বিশেষ সম্প্রদায়ের মুসলিমদের দিকে কেন নজর দিতে বলছেন মোদি?
সম্প্রতি হায়দরাবাদে বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক বসে। সেখানে সব সম্প্রদায়ের অনগ্রসর এবং বঞ্চিত মানুষদের কাছে দলের কার্যকর্তাদের যাওয়ার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

একেই বোধহয় বলে, ঠেলার নাম বাবাজি! ঠেলায় পড়েই কি পসমন্দা মুসলমানদের কথা মনে পড়ল মোদির? তাঁরা কি নেহাতই ভোটব্যাঙ্ক? তাই ভোটের আগে তাদেরও মন জয় করার চেষ্টা!
হায়দরাবাদে জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে চব্বিশের মূলমন্ত্র বেঁধে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি ভালোই বুঝেছেন, শুধুমাত্র হিন্দু ভোট দিয়ে তিনি উতরোতে পারবেন না। তাই এবার আলাদা করে নজর দিলেন পিছিয়ে পড়া মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে। মোদির কথায় আলাদা করে উঠে এল পসমন্দা মুসলমানের কথা। এরা কারা?
মোদি বলেন, হিন্দু ছাড়াও অন্য ধর্মের নির্যাতিত, শোষিতদের কাছে পৌঁছতে হবে দলীয় পদাধিককারীদের। সেই সঙ্গে দেশ থেকে পরিবারতন্ত্র, জাতপাত এবং তোষণের রাজনীতিকে সমূলে উৎখাত করতে হবে। বিদ্বেষে দল চলে, দেশ চলে না। বুঝেছেন, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সাম্প্রতিককালে প্রবাসে ভারতের ভাবমূর্তি যেভাবে নষ্ট হয়েছে, তাতে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তারা বুঝেছে, ৭০ শতাংশকে ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাজনীতির সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। ২০২৪-এ লোকসভা ভোট। চলতে হবে সবাইকে নিয়ে। শুধু হিন্দু এবং হিন্দুত্বের ভরে বিজয়রথ ছুটবে না। বুঝেছেন মোদিও। তাই এবার পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের কাছে পৌঁছনোর বার্তা দিলেন মোদি। মোদির মুখে আলাদা করে শোনা গেল পসমন্দা মুসলমানের কথা।
মুসলমানদের মধ্যে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির পাশে থাকার কথা বলেন মোদি। যদিও মুসলমানদের অধিকাংশই যে পিছিয়ে পড়া, তা আগেই স্পষ্ট হয়েছে। দেশজুড়ে মুসলমানদের দুর্দশার কথা সাচার কমিটির রিপোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছিল। তাদের অবস্থা যে তফশিলিদের থেকেও করুণ সে ছবিও ফুটে উঠেছিল।
পসমন্দা মুসলমান কারা?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গ্রামে-গঞ্জে গেরুয়া শিবির যেভাবে শিকড় বিস্তার করছে, তাতে বেকায়দায় পড়েছে দল। তাই এই সময় বিজেপি-র কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট হাতছাড়া হতে দেওয়া কাম্য নয় বলেই হয়তো মহুয়ার থেকে দূরত্ব বাড়িয়েছেন দলীয় নেতৃত্ব।
প্রথমত পসমন্দা মুসলমান হলো পিছিয়ে পড়া একটা মুসলমান সম্প্রদায়। বলাই বাহুল্য যে, এতদিন তাদের কথা মনে করার প্রয়োজন পড়েনি কারও। এবার ভোট আসতেই বোঝা গেল, তারাও ভোটব্যাঙ্ক। তাই তাদের মন জয়ের চেষ্টা করলেন মোদি। কিন্তু এরা কারা?
মোদি জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে পসমন্দা মুসলমানদের সামাজিক উন্নয়নের কথা বলেন। সমাজের অন্য স্তরের উন্নয়ন হলে তারাও বাদ যাবে না। প্রধানমন্ত্রী বলার পর বিজেপি তাদের মন জয় করার কাজ শুরু করে দিয়েছে। বিজেপি পসমন্দা মুসলান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দানিশ আনসারিকে তাঁদের উন্নয়নে নিয়োগ করেছে। এই আনসারি হলেন পূর্ব উত্তরপ্রদেশের বালিয়ায় দলের নেতা। তিনি যোগী সরকারের সংখ্যালঘু দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী। ফলে পসমন্দা মুসলমানের কাছাকাছি পৌঁছতে তাঁকেই উপযুক্ত মনে করেছে বিজেপি। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পসমন্দা মুসলিম মোদির সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
'পসমন্দা' শব্দটি এসেছে পারসি ভাষা থেকে। এর অর্থ, যারা পিছিয়ে রয়েছে। উত্তরপ্রদেশে এরা বিপুল সংখ্যায় রয়েছে। যোগীর রাজ্যে মোট মুসলমানের ৭৫ শতাংশ এদের প্রতিনিধিত্ব। আর সারা দেশের মোট মুসলমানের ৮৫ শতাংশই পসমন্দা।
পসমন্দারা দলিত এবং পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়। তারা সমাজের ভেতর থেকে অনেক সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমরা, যারা ভারতে আছে, তাদের মধ্যে জাত বিভাজন রয়েছে। যেমন, ১৫ শতাংশ হলো উচ্চবর্গ বা উচ্চ জাত। এদের বলা হয় আসরাফ। বাকি ৮৫ শতাংশকে বলা হয় আরজাল। এরা মূলত দলিত এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণি। আরজাল হলো অবদমিত। এমনও শোনা যায়, হিন্দুদের মধ্যে যারা অস্পৃশ্য, তারা এই সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে যায়। পসমন্দা মুসলমান অর্থনৈতিকভাবে , সামাজিকভাবে এবং শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়া। মুসলমানদের মধ্যে এই পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকেই বলা হয় পসমন্দা। এরাই এখন বিজেপির টার্গেট।
পিছিয়ে পড়া এই সম্প্রদায় বেঁচে থাকার জন্য অনেক দিন ধরে লড়াই করে চলেছে। ভারতের পসমন্দা আন্দোলন ১০০ বছরের পুরনো। ভারতে পসমন্দাদের হয়ে গলা তোলার জন্য ২টি বড় সংগঠন তৈরি হয়। এক, অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড মুসলিম ফ্রন্ট। এই সংগঠনের মাথায় ছিলেন ইজাজ আলি। আর একটি সংগঠন হলো অল ইন্ডিয়া পসমন্দা মুসলমান মেরাজ। এই সংগঠন তৈরি করে আলি আনওয়ার। পসমন্দা মুসলমানদের বিভিন্ন ছোট বড় সংগঠন ছড়িয়ে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গে।
'দ্য প্রিন্ট' বলে, ধর্মীয় স্বীকৃতি থেকে বেশি করে সামাজিক পরিচয়ের জন্য তাদের লড়াই। তাদের স্লোগান- সব দলিত আর পিছিয়ে পড়া মানুষরা এক, তা তারা হিন্দুই হোক আর মুসলমান। পিছিয়ে পড়া দলিত এবং উপজাতি সম্প্রদায়ের মুসলমানরা হলো, কুঞ্জরে, জুলহি, ধুনিয়া, কাসাই, ফকির, হাজ্জাম, মেহতার, গাওয়ালা, ধোবি, লোহার বাধহাই, দর্জি। পসমন্দা সম্প্রদায়ের অধীনে এরা এক হওয়ার স্বীকৃতি চায়।
১৯৯৮ সালে পসমন্দা মুসলিম মাহাজ তৈরি করেন আলি আনওয়ার। তিনি বিহারের পাটনার প্রাক্তন সাংসদ। তাঁর কথায়, পসমন্দা এই শব্দটা এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও জানান, কোয়েসি এবং আরএসএস পসমন্দাদের নিয়ে সম্প্রতি বৈঠক করেছে। এও কি ভোটের কারণে?
বিজেপির লক্ষ্য পসমন্দা ভোট
সম্প্রতি হায়দরাবাদে বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক বসে। সেখানে সব সম্প্রদায়ের অনগ্রসর এবং বঞ্চিত মানুষদের কাছে দলের কার্যকর্তাদের যাওয়ার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৯-এর নির্বাচনে নির্বাচনে জিতে `সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ ধ্বনি তুলেছিলেন তিনি। তা বাস্তবায়নের বার্তা দেন। এরপরই দলের তরফে নীল নকশা তৈরির কাজ শুরু হয়েছ। এর পিছনে বিজেপির নির্বাচনী রাজনীতি কাজ করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ উত্তরপ্রদেশ থেকে লোকসভার আসনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে এতদিন সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকাংশই বিজেপি-বিরোধী শিবিরে ভোটদান করতেন। কিন্তু বিধানসভা ও স্থানীয় নির্বাচনে সম্প্রতি ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে। হায়দরাবাদে মোদির সামনে সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। অনগ্রসর মুসলমানদের গেরুয়া ছত্রছায়ায় টানার পক্ষে সওয়াল করেন বেশ কয়েকজন। সব দিক বিবেচনা করে সেই ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে দলীয় নেতৃত্ব। শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, বিহারেও পসমন্দা মুসলমানের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা শুরু করেছে গেরুয়া শিবির।
বিজেপির ট্রেডমার্ক হিন্দুত্ব, তাদেরও ঠেলায় পড়ে মুসলমানদের কাছে যেতে হচ্ছে, কারণ ভোট বড় বালাই!







