প্রথম দফার ভোটে নজর যেসব হাই-প্রোফাইল আসনে
West Bengal Election 2026: ২৩ এপ্রিলের প্রথম দফার ভোট। উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল ও সীমান্ত জেলাগুলিতে কোন দল এগিয়ে? তৃণমূল কি তাদের জমি ধরে রাখতে পারবে, নাকি বিজেপি নতুন করে চাপে ফেলবে শাসক দলকে?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াই এখন তুঙ্গে। ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ভোট হবে ১৫২টি আসনে। এই দফাতেই কিছুটা স্পষ্ট হয়ে যাবে, রাজ্যের কোন অংশে কোন দল কতটা এগিয়ে রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের লড়াই কোন দিকে যেতে পারে। প্রথম দফার আসনগুলির মধ্যে রয়েছে জঙ্গলমহল, উত্তরবঙ্গ, সীমান্তবর্তী জেলা এবং দক্ষিণবঙ্গের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে প্রথম দফার ভোটই পরের দফার রাজনৈতিক মেজাজ অনেকটাই ঠিক করে দিতে পারে।
এই দফায় প্রায় ৩.৬ কোটিরও বেশি ভোটার ভোট দেবেন। ১৬টি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ভোটগ্রহণ হবে। এই দফার লড়াই মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথমত, উত্তরবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বিজেপি বনাম তৃণমূলের সরাসরি লড়াই। দ্বিতীয়ত, জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলে তৃণমূলের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা। তৃতীয়ত, কিছু আসনে বাম-কংগ্রেস জোট ও আইএসএফ-এর উপস্থিতি ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী লড়াই তৈরি করছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একসময় মনে করা হতো, বিজেপিই বুঝি এই ভোটব্যাঙ্কের আসল মালিক। কিন্তু সিএসডিএস-লোকনীতির কারোর একাধিপত্য নয়। বরং এটি এখন গভীর ও জটিল এক সমীকরণে বিভক্ত।
প্রথম দফায় সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে উত্তরবঙ্গের আসনগুলির দিকে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং এবং উত্তর দিনাজপুরের একাধিক আসনে বিজেপি আগের নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো ফল করেছিল। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা, রাজবংশী অধ্যুষিত অঞ্চল এবং চা-বাগান এলাকায় বিজেপির সংগঠন এখনও যথেষ্ট সক্রিয়। তবে গত পাঁচ বছরে তৃণমূল এই এলাকায় সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকার, স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্পকে সামনে রেখে তৃণমূল ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে। ফলে উত্তরবঙ্গের লড়াই আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
জঙ্গলমহলও এই দফার একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাক্ষেত্র। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের বহু আসনে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ঘুরে দাঁড়ায়। এবারও সেই অঞ্চলগুলিতে তৃণমূল তাদের উন্নয়নমূলক কাজ এবং আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বিজেপি কেন্দ্রীয় প্রকল্প, দুর্নীতি ইস্যু এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্ন তুলে ভোট চাইছে। ফলে জঙ্গলমহলে ভোটের ব্যবধান খুব কম হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Assembly Election 2026: পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা ভোটে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর কে? কার জনপ্রিয়তা, কার বিতর্ক, আর কার কৌশল বদলে দিতে পারে বাংলার ভোটের ফল?
প্রথম দফার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিল্পাঞ্চল এবং কয়লাঞ্চলের আসনগুলি। আসানসোল, দুর্গাপুর, রানিগঞ্জ, বার্নপুর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও শিল্পনির্ভর ভোটারদের প্রভাব বেশি। এই এলাকাগুলিতে বিজেপি গত কয়েক বছরে ভালো সংগঠন তৈরি করেছে। কিন্তু তৃণমূলও স্থানীয় নেতৃত্ব এবং উন্নয়নের ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। শিল্পাঞ্চলে বামেদেরও কিছু ঐতিহাসিক প্রভাব রয়েছে। ফলে এখানে বহু আসনে ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে।
এই নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইও বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। প্রথম দফার প্রার্থীদের নিয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে অনেক দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। বিজেপির ১৫২ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৯৬ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। তৃণমূলের ১৪৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। শুধু তাই নয়, বহু প্রার্থী কোটিপতি। তৃণমূলের বহু প্রার্থীর সম্পত্তির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। ফলে ভোটারদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে এই প্রার্থীরা কতটা গ্রহণযোগ্য।
এবারের ভোটে আরেকটি বড় ইস্যু হলো ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর। প্রথম দফার ১৫২টি আসনে প্রায় ৩৭ লক্ষ ভোটার কমে গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই ভোটারদের মধ্যে অনেকেই আদালতে গিয়েছেন এবং তাঁদের ভোটাধিকার ফেরানোর দাবি তুলেছেন। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, যাঁদের আবেদন ২১ এপ্রিলের মধ্যে গৃহীত হবে, তাঁরা প্রথম দফার ভোটে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু ভোটের এত কাছাকাছি সময়েও নির্বাচন কমিশন এখনও স্পষ্ট করে জানাতে পারেনি, কতজন ভোটার তালিকায় ফিরতে পারবেন। ফলে এই ইস্যু প্রথম দফার ভোটে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক সমীক্ষাগুলিতে এখনও তৃণমূলকে এগিয়ে রাখা হলেও বিজেপিও আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল ১৫০-র বেশি আসন পেতে পারে, আবার কিছু সমীক্ষায় বিজেপিকেও ১০০-র বেশি আসন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রথম দফার ফলাফলই বলে দেবে, বিজেপি আদৌ তৃণমূলের সঙ্গে সমানে টক্কর দিতে পারছে কি না। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং শিল্পাঞ্চলে বিজেপি যদি ভালো ফল করে, তাহলে পুরো নির্বাচনের লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠবে। আর যদি তৃণমূল এই এলাকাগুলিতেও এগিয়ে থাকে, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারে ফেরার পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে যাবে।






