসতেই আবারও তেলের দামে উল্লম্ফন দেখা যায়। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কয়েক শতাংশ বেড়ে যায় একদিনেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেশজুড়ে জ্বালানির হাহাকার: সংকট কেন? অর্থনীতিতে এর ধাক্কা ঠিক কতখানি?

India energy crisis 2026: জ্বালানির আকাল যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে , তা আমাদের চারপাশের ছোট ছোট ঘটনায় নজর দিলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের থালা থেকে শুরু করে ব্যবসায়। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ সত্যিই এক গভীর সংকটের মুখে।

চিনও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বেজিংয়ের বক্তব্য, সব পক্ষের উচিত এগিয়ে এসে সমাধানের চেষ্টা করা। রাষ্ট্রসংঘেও শান্তি প্রক্রিয়া বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ইজরায়েলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ইজরায়েলের একাংশ এখনও ইরানের বিরুদ্ধে আরও কড়া সামরিক অবস্থানের পক্ষে। ফলে আমেরিকা-ইরান আলোচনার ভবিষ্যৎ শুধু এই দু'দেশের উপর নির্ভর করছে না, গোটা পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।

আমেরিকার পক্ষ থেকে যদিও দাবি করা হচ্ছে, এই হামলা 'পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ' শুরু করার উদ্দেশ্যে নয়। এটি ছিল সীমিত প্রতিরক্ষামূলক অভিযান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেও বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে আবার হামলা হতে পারে, তবে তাঁর প্রশাসন আলোচনার পথও খোলা রাখতে চায়।

অন্যদিকে ইরানের মধ্যেও দ্বিধা রয়েছে। একাংশ মনে করছে, আমেরিকার উপর ভরসা করা কঠিন। আবার আরেকটি অংশের বক্তব্য, দীর্ঘ যুদ্ধ দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের উপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করছে। তাই আলোচনার পথ বন্ধ করা উচিত হবে না। তেহরানের বাজার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই অনিশ্চয়তা স্পষ্ট।

প্রসঙ্গত, যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছে, এমনটা এখনও বলা যাচ্ছে না। কারণ দু'পক্ষই প্রকাশ্যে আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও স্পষ্ট, সামান্য উত্তেজনাও যে কোনো সময় বড় সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে।

বিশ্বের নজর এখন দোহা ও ওয়াশিংটনের দিকে। কারণ আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দিতে পারে, মধ্যপ্রাচ্য নতুন শান্তির পথে হাঁটবে, নাকি ফের আরও বড় যুদ্ধের দিকে এগোবে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।