কেন হরমুজে সংঘাত বাড়লে সমস্যায় পড়বে বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থাও?

Strait of Hormuz: হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে শুধু তেল নয়, বিপদে পড়তে পারে বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থাও। সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবল দিয়েই চলে আন্তর্জাতিক ডেটার ৯৯ শতাংশ। যুদ্ধে এই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাহত হতে পারে ব্যাঙ্কিং, শেয়ার বাজার, ক্লাউড পরিষেবা ও ভারতের আইটি সেক্টর। কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ?

Tanvia Barua
৫ মিনিট
কেন হরমুজে সংঘাত বাড়লে সমস্যায় পড়বে বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থাও?

তেল পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব কমবেশি সবার জানা। বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। কিন্তু খুব কম জনেরই জানা, শুধু তেল নয়, বিশ্বের বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট তথ্যও এই সমুদ্রতলের কেবল দিয়ে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী শুধু জ্বালানির নয়, ডিজিটাল বিশ্বের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি ইরান ঘনিষ্ঠ মহলে এই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালীর নিচে থাকা সাবমেরিন ফাইবার-অপটিক কেবলগুলিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও টেলিকম দুনিয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ এই কেবলগুলির উপর নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ এবং বিশ্বের বহু দেশের ইন্টারনেট পরিষেবা, আর্থিক লেনদেন এবং ক্লাউড পরিষেবা।

সাধারণত ভাবা হয়, ইন্টারনেট মানেই স্যাটেলাইট বা ওয়্যারলেস প্রযুক্তি। বাস্তবে বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ডেটা সমুদ্রের তলদেশে বসানো ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে আদানপ্রদান হয়। ভিডিও কল, অনলাইন ব্যাঙ্কিং, শেয়ার বাজার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর পরিষেবা, ক্লাউড কম্পিউটিং—সবই এই কেবলের উপর নির্ভরশীল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হরমুজে সংকট: কেন তেলের দাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ভারত?

Hormuz Strait Crisis: ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর সরকার তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। তখন ভারতের তেল আমদানির নির্ভরতা ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। লক্ষ্য ছিল তা কমিয়ে দুই-তৃতীয়াংশে নামানো। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।

হরমুজ প্রণালীর নিচ দিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেবল গিয়েছে। এর মধ্যে AAE-1, FALCON এবং Gulf Bridge International-এর মতো নেটওয়ার্ক এশিয়া, উপসাগরীয় দেশ এবং ইউরোপকে যুক্ত করেছে। ভারত থেকেও পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপমুখী বিপুল ডেটা এই রুট ব্যবহার করে। ফলে এই কেবলগুলিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ভারতের ইন্টারনেট পরিষেবা, আন্তর্জাতিক ডেটা যোগাযোগ এবং অনলাইন পরিষেবাও প্রভাবিত হতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, কাতার এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলি নিজেদেরকে ডিজিটাল হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। বিশাল ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ক্লাউড পরিষেবা এই সমুদ্রতলের কেবলগুলির উপর নির্ভর করে। অর্থাৎ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট নয়, বহু বিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল অর্থনীতিও সমস্যায় পড়বে।

সাবমেরিন কেবল কাটার জন্য সব সময় সামরিক হামলার দরকার হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজ, নৌবাহিনীর গতিবিধি বা নোঙর টেনে যাওয়ার ফলে দুর্ঘটনাবশতও কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতীতে লোহিত সাগরে এমন ঘটনার ফলে একাধিক দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হয়েছিল। হরমুজের মতো ব্যস্ত জলপথে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খামেনি নিহত তবু বদলায়নি ক্ষমতার সমীকরণ! ট্রাম্পের ইরান পরিকল্পনা ভেস্তে গেল?

US Israel strike Iran: অনেক মার্কিন কৌশলবিদ মনে করেছিলেন, ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। কারণ গত কয়েক মাস ধরে দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দমনপীড়নের কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছিল। কিন্তু বিদেশি হামলার পর সেই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গিয়েছে।

যদি কোনো কেবল কেটে যায়, তা মেরামত করাও সহজ নয়। বিশেষ জাহাজ এনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ খুঁজে বের করতে হয়, তারপর সমুদ্রের তল থেকে কেবল তুলে এনে জোড়া লাগানো হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ মেরামতকারী জাহাজকে নিরাপত্তা ঝুঁকি, নৌ অবরোধ, মাইন এবং প্রশাসনিক অনুমতির মতো নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।

অনেকে মনে করেন, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট থাকলে এমন সমস্যা হবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্যাটেলাইট পরিষেবা এখনও সমুদ্রতলের কেবলের বিকল্প নয়। খরচ বেশি, গতি সীমিত এবং বিপুল ডেটা বহনের ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট যোগাযোগের মূল ভরসা এখনও সাবমেরিন কেবলই।

এর অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশাল। আজকের বিশ্ব অর্থনীতি মূলত ডিজিটাল নেটওয়ার্কের উপর দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক লেনদেন, শেয়ার বাজার, ই-কমার্স, বিমান সংরক্ষণ, কনটেইনার ট্র্যাকিং—সবকিছুই রিয়েল-টাইম ডেটার উপর নির্ভর করে।

ভারতের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে। দেশের আইটি সেক্টর, আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিং পরিষেবা, ক্লাউড নির্ভর ব্যবসা এবং অনলাইন আর্থিক লেনদেন পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে দ্রুত ডেটা সংযোগের উপর নির্ভরশীল। কেবল বিপর্যয়ের ফলে ইন্টারনেট ধীর হয়ে যাওয়া, পরিষেবায় বিলম্ব এবং ডেটা রাউটিং ব্যয়ের বৃদ্ধি ঘটতে পারে।

ফলত, এখন ইন্টারনেট ও তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা তেল পাইপলাইন বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ।

বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থা এবং টেলিকম অপারেটররা তাই বিকল্প রুট তৈরিতে জোর দিচ্ছে। ইজরায়েল-সহ একাধিক দেশ ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে নতুন সাবমেরিন কেবল বসানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে হরমুজের উপর নির্ভরতা কমানো যায়।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ফর্ম ৬ বদলের অনুমোদন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট: তাহলে বদল করল কে?

Supreme Court on Form 6 Changes: সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন আদালত অনুমোদন করেনি। তাহলে ফর্ম ৬-এ অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিল? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রয়োজনীয় নথি চেয়েছে আদালত।

ব্রাজিলের ভোটে লুলার ধাক্কা, ফ্লাভিওর উত্থান: কেন বদলাচ্ছে সমীকরণ?

Brazil presidential election 2026: প্রথম দফায় ফ্লাভিওর প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে থাকা ছিল কার্যত অপ্রত্যাশিত। কারণ, অধিকাংশ প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষাতেই লুলাকে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ভোটের এই সংখ্যার আড়ালে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো—কেন বোলসোনারোবাদ এখনও এতটা শক্তিশালী?

‘দিল্লিতে রক্ত ঝরলে কলকাতাও আঘাত পায়’: যাদবপুরে নেহা বোরার কণ্ঠে প্রতিরোধের ঐক্যের বার্তা

Neha Bora Jadavpur University: নেহার কথায়, “আমার গলার অবস্থা, আমার শরীরের অবস্থা যা—ঠিক একই পরিস্থিতি আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (SRFTI)। আর এই যন্ত্রণা যদি কেউ বুঝতে পারে, তবে দিল্লির রাজপথে যাদের রক্ত ঝরেছে, যাদবপুরে যাদের উপর হামলা হয়েছে, এসআরএফটিআই-তে যাদের উপর আক্রমণ হয়েছে—আমরাই একে অপরের ব্যথা সবচেয়ে ভালো বুঝি।”

‘যেই আসে লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’: আসলে কেমন শাসক ছিলেন আসলে লঙ্কেশ?

Ravana character analysis: ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন মানুষ কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামিতে জেরবার, তখন ১৮৬১ সালে প্রকাশিত 'মেঘনাদ বধ কাব্য' সমাজকে একদম গোড়া থেকে নাড়িয়ে দিল। শিক্ষিত যুবক সমাজকে ভাবতে বাধ্য করল এই মহাকাব্য।

‘ভাই’ থেকে ‘বিরোধী’, কুড়ি বছর পর ফের একসঙ্গে: SIR যেভাবে কাছে আনল উদ্ধব ও রাজকে

Uddhav Thackeray Raj Thackeray: জনসভা থেকে রাজ ঠাকরে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, বাদ পড়া এই দুই কোটি মানুষ আসলে কারা? দিল্লির দরবারে যখন এই বিষয়ে আলোচনা হবে, তখন সমস্ত রাজনৈতিক দলের উচিত এই এসআইআর প্রক্রিয়া পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানানো। একই সঙ্গে তিনি ইভিএমের বদলে পুরনো ব্যালট পেপারে ভোট করানোর জোরালো দাবি তোলেন।

গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে কংগ্রেসের ব্লুপ্রিন্ট কী?

Electoral demands of congress leaders: কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে ৩ সেপ্টেম্বর, সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি ‘অবৈধ প্রধানমন্ত্রী’, অমিত শাহ ‘অবৈধ মন্ত্রী’, সকল মুখ্যমন্ত্রীরা ‘অবৈধ’। কংগ্রেসের দাবি, লোকসভা ও সকল বিধানসভা ভেঙে ব্যালট পেপারে পুনঃনির্বাচন করানো হোক। এসআইআরে ১৩ কোটি নাগরিকের নাম বিলোপ, ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, ২০২৩-এর সিইসি নিয়োগ আইন চ্যালেঞ্জ, এই সকল বিষয় উঠে এসেছে সাংবাদিক সম্মেলনটিতে। সামনে রয়েছে ইন্ডিয়া ব্লকের দলগুলির ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের অফিসের দিকে পদযাত্রা। ইতোমধ্যে, কালই রাহুল গান্ধী দেশজুড়ে বিভিন্ন গণআন্দোলনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য ‘সত্যাগ্রহ’ নামক একটি ওয়েব প্ল্যাটফর্ম লঞ্চ করেছেন।

আরও চাপে জ্ঞানেশ কুমার, দু'দশকের পুরনো মামলায় নতুন করে তদন্তের নির্দেশ

Gyanesh Kumar Under Scrutiny: ২০০৬ সালে কেরলের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের সচিব থাকাকালীন জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে ফের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কেরল সরকার। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরোকে এই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

যন্তর মন্তর বিক্ষোভ: তিন মহিলা সাংবাদিকের হেনস্থার অভিযোগ, তদন্তে ক্রাইম ব্রাঞ্চ

Delhi Protest: দিল্লির যন্তর মন্তরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের খবর করতে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন তিন মহিলা সাংবাদিক। তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে দিল্লি পুলিশ। অভিযোগগুলি নিউ দিল্লি জেলা পুলিশ থেকে ক্রাইম ব্রাঞ্চের কামলা মার্কেট শাখায় পাঠানো হয়েছে।