মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কী? কেন বাংলাদেশের আগ্রহ?
Bangladesh and the Makkah Defence Pact: মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কী? এই চুক্তিতে যোগ দিলে ঢাকার কী কী সুবিধা হতে পারে? আবার পাকিস্তানের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা জোটে থাকলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে কী প্রভাব পড়তে পারে? এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিই বা কতটা?
মধ্যপ্রাচ্যের বদলে যাওয়া ভূরাজনীতির মধ্যে নতুন এক সামরিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান মিলে গড়ে তুলেছে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। আর সেই জোটে বাংলাদেশকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে সৌদি আরব। ঢাকার পক্ষ থেকেও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার কথা জানানো হয়েছে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আসলে কী? বাংলাদেশ কি তবে এবার আনুষ্ঠানিক ভাবে সামরিক জোটের অংশ হতে চলেছে? হলে তার লাভ কী? আর ঝুঁকিই বা কতটা?
বাংলাদেশের বিদেশনীতি ঐতিহাসিকভাবে ভারসাম্যের নীতির উপর দাঁড়িয়ে। ভারত, চিন, আমেরিকা, ইউরোপীয় দেশ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র—প্রত্যেকের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে ঢাকা। কোনো একটি সামরিক বা ভূরাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়া থেকে বরাবরই দূরত্ব বজায় রেখেছে। সেই জায়গা থেকেই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রথমেই জানা দরকার, এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আসলে কী? গত ৭ অগাস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান এই চুক্তিতে সই করে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘collective defence’ বা সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। অর্থাৎ তিন দেশের কোনো একটি দেশ সশস্ত্র হামলার শিকার হলে সেটিকে তিন দেশের উপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিষয়টি অনেকটাই ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারার সঙ্গে তুলনীয়। ন্যাটোতেও কোনো একটি সদস্য দেশের উপর আক্রমণকে গোটা জোটের উপর আক্রমণ হিসেবে দেখা হয়।
তবে মক্কা চুক্তিকে এখনই ন্যাটোর সমতুল্য ভাবার কারণ নেই। ন্যাটোর কাঠামো বহু পুরনো এবং অনেক বেশি সুসংগঠিত। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে এখনও স্পষ্ট নয়, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের ঠিক কী ধরনের সাহায্য করতে হবে। সরাসরি সেনা পাঠাতে হবে, নাকি অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, রসদ কিংবা কূটনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাশে দাঁড়ানো যাবে—তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই জোট তৈরি হলো কেন? তার উত্তর খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতার দিকে। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট এবং সৌদি আরবের উপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা রিয়াধকে নতুন করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব। পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি। অন্যদিকে তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং দ্রুত এগিয়ে চলেছে প্রতিরক্ষা শিল্প। ফলে তিন দেশের শক্তিকে এক জায়গায় আনার মধ্যে কৌশলগত যুক্তি রয়েছে।
তিন দেশের নেতারাই অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন, এই চুক্তি প্রতিরক্ষামূলক। কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এই জোট তৈরি হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো সামরিক জোটের গুরুত্ব শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সঙ্গে সেই জোটের সদস্যপদ, সামরিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
এবার প্রশ্ন, বাংলাদেশকে কেন এই জোটে চাইছে সৌদি আরব?
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটকে তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না এর উদ্যোক্তারা। তুরস্কের বিদেশমন্ত্রী হাকান ফিদানও জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশকে এই কাঠামোর মধ্যে আনার ইচ্ছে রয়েছে। মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, মুসলিম দেশগুলির মধ্যে যদি এমন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হয়, তা বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ ঢাকা এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে না। বরং ইতিবাচক মনোভাবেই বিষয়টি দেখছে। তবে বাংলাদেশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তবে এতদিন ঢাকা কোনো সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিয়েও একাধিক দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ভারত ও চিনের মতো পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
মক্কা জোটে যোগ দিলে সেই ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা সহজ হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করা আর একটি যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য হওয়া এক বিষয় নয়। দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা করা যায়। কিন্তু সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অন্য সদস্যের নিরাপত্তা সংকটও নিজের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
ধরা যাক, ভবিষ্যতে সৌদি আরব, তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো দেশের সামরিক সংঘাত হলো। সেই সংঘাত যদি মক্কা চুক্তির আওতায় পড়ে, তাহলে বাংলাদেশকে কী করতে হবে? ঢাকার সেনাবাহিনী কি সেখানে যাবে? অস্ত্র পাঠাতে হবে? নাকি শুধু কূটনৈতিক সমর্থনই যথেষ্ট হবে? বাংলাদেশ কি নিজস্ব পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিরপেক্ষ থাকতে পারবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
আর এখানেই সম্ভাব্য ঝুঁকি। বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের থেকে অনেকটাই আলাদা। সৌদি আরবের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে। তুরস্কের নিরাপত্তা স্বার্থ ছড়িয়ে রয়েছে সিরিয়া এবং আশপাশের অঞ্চলে। পাকিস্তানের প্রধান কৌশলগত বাস্তবতা আবার দক্ষিণ এশিয়াকে ঘিরে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা সমস্যা এই তিন দেশের কোনোটির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
তাই বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই জোটে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ ঠিক কোন নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করবে?
শুধু পাকিস্তান, তুরস্ক বা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে বলে একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া যথেষ্ট যুক্তি নয়। বাংলাদেশের দেখতে হবে, এর বিনিময়ে বাস্তবে কী পাওয়া যাচ্ছে এবং কী ধরনের দায় নিতে হচ্ছে।
অবশ্য লাভের সম্ভাবনাও কম নয়। তুরস্কের উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প, পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, অস্ত্র উৎপাদন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের জন্যও এটি নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার অর্থ শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নয়। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক নাগরিক সৌদি আরবে কর্মরত। ফলে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই সম্ভাব্য লাভগুলি এখনও অনেকটাই তাত্ত্বিক। মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ ঠিক কী সুবিধা পাবে, তার নির্দিষ্ট কোনো কাঠামো এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে লাভের হিসাব যেমন পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, তেমনই দায়িত্বের হিসাবও স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভারত। কারণ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পাকিস্তান। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই নানা কারণে সংবেদনশীল। সীমান্ত, রাজনৈতিক বিষয় এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ-সহ একাধিক প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নয়াদিল্লির কাছে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ভারত কী ভাববে, তার উপর নির্ভর করা উচিত নয়। ঢাকার নিজের জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্যি যে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলে ফেলার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
বিশেষ করে যদি ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাত তৈরি হয়, তখন মক্কা জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতি কীভাবে কাজ করবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হবে? নাকি প্রতিটি সদস্য নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? প্রকাশ্যে আসা চুক্তির তথ্য থেকে এখনও তার স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ অতীতেও সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংক্রান্ত আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক কুয়েত আক্রমণ করার পর সৌদি আরব মুসলিম দেশগুলির কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল। তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা পাঠিয়েছিলেন। বাংলাদেশি বাহিনী সরাসরি যুদ্ধের প্রথম সারিতে অংশ নেয়নি। পরে কুয়েতে নিরাপত্তা এবং মাইন অপসারণের কাজে অংশ নেয়।
কিন্তু সেই পরিস্থিতি এবং আজকের পরিস্থিতির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সংকটে সেনা পাঠানো আর একটি স্থায়ী সম্মিলিত প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া এক নয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের সংঘাতের ক্ষেত্রেও দায় তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ কি নিজের পুরনো ভারসাম্যপূর্ণ বিদেশনীতি ধরে রাখতে পারবে? কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে ঢাকার দায়িত্ব কী হবে? জোটের কোনো সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ কতটা স্বাধীন থাকবে? ভবিষ্যতে এই জোটে আরও দেশ যোগ দিলে পরিস্থিতি কতটা বদলাবে? আর সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য এই জোট আদৌ কতটা প্রয়োজন?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ সামরিক জোটে যোগ দেওয়া শুধুমাত্র বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দায়বদ্ধতা। মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে সেই ভারসাম্য কতটা রক্ষা করা সম্ভব হবে, শেষ পর্যন্ত সেটিই নির্ধারণ করবে এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক, আর কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।








