বাংলায় আর শোনা যাবে না দিলীপ-বাণী! কেন এমন সিদ্ধান্ত দিল্লির?

বঙ্গ-বিজেপির সর্বাঙ্গে যখন দলত্যাগের ভাইরাস জাঁকিয়ে বসেছে, আদি-নব্য কোন্দলে গেরুয়া ভবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যখন 'ফাটল', ঠিক সেই সময় হঠাৎই দলের অফিসিয়াল গোষ্ঠীকে অগ্নিপরীক্ষার মুখে কেন ঠেলে দিলেন গেরুয়া শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব? এই প্রশ্নই আজ বড়ভাবে দেখা দিয়েছে গেরুয়া শিবিরে।

 

কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব জানিয়ে দিয়েছে, আর বাংলায় নয়, এখন থেকে প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, মেঘালয়, মণিপুর, অসম, ত্রিপুরা ও আন্দামানের সংগঠন দেখভাল করবেন। এর ফলে বাংলার রাজনীতিতে আর সেভাবে দেখা যাবে না দিলীপ ঘোষকে, শোনা যাবে না প্রতিদিন মর্নিং ওয়াকের সময় বিতরণ করা দিলীপ-বাণী। 'আদি' দিলীপবাবুকে সরিয়ে এ-রাজ্যে সংগঠন শক্তিশালী করে তোলার দায়িত্ব একচ্ছত্রভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে নব্য, অনভিজ্ঞ শুভেন্দু-সুকান্ত জুটির হাতে।

 

এই ঘোষণা প্রকাশ্যে আসার পরই জল্পনা শুরু হয়েছে, তাহলে কি ছক কষেই বঙ্গ বিজেপির সফলতম সভাপতি দিলীপ ঘোষের সঙ্গে রাজ্য রাজনীতির দূরত্ব বাড়িয়ে দেওয়া হলো? না কি, দিল্লি দেখতে চায় নানা সমস্যায় দীর্ণ বাংলার বিজেপিকে সুস্থ-স্বাভাবিক করে তোলার যোগ্যতা শুভেন্দু-সুকান্ত জোড়ির কতখানি আছে? দিল্লির কিছু একটা পরিকল্পনা তো অবশ্যই আছে, না হলে দুম করে নব্য নেতাদের হাতে দলকে 'শক্তিশালী' করার ভার কেন দেওয়া হলো? কেনই বা ভিন রাজ্যের 'বুথ সশক্তিকরণ অভিযান'-এর মোড়কে বাংলা কমিটির মাথার ওপর থেকে দিলীপ ঘোষ নামক ছাতাটি সরিয়ে নেওয়া হলো?

 

আরও পড়ুন: পরপর দলত্যাগ, নেতৃত্বের অভাব! কেন এমন অবস্থা হল বঙ্গ বিজেপির?

 

গেরুয়া-অন্দরের নানা মুনি নানা অভিমত প্রকাশ করছেন৷ এই ঘটনায় বেজায় খুশি বঙ্গ বিজেপির দিলীপ-বিরোধী শিবির। তাঁদের কথায়, সভাপতির পদ থেকে সরানোর পর থেকে একটি দিনও এমন যায়নি যেদিন দিলীপ ঘোষ রাজ্য সভাপতি বা অফিসিয়াল গোষ্ঠীর প্রকাশ্য সমালোচনা করেননি। এর ফলে রাজ্যের নিচুতলার নেতা-কর্মী মহলে ভুল বার্তা গিয়েছে। দলের অভ্যন্তর যে 'বেসুরো', তা স্পষ্ট হয়েছে। দিলীপ ঘোষের নানা মন্তব্য লুফে নিয়ে বিজেপিকেই আক্রমণ করেছে বিরোধী পক্ষ। ফলে দলের ভেতর এবং বাইরে ধীরে ধীরে ক্ষুন্ন হচ্ছিল অফিসিয়াল গোষ্ঠীর ভাবমূর্তি। সামগ্রিকভাবেই জনমানসে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছিল বিজেপি। দিলীপ-বিরোধী লবি এখন প্রকাশ্যেই বলছে দফায় দফায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে এসব জানানো হয়েছিল। দিল্লির নেতারা এবার ব্যবস্থা নিয়েছেন। মোটের ওপর এই গোষ্ঠী বেজায় খুশি, দিলীপ ঘোষকে তো 'টাইট' দেওয়া গিয়েছে!

 

একুশের বিধানসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না হওয়ার পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দুম করে দিলীপ ঘোষকে রাজ্য সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি করা হয়। কিন্তু এতদিন নির্দিষ্টভাবে কোনও দায়িত্বই তাঁকে দেওয়া হয়নি। বাংলাতে নয়, অন্য কোনও রাজ্যেও নয়। এতদিন দিলীপবাবু নিজের খেয়ালেই বাংলায় দলের কাজ করেছেন। এর ফলে ক্রমশই তাঁর সঙ্গে অফিসিয়াল গোষ্ঠীর দূরত্ব বাড়ছিল। রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন দিলীপ, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে 'জেলার নেতা' বলেছিলেন‌। ফলে বিতর্ক তৈরি হয়। এই নিয়ে দিলীপের বিরুদ্ধে শাসক শিবির দিল্লিতে নালিশ করেছে। শোনা গিয়েছে নাড্ডা, শাহ-রাও অসন্তুষ্ট হন দিলীপের প্রতি। ঠিক সেই আবহে দিলীপ ঘোষকে ভিন রাজ্যের সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তাই অনেকেই তাঁকে রাজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া বলে চিহ্নিত করছেন।

 

ওদিকে কিন্তু দিলীপ ঘোষ লবিও খুব খুশি। দিলীপ-পন্থীদের বক্তব্য, জাতীয় বিজেপিতে তো অনেক সহ-সভাপতি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেন শুধু দিলীপকেই বাছা হলো, তা খতিয়ে দেখতেই হবে‌। নিজের যোগ্যতার নিরিখেই এই গুরুদায়িত্ব আদায় করেছেন দিলীপ। এই ঘোষণা আসলে দিলীপের রাজনৈতিক উত্থান। তৃণমূলে ফেরার আগে দীর্ঘ দিন সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ছিলেন মুকুল রায়। কই তখন তো দল মুকুলকে কোনও দায়িত্ব দেয়নি? এবার বাংলার বাইরে ৮ রাজ্যের দায়িত্ব পেলেন দিলীপ। দিল্লির নেতাদের এই সিদ্ধান্তেই স্পষ্ট হয়েছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ঠিক কতখানি ভরসা করেন দিলীপ ঘোষকে। তা না হলে একধাক্কায় ৮ রাজ্যের দায়িত্ব দিলীপ ঘোষ পেতেন না কি? দিলীপ-লবির বক্তব্য, এবার রাজ্য বিজেপির শাসক গোষ্ঠী বুঝবে কত ধানে কত চাল! দু'তরফের এই কার্পেট-বম্বিংয়েই পরিষ্কার হচ্ছে, রাজ্য বিজেপিতে গোষ্ঠী কোন্দল ঠিক কতখানি ছিল এবং এখনও কতখানি রয়েছে।

 

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৬ মে তারিখেই প্রথম বার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন নরেন্দ্র মোদি। বুধবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৮ বছর পূর্ণ করলেন মোদি। তাই ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে বুধবার থেকেই বুথ স্তরে দলের সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ শুরু করে দিয়েছে বিজেপি। এদিন পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশের বিজেপি সাংসদ, বিধায়কদের নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন দলের জাতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা। এই বৈঠকেই ঘোষণা করা হয়েছে, বুথ স্তরে সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ প্রথম পর্যায়ে আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত দেশজুড়েই চলবে। আর এই কাজে বাংলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, দিনকয়েক আগে রাজ্য সফরে এসে শাহ বঙ্গ-নেতাদের বলে গিয়েছেন, বুথ স্তরে বাড়াতে হবে শক্তি। বুথভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলতে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন তিনি। বিজেপি সূত্রে খবর, বৈঠকে নাড্ডা সব রাজ্যের নেতা, সাংসদ, বিধায়কদের নির্দেশ দিয়েছেন, নিজের নিজের এলাকার দুর্বল ২৫টি বুথে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে প্রত্যেক বিধায়ককে। আর সাংসদদের দায়িত্ব নিতে হবে দুর্বল ১০০টি বুথের। এই কর্মসূচি যাতে সঠিকভাবে পালন হয়, তা দেখতে জুন মাসের গোড়াতেই রাজ্যে আসতে পারেন নাড্ডা। ওদিকে আগেই ঘোষণা হয়েছে, জুলাইতে ফের রাজ্যে আসবেন শাহ। তবে তার আগেই বুথে বুথে দলীয় নেতৃত্ব এই কর্মসূচি পালনে কেমন কাজ করেছে, তার রিপোর্ট স্বয়ং শাহ দেখবেন বলে জানা গিয়েছে। গেরুয়া শিবির সূত্রে খবর, আগামী ৭ ও ৮ জুন বাংলায় আসতে পারেন নাড্ডা। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করে কর্মসূচির অগ্রগতি খতিয়ে দেখতেই তাঁর এই সফর। জানা গিয়েছে, বুধবারের বৈঠকে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছেন মেদিনীপুরের সাংসদ তথা বঙ্গ-বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ। দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরে ডাকা ওই বৈঠকে প্রারম্ভিক বক্তৃতা করেন সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি দিলীপ ঘোষই। তখনই সর্বভারতীয় সভপতি জানান, সহ-সভাপতি দিলীপকে নিজের লোকসভা এলাকার পাশাপাশি ৮ রাজ্যে এই কর্মসূচি সফল করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

বিজেপির এই ধরনের ‘বুথ সশক্তিকরণ অভিযান’ এবারই প্রথম নয়। অতীতেও এমন কর্মসূচি নিয়েছে দিল্লির বিজেপি। তবে এই কর্মসূচি পালনে ঢালাও ফাঁকিবাজি করেছে দলের নেতা, সাংসদ, বিধায়করা, এমন রিপোর্টও জমা পড়েছে দিল্লিতে। দলের নেতারা চালাকি করে সেইসব বুথেই কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, যেগুলোতে আগে থেকেই দলের শক্তি রয়েছে। ফলে এবার সতর্ক শীর্ষ নেতৃত্ব৷ এবার আর বিধায়ক, সাংসদরা নিজেদের ইচ্ছেমতো বুথ বাছতে পারবেন না। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই বেছে দেবেন বুথ। প্রতিটি বিধানসভা বা লোকসভা এলাকায় যেসব বুথে ভোটে খারাপ ফল হয়েছে, এবার সেখানেই যেতে হবে নেতাদের। গড়তে হবে কমিটি। জানা গিয়েছে, লোকসভা নির্বাচনের আগে দফায় দফায় ‘বুথ সশক্তিকরণ অভিযান’ চলবে।

 

এদিকে, এই ‘বুথ সশক্তিকরণ অভিযান’ নিয়েই ফাঁপরে পড়তে চলেছে বঙ্গ বিজেপির রাজ্য কমিটি। দলীয় কোন্দলের জেরে এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি বহু জেলাতেই। দেখা গিয়েছে, বহু জেলায় রাজ্য নেতৃত্ব কমিটি ঘোষণা করামাত্রই রে রে করে উঠেছেন একাধিক রাজ্য নেতা। এমনকী, শুভেন্দু অধিকারীও পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা মণ্ডল কমিটি নিয়ে আপত্তি তোলায় তা স্থগিত হয়ে যায়। এবার দিলীপ-গোষ্ঠী কী করবে, তা বোঝা যাচ্ছে না। ওদিকে নাড্ডা নিজে আসবেন এই কর্মসূচির অগ্রগতি দেখতে। ওদিকে হয়তো দিলীপ গোষ্ঠীর সহযোগিতাও সেভাবে পাবেন না 'শুভেন্দু-সুকান্ত' গোষ্ঠী। আর এই কর্মসূচি সফল না করতে পারলে অফিসিয়াল লবি নিশ্চিতভাবেই দিল্লির কোপে পড়বে। এতদিন দিলীপ ঘোষদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার, অন্তর্ঘাতের নালিশ করেই নিজেদের ব্যর্থতা ঢেকেছেন 'শুভেন্দু-সুকান্ত' গোষ্ঠী।

 

এবার তো দিলীপ ঘোষ আর থাকছেন না। এবারই তো শুভেন্দু-সুকান্তর দক্ষতা, যোগ্যতার পরিচয় মিলবে, এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

 

More Articles

;