পার্লে-জি আর জল খেয়ে দিন কাটাতে হতো জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ভিক্রান্ত ম্যাসিকে
Vikrant Massey: ১৯৮৭ সালের ৩ এপ্রিল মুম্বইয়ের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় ভিক্রান্তের। তাঁর বড় হয়ে ওঠার পরিবেশটা ছিল একদম অন্যরকম। তাঁর পরিবারকে বলা যায় বৈচিত্র্যের এক দারুণ উদাহরণ। বাবা জলি ম্যাসি হলেন খ্রিস্টান, মা মীনা ম্যাসি শিখ, আর ভিক্রান্তের নিজের বড় ভাই মোঈন মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
বলিউডের গ্ল্যামার দুনিয়ায় যেখানে ‘নেপোটিজম’ নিয়ে প্রতিনিয়ত বিতর্ক চলে, সেখানে কোনো গডফাদার ছাড়া, শুধু নিজের প্রতিভা আর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছনো কোনো রূপকথার গল্পের চেয়ে কম কিছু নয়। এই রূপকথাকে বাস্তবে সত্যি করে দেখিয়েছেন অভিনেতা ভিক্রান্ত ম্যাসি। ‘১২থ ফেল’ সিনেমায় আইপিএস অফিসার মনোজ কুমার শর্মার চরিত্রে তাঁর অভিনয় কোটি কোটি মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছিল। কিন্তু পর্দায় সেই সংগ্রামের অভিনয় করার প্রয়োজন হয়নি ভিক্রান্তের, কারণ তাঁর নিজের জীবনটাই ছিল এক চরম লড়াইয়ের গল্প।
১৯৮৭ সালের ৩ এপ্রিল মুম্বইয়ের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় ভিক্রান্তের। তাঁর বড় হয়ে ওঠার পরিবেশটা ছিল একদম অন্যরকম। তাঁর পরিবারকে বলা যায় বৈচিত্র্যের এক দারুণ উদাহরণ। বাবা জলি ম্যাসি হলেন খ্রিস্টান, মা মীনা ম্যাসি শিখ, আর ভিক্রান্তের নিজের বড় ভাই মোঈন মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
একই ছাদের নিচে এতগুলি ধর্মের মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকতেন। ভিক্রান্ত নিজে অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে সেভাবে বিশ্বাস করেন না। তিনি সহজ কথায় বলেন, “ধর্ম মানুষের তৈরি।” তবে সব ধর্মের প্রতিই তাঁর মনে গভীর শ্রদ্ধা আছে। ছোটবেলায় মুম্বইয়ের এক সাধারণ 1BHK ফ্ল্যাটে কেটেছে তাঁর দিন। আর্থিক অবস্থা ভালো-মন্দের মধ্য দিয়ে গেলেও বাড়িতে সংস্কৃতির পরিবেশ ছিল। তাঁর দাদা শিমলায় থিয়েটার করতেন এবং ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের হাত থেকে মেডেলও পেয়েছিলেন। আর এই সুবাদেই ছোটবেলা থেকে নাচ আর অভিনয়ের প্রতি ভিক্রান্তের একটা সহজাত টান তৈরি হয়।
ভিক্রান্তের বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর, তখন তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। সংসারের হাল ধরতে এবং নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে খুব কম বয়সেই কাজে নেমে পড়তে হয় তাঁকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manav Kaul: একটা 'সিআইডি' (CID) সিরিয়ালের এপিসোডে অভিনয় করে যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে তিন মাস টেনেটুনে চালাতে হতো। পেট চালাতে বিস্কুট বিক্রি করা, ঘুড়ি ওড়ানো, ব্রেকড্যান্স শেখানোর কাজও করেছেন তিনি।
একটি কফি শপে টেবিল পরিষ্কার করা, থালাবাসন মাজা এবং ওয়েটারের কাজ শুরু করেন তিনি। তাঁর প্রথম আয় ছিল মাত্র ২০০ টাকার মতো। দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হতো তাঁকে। যাতায়াতের জন্য চার-চারটি লোকাল ট্রেন বদলাতে হতো। পকেটে টাকা না থাকায় বহু দিন শুধু পার্লে-জি বিস্কুট আর জল খেয়ে খিদে মিটিয়েছেন। কাজের পাশাপাশি প্রখ্যাত কোরিওগ্রাফার শিয়ামক দাভারের ড্যান্স ট্রুপে যোগ দেন। সেখানে দুই বছর ব্যালে ও কনটেম্পোরারি নাচ শেখেন এবং ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার হিসেবেও কাজ করেন।
এত কষ্টের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—পরিবারকে একটু স্বস্তি দেওয়া এবং নিজের একটা মোবাইল ও ল্যাপটপ কেনার স্বপ্ন পূরণ করা।
কঠোর পরিশ্রমের ফল মিলল ২০০৭ সালে। ‘ধুম মাচাও ধুম’ সিরিয়ালের মাধ্যমে টেলিভিশনে প্রথম ব্রেক পান ভিক্রান্ত। এরপর ‘ধরম বীর’ এবং বিশেষ করে ২০০৯ সালের জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল ‘বালিকা বধূ’-তে ‘শ্যাম’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
টিভিতে কাজ করার সময় সপ্তাহে ১০০ ঘণ্টারও বেশি শুটিং করতে হতো তাঁকে। দিন-রাত এক করে কাজ করার পর ২৪ বছর বয়সে ভিক্রান্ত নিজের জীবনের প্রথম বড় সাফল্য পান—তিনি মুম্বইয়ে নিজের একটি বাড়ি কেনেন। এটি ছিল তাঁর মায়ের অনেক দিনের স্বপ্ন। ভিক্রান্ত বলেন, “যত কষ্টই হোক না কেন, দিনশেষে নিজের একটা ঘরে ফিরে আসার আনন্দই আলাদা।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Malayalam actor Indrans: দর্জির এই কাজই ১৯৮১ সালে সুরেন্দ্রনকে নিয়ে এল মালায়লাম সিনেমার সেটে। তবে অভিনেতা হিসেবে নয়, কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে। পর্দার পিছনে কাজ করতে করতেই তাঁর নিষ্ঠা, চমৎকার রসবোধ আর দুর্দান্ত উপস্থিত বুদ্ধি সবার নজর কাড়তে শুরু করল।
টেলিভিশনে তুমুল জনপ্রিয় এবং ভালো আয় হওয়া সত্ত্বেও ভিক্রান্তের লক্ষ্য ছিল আরও বড়। ২০১৩ সালে ‘লুটেরা’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে তাঁর পা রাখা। রণবীর সিংয়ের বন্ধুর চরিত্রে তাঁর ছোট অভিনয়ও সবার নজর কাড়ে। এরপর একে একে ‘দিল ধড়কনে দো’, ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুর্খা’ এবং ‘ছপাক’-এর মতো সিনেমায় দীপিকা পাড়ুকোনের বিপরীতে অভিনয় করে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। বিশেষ করে কঙ্কনা সেন শর্মার ‘এ ডেথ ইন দ্য গুঞ্জ’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় সমালোচকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।
শুধু সিনেমাই নয়, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েব সিরিজের দুনিয়াতেও তিনি রাজত্ব করেছেন। ‘মির্জাপুর’-এ বাবলু পন্ডিত, ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’ বা ‘মেড ইন হেভেন’-এর মতো সিরিজে তাঁর ন্যাচারাল অভিনয় দর্শকদের দারুণ পছন্দ হয়।
২০২৩ সালটি ছিল ভিক্রান্তের জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। বিধু বিনোদ চোপড়া পরিচালিত ‘12th Fail’ সিনেমাটি সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়ার পর ইতিহাস তৈরি করে। একজন অতি দরিদ্র পরিবারের ছেলে কীভাবে সব বাধা পেরিয়ে আইপিএস (IPS) অফিসার হলেন, সেই নিয়েই এই ছবি। সেই অভিনয়ে ভিক্রান্ত যেন নিজের জীবনের সবটুকু সংগ্রাম ঢেলে দিয়েছিলেন।
সিনেমার শেষ দৃশ্যের কান্নার শুটিং করার পর ভিক্রান্ত নিজেও বাস্তবে কেঁদে ফেলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “এখানে পৌঁছতে আমার ১৯ বছর সময় লেগেছে।” এই অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি ২০২৫ সালে ভারতের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (National Film Award) ফর বেস্ট অ্যাক্টর লাভ করেন।
কাজের বাইরে ভিক্রান্ত একজন অত্যন্ত সাধারণ এবং মাটির মানুষ। ২০১৫ সাল থেকে অভিনেত্রী শীতল ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ২০২২ সালে তাঁরা ধুমধাম করে বিয়ে করেন। ২০২৪ সালে তাঁদের কোল আলো করে আসে পুত্রসন্তান ‘বরদান’।
সন্তান হওয়ার পর পিতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে এবং পরিবারকে সময় দিতে ভিক্রান্ত কিছুদিনের জন্য অভিনয় থেকে সাময়িক বিরতিও নিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি আবারও নতুন নতুন প্রজেক্ট যেমন ‘আঁখো কি গুস্তাকিয়াঁ’, ‘দ্য সবরমতি রিপোর্ট’ এবং বেশ কিছু বড় সিনেমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।







