চিদানন্দ দাশগুপ্ত থেকে অনুপমা চোপড়া ফিল্মরিভিউয়ার আর ফিল্মক্রিটিক আলাদা কোথায়?

Film Reviewer and Film Critic : ফিল্ম রিভিউয়ার কোনো সিনেমা সম্পর্কে তাঁর মতামত জানান, সেই সিনেমাটি রিলিজের পরপরই। তাঁর সেই মতামতের মধ্যে থাকে সিনেমাটি সম্পর্কে এক তাৎক্ষণিক আলোচনা।

Abhirup Mukhopadhyay
৪ মিনিট
চিদানন্দ দাশগুপ্ত থেকে অনুপমা চোপড়া ফিল্মরিভিউয়ার আর ফিল্মক্রিটিক আলাদা কোথায়?

ফিল্মরিভিউয়ার ও ফিল্মক্রিটিক— এ-দুয়ের মধ্যে রয়েছে এক বিভাজনরেখা। কাকে বলব ফিল্ম রিভিউয়ার? আর কাকেই-বা বলব ফিল্মক্রিটিক? দু-জনেই কি এক? না। কেন এক নয়? ফিল্ম রিভিউয়ার কোনো সিনেমা সম্পর্কে তাঁর মতামত জানান, সেই সিনেমাটি রিলিজের পরপরই। তাঁর সেই মতামতের মধ্যে থাকে সিনেমাটি সম্পর্কে এক তাৎক্ষণিক আলোচনা। সেই আলোচনার লক্ষ্য হল, দর্শককে সিনেমাটি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া। একজন ফিল্ম ক্রিটিক-এর সিনেমা-সম্পর্কিত লেখার উদ্দেশ্য ও পরিসর কিন্তু একজন ফিল্ম রিভিউয়ার-এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কোনও প্রাথমিক ধারণার বদলে সিনেমা সম্পর্কে নিজের বিস্তৃত পর্যবেক্ষণকে তুলে ধরাই ফিল্মক্রিটিক-এর কাজ। মৃত্যুর কিছু কাল আগে, চিদানন্দ দাশগুপ্ত সম্পর্কিত একটি ভাষণে পরিচালক শ্যাম বেনেগল বলেছিলেন:

I have to make this difference between a film critic and a film reviewer. A person who reviews films, is a person who is simply dealing with an audience, that is lightly audience of that particular film and the reviewer tells that audience of the basis of the readership profile…, the kind film that is, whether will they like it or won’t like it. So, that’s a job of a film reviewer.

এরপরই ফিল্মক্রিটিক, একজন ফিল্ম রিভিউয়ারের থেকে কীভাবে আলাদা হয়ে যান সে-সম্পর্কে স্পষ্টভাবে শ্যাম জানান:

But a film critic is actually analysing a film in the context of cinema itself and the evolution of the cinema is very important for that person to be aware of.

শ্যাম বেনেগেল-এর কথাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘analysing’ অর্থাৎ বিশ্লেষণ। সিনেমাকে দেখে, বুঝে, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করাই একজন ফিল্মক্রিটিক-এর প্রথম কর্তব্য। কিন্তু এটুকুই শুধু নয়। এর সঙ্গে শ্যাম যুক্ত করেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ। ফিল্মক্রিটিক যখন একটি ছবি রিভিউ করছেন তখন সে-ছবির সঙ্গে-সঙ্গে তাঁকে বিশ্বসিনেমা সম্পর্কে একটি সজাগ ধারণা নিজের ভেতরে সতেজ রাখতে হবে। এর দ্বারাই, তিনি পৌঁছে যেতে পারবেন একটি তুলনামূলক আলোচনা দিকে। অর্থাৎ শুধু একটি নির্দিষ্ট ছবির বিশ্লেষণ নয়, সেই ছবিকে সারা পৃথিবীর সিনেমা ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাও ফিল্মক্রিটিক-এর কাজ।

শ্যাম বেলেগল ফিল্ম রিভিউয়ার-এর প্রসঙ্গে যা বললেন, তেমন রিভিউ প্রায়শই পড়তে পাই আমরা। বাংলা কিংবা দেশের অন্যান্য ছবির ক্ষেত্রে এই তাৎক্ষনিক ফিল্ম রিভিউ-এর চল এখন সব চেয়ে বেশি। এমনকী, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতেও অবাধে চলে এই রিভিউচর্চা। কী কী থাকে এই সব রিভিউ-তে? ছবিটির গল্প, গান, নায়ক নায়িকাদের অভিনয়, অ্যাকশন, কমেডি। ইতিহাস-আশ্রিত ছবি হলে, সেই ইতিহাস মানা হল কিনা, সেই নিয়ে প্রশ্নগুচ্ছ। কোনো উপন্যাস থেকে ছবি হলে, মূলকাহিনি থেকে সিনেমার গল্প কতদূর সরেছে সেই নিয়ে আক্ষেপ! কিন্তু এগুলির একটিকেও যথার্থ সমালোচনা বলা যায় না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নিরাপদ নির্মাণ: শ্যাম বেনেগালের সিনেমা

Shyam Benegal: যখন নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জীবনীচিত্রের কথা ওঠে তখন তিনি বাঙালি চিত্তের মিশেল দিয়ে ফরগটেন হিরো তৈরি করেন কিন্তু তাতে তাঁর নিজের সংরক্তি কতটুকু?

শ্যাম বেনেগল

যেমন, অনেক সময় কোনো কবিতা, বা কোনো উপন্যাস, কিংবা গান প্রথমবারেই তার সম্পূর্ণ অর্থ আমাদের সামনে উন্মোচন করে না। অভিজ্ঞতার স্রোতে ধীরে-ধীরে সেই সমস্ত শিল্পের কাছে পৌঁছোতে হয় আমাদের। তেমনভাবেই একটি ছবিকে, কেবল একবার দেখেই তার বিবিধ চরিত্রগুণ কি বলে দেওয়া যায়? এ কি সম্ভব? না। ঠিক এখানেই দরকার হয় একজন ফিল্ম ক্রিটিক-এর উপস্থিতি। যিনি একটি ছবি সম্পর্কে লেখার সময়ে, পৃথিবীর চলচ্চিত্রের বিরাট ইতিহাসকে নিজের মধ্যে জাগিয়ে রাখেন। কেবল ত্রুটিসন্ধান অথবা প্রশংসা নয়, বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিল্পেরএক আনন্দভূমিতে আমাদের পৌঁছে দেওয়াই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর আলোচনার প্রধান কাজ।

চিদানন্দ দাশগুপ্ত

এমনই একজন চিত্র-সমালোচক ছিলেন চিদানন্দ দাশগুপ্ত। আমাদের দেশের চলচ্চিত্র সমালোচকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর লেখায় চলচ্চিত্রের সর্বাঙ্গীণ আলোচনা সব সময় স্পর্শ করে থাকত এক নিরপেক্ষ দৃষ্টিকে। সিনেমা সম্পর্কে তাঁর চিন্তা ছিল স্পষ্ট ও নির্ভীক। এখন যে আমরা সেন্সরশিপ-এর ছুৎমার্গ নিয়ে এত কথাবার্তা বলি, বহু বছর আগে এ-সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে চিদানন্দ বলেছিলেন:

আমাদের সেন্সরশিপেরও মাথামুণ্ডু নেই। কামশাস্ত্র, বাৎস্যায়নের দেশে অত ভিকটোরিয়ানদের মতো নাক উঁচু হলে চলবে না; ইংরেজ মিশনারিরা ঊনবিংশ শতাব্দীতে যা শিখিয়ে গেছে তাই আমাদের ধর্ম হয়ে গেছে, এটা তো আমাদের নিজেদের নয়।

এই একই সাক্ষাৎকারে একজন চলচ্চিত্রকার ও একজন চলচ্চিত্র সমালোচকের মধ্যের ভেদাভেদ সম্পর্কে চিদানন্দ দাশগুপ্ত বলেছিলেন:

চলচ্চিত্রকার আর সমালোচকের একটা তফাত আছে। একজন চলচ্চিত্রকার যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যে ধরনের ছবি করতে ভালোবাসে সেই জিনিস যদি অন্য চলচ্চিত্রকারের মধ্যে দেখে তাহলে তার কাজের প্রতি অনুরাগ জন্মায় কিন্তু বিপরীতধর্মী কাজ দেখলে সব সময় হয় না, অনেক ক্ষেত্রেই হয় না। অন্য ঢঙের ছবি দেখলে একটা অবজ্ঞা দেখা যায়। চলচ্চিত্র সমালোচকের কিন্তু সব ধরনের ছবি সম্পর্কে সমান শ্রদ্ধা থাকে। যেখানেই সে দেখেছে একটা সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ পাচ্ছে সেটা যে ঢঙেই হোক যে দৃষ্টিভঙ্গিতেই হোক যে শিল্পরীতিতেই হোক তাতে তার কিছু এসে যায় না। তার কাছে বিরাট কিছু ব্যাপার হিসেবে সেটা আসে না। কিন্তু চলচ্চিত্রকারদের কাছে সেটা বিরাট হয়েই আসে। সে নিজের জিনিসটা বোঝে, কিন্তু অপরেরটা বুঝতে চায় না।

'চলচ্চিত্র সমালোচকের কিন্তু সব ধরনের ছবি সম্পর্কে সমান শ্রদ্ধা থাকে' এই কথাটি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ! আজকের দিনে কোনো সিনেমা বেরনো মাত্র যে রিভিউগুলি পড়তে পাই আমরা সেগুলির মধ্যে কি গভীরে গিয়েকোনো দেখা থাকে? হয়তো না।

অনুপমা চোপড়া

কয়েকজন আছেন যাঁরা বহু বছর ধরে ফিল্মরিভিউকে ফিল্ম ক্রিটিসিজম-এর কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। যেমন, অনুপমা চোপড়া, রাজীব মাসান্দ। এঁরাও কোনো ছবি বেরনো মাত্র রিভিউ করেন, কিন্তু সে রিভিউ-র মধ্যে সারা পৃথিবীর ছবি দেখার অভিজ্ঞতা মিলেমিশে থাকে।

রাজীব মাসান্দ

যে-দুজনের নাম করলাম, এরকম আরও কয়েকজন আছেন হয়তো। কিন্তু বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে এই দুর্দশা চোখে পড়ার মতো! তবে কি কেবল সিনেমার বহিরঙ্গের কতগুলি বিষয়ের ভালো-মন্দ বিচার করে (নিজের ইচ্ছেমতো) দিন কেটে যাবে বাংলা সিনেমার? একথা ভাববার সময় বোধহয় এসেছে!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।