অজানা সৌরজগতের সন্ধান দিতে পারে দীর্ঘ পথ হাঁটা এই মহাকাশযান

তাদের যাত্রা চলতে থাকবে, অজানার পথে, অসীমের পথে, 'Interstellar Space'-এর মধ্য দিয়ে, যার ৯০ শতাংশই অন্ধকার, শীতল। যেখানে সূর্যের প্রভাব আর নেই।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
অজানা সৌরজগতের সন্ধান দিতে পারে দীর্ঘ পথ হাঁটা এই মহাকাশযান

মহাবিশ্বে, মহাকাশে, মহাকাল-মাঝে

আমি মানব, একাকী ভ্রমি, বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে

ভয়েজারের যদি একটা মন থাকত, যদি থাকত চেতনা, তাহলে হয়তো সৌরজগত ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে প্রবেশ করার পর এই কথাগুলিই গুনগুন করত সে। অতি সম্প্রতিকালের এক রিপোর্টও বলছে যে, মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পথ অতিক্রম করা এই মহাকাশযান হয়তো পথ হারিয়েছে। সে এখন মহাশূন্যে ভ্রমিছে বিস্ময়ে। সে ছুটে চলেছে অনন্তের পথে। হয়তো লক্ষ কোটি বছর পর কোনও সভ্যতা খুঁজে পাবে তাকে। ভয়েজারের মাধ্যমে তারা জানবে পৃথিবীর কথা, জানবে মানবসভ্যতার কথা। হয়তো। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ততদিনে হয়তো মানুষ অতীত হয়ে যাবে, বা পৃথিবী ছাড়িয়ে পাড়ি দেবে ভিনগ্রহের উদ্দেশে। এই মহাকাশযানের ইতিহাসটা একটু ঘেঁটে দেখা যাক।

কথা হচ্ছে মহাকাশযান ভয়েজার ওয়ান এবং টু-কে নিয়ে। যাদের সঙ্গে আর হয়তো সর্বাধিক দশ বছর যোগাযোগ রাখা সম্ভব হবে। আজ থেকে ৪৪ বছর আগে সৌরজগতের দৈত্য, গ্যাস জায়েন্ট বৃহস্পতি এবং শনি এবং সেই সঙ্গে ইউরেনাস ও নেপচুনকে পর্যবেক্ষণ করতে এই দুই মহাকাশযানকে পাঠানো হয়, এবং শুরুতে উদ্দেশ্য এটা হলেও পরে ঠিক করা হয় যে, ওই চারটি গ্রহ পর্যবেক্ষণ করেই এদের যাত্রা শেষ হবে না। বরং তাদের যাত্রা চলতে থাকবে, অজানার পথে, অসীমের পথে, 'Interstellar Space'-এর মধ্য দিয়ে, যার ৯০ শতাংশই অন্ধকার, শীতল। যেখানে সূর্যের প্রভাব আর নেই।

১৯৭৭ সালে আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে এক বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সুবিধে নিয়ে ভয়েজার ওয়ান এবং টু-এর প্রক্ষেপণ হয়। সেই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা ছিল বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনের প্রায় এক সারিতে চলে আসা। যার ফলে তাদের মাধ্যাকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে দুই ভয়েজারই অনেক দ্রুত গতিতে তাদের পথ অতিক্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছে। সম্ভব হয়েছে অনেক সময়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে যাওয়া।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহাকাশে কীসের হৃদস্পন্দন? কোন রহস্যের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা?

১৩ জুলাই নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গবেষকরা জানালেন, একেবারে হৃদস্পন্দনের মতো রেডিও তরঙ্গ ধরা দিয়েছে কানাডার সুবিশাল টেলিস্কোপে। এমনটি এর আগে কখনও ধরা পড়েনি আবিশ্ব কোনও টেলিস্কোপেই।

এই মহাকাশযান আসলে বানানো হয়েছিল মাত্র পাঁচ বছরের জন্য। কথা ছিল, সৌরজগতের বিশাল চারটি গ্রহকে কাছ থেকে দেখে, তাদের বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হবে সে। পরে পরিকল্পনার পরিবর্তন হয়, এবং আজ ভয়েজার মহাকাশে ৪৪ বছর কাটিয়ে ফেলেছে। মহাকাশের নির্মম, রুক্ষ অবস্থা তাকে এখনও পর্যন্ত টলাতে পারেনি। হ্যাঁ, বেশিরভাগ যন্ত্রাংশই বন্ধ করে দিতে হয়েছে, যাতে তার জীবদ্দশা বৃদ্ধি করা যায়। এই প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়।

দিনটা ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০। বিজ্ঞানী কার্ল সাগান, যিনি এই প্রকল্পের অন্যতম কারিগর ছিলেন, তিনি নাসার কাছে এক বিশেষ অনুরোধ রাখলেন। ভয়েজার তখন শনিকে ছাড়িয়ে চলে গেছে। তিনি বললেন, ভয়েজারের ক্যামেরা একবার পৃথিবীর দিকে ঘোরানো হোক। ওই দূরত্ব থেকে পৃথিবীকে কেমন দেখায়, তা দেখার জন্য। শুরুতে নাসা রাজি হয়নি। ক্যামেরা পৃথিবীর দিকে ঘোরালে আশঙ্কা ছিল, তা সূর্যের রশ্মিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার। কিন্তু শেষমেষ ক্যামেরা ঘোরানো হয়, এবং ছবি ওঠে আমাদের পৃথিবীর। ৬ বিলিয়ন কিলোমিটার দূর থেকে। The Pale Blue Dot। মানবসভ্যতার ইতিহাসে তোলা সবথেকে শক্তিশালী এবং অর্থবহ ছবিগুলির মধ্যে একটা। যে ছবি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমরা ঠিক কতটা ক্ষুদ্র। রাতের আকাশে গ্রহ, তারা, সবকিছুকে যেমন একটি বিন্দুর আকারে আমরা দেখি, ৬ বিলিয়ন কিলোমিটার দূর থেকেও পৃথিবীকে ঠিক ওইরকমই দেখায়। ছোট্ট একটি বিন্দু।

ভয়েজার এখন আমাদের সৌরজগত ছাড়িয়ে চলে গেছে। শুরুতেই লিখেছিলাম সে পথ হারিয়েছে। না, নির্দিষ্ট কোনও গন্তব্য যদিও নেই তার। তবে সব ঠিকঠাক থাকলে এসি+৭৯৩৮৮ নামক এক নক্ষত্রের পরিবারে পৌঁছবে ভয়েজার। সময় লাগবে ৪০,০০০ বছর।

কিছুদিন আগের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজ্ঞানীরা কিছু অসামঞ্জস্য লক্ষ করেছেন। ভয়েজারকে যে সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে অ্যাটিটিউড আর্টিকুলেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম। তার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ভয়েজারের কার্যকলাপ ঠিক মিলছে না। মনে হচ্ছে, এই মহাকাশযান নিজের অবস্থান সম্পর্কে একেবারেই নিশ্চিত নয়। তবে আশার আলো এটাই, যে ভয়েজারের অ্যান্টেনা এখনও পৃথিবীর দিকেই মুখ করে আছে, যা আমাদের তথ্য পাঠায়। এই মুহূর্তে ভয়েজার পৃথিবী থেকে যে দূরত্বে আছে, তাতে তথ্য আদানপ্রদান করতে প্রায় দু'দিন লাগে। সেই তথ্য আদানপ্রদান করার জন্য যে সিগন্যাল প্রয়োজন, তা এখনও শক্তিশালী। তাই এখনও কিছু বছর আমাদের হাতে সময় আছে।

কিন্তু তা খুব বেশি নয়। ভয়েজার শক্তি পায় তার সিস্টেমে থাকা রেডিও-আইসোটোপ থার্মো-ইলেকট্রিক জেনারেটর থেকে, যা কাজ করে প্লুটোনিয়াম থেকে পাওয়া শক্তির মাধ্যমে। অর্থাৎ, এখানে প্লুটোনিয়াম জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। সেই জ্বালানিও আর বেশি দিন থাকা সম্ভব নয়। তারপরেই চিরতরে এই মহাকাশযানের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবে নাসার, তথা মানবজাতির।

তারপর কোনও সভ্যতা যদি খুঁজে পায় তাকে অক্ষত অবস্থায়, তাহলে হয়তো শুনবে মানুষের কণ্ঠ, দেখবে মানুষের ছবি। সবই পাঠানো রয়েছে ভয়েজারের সঙ্গে। এই আশায় যে, একদিন ভয়েজারই সেই যোগাযোগ স্থাপন করবে, যা করার জন্য অধীর আগ্রহে কাজ করে চলেছেন বিজ্ঞানীরা।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।