একমাসে পাল্টে দিলেন সবকিছুই! রাজনীতিতেও ব্যবসাবুদ্ধি লাগে, প্রমাণ করছেন অর্জুন

দাবার চাল কখন উল্টে যাবে, বোঝার জো নেই। এমনই বস্তু রাজনীতি, যেখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। শেষ বলে কিছু হয় না। বাড়ির বৈঠকখানা থেকে ক্লাবঘর, অফিস ক্যান্টিনের চৌহদ্দি থেকে চায়ের দোকান, আম আদমির আড্ডা-মজলিশে ঘুরেফিরে আসে এমন আলোচনা। রাজনীতির প্রতি ঘৃণাভরেই এমন কথা বলে থাকি আমরা। আসলে রাজনীতিকদের ভোলবদলের বিলাসিতা মানুষকে রাগান্বিত করে, আহত করে। রবিবারের বারবেলায় সেই আঘাতে আরও একবার ক্ষতবিক্ষত আম বাঙালি। কারণ জনমানসের আক্ষেপের সেই সুরকে বর্ম করেই পদ্ম (BJP) থেকে ঘাসফুলে (TMC) পুনরাবির্ভূত হলেন (Arjun Singh)। আক্ষেপ নয়, বুক ঠুকে বললেন, ‘‘রাজনীতিতে সবকিছুই সম্ভব। শেষ বলে কিছু নেই।’’

 

হিন্দি বলয়ে ‘ঘর ওয়াপসি’ নিয়ে এমনিতে বাজার গরম করতে পটু ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। কিন্তু বাংলায় ডাহা ফেল তাদের চাণক্যনীতি। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল থেকে দলে দলে নেতা ভাঙিয়ে চমক দেওয়া গিয়েছিল বটে। কিন্তু ভোট মিটতেই অবস্থা তথৈবচ। মুকুল রায়, সব্যসাচী দত্ত, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়- একে একে তৃণমূলে ‘ঘর ওয়াপসি’ ঘটেছে বাঘা বাঘা নেতাদের। এমনকী, বিজেপির হাতে তৈরি বাবুল সুপ্রিয়কেও বঁড়শিতে গেঁথে নিয়েছে তৃণমূল। সেই তালিকায় নয়া সংযোজন অর্জুন সিং। তৃণমূলে একটানা দীর্ঘদিন থাকলেও, শিকড়ের টান বলে তেমন কিছু ছিল না। বরং মরশুমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিযায়ীর ভূমিকায় আগেও দেখা গিয়েছে তাঁকে।

 

সাতের দশকে নৈহাটি কলেজে পড়াকালীন রাজনীতিতে হাতে খড়ি অর্জুনের। বাবা সত্যনারায়ণ সিং কংগ্রেস করতেন। কংগ্রেসে নাম লিখিয়ে উত্তরাধিকার-সূত্রে প্রাপ্ত সেই ধারা বজায় রাখেন অর্জুন। হাতে-কলমে রাজনীতির শিক্ষা যদিও পাট কারখানার শ্রমিক দলে শামিল হয়ে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শ্রমিক নেতা এবং বামপন্থা-বিরোধী হিসেবে আত্মপ্রকাশ। ১৯৯৫-এর বিধানসভা নির্বাচনে ভাটপাড়ায় কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে কাউন্সিলর হন। হাওয়ার গতিবিধি টের পেয়ে ২০০১ সালে যোগদান তৃণমূলে, সিপিএম প্রার্থী রামপ্রসাদ কুন্ডুকে হারিয়ে সোজা বিধানসভায়। লোকসভা নির্বাচনের টিকিট পাওয়া নিয়ে ঝামেলার জেরে ২০১৯ সালে দলত্যাগের আগে পর্যন্ত ভাটপাড়ায় তৃণমূলের পতাকা ধরে রেখেছিলেন অর্জুন। দিনে দিনে শিল্পাঞ্চলের ‘বাহুবলী’ হয়ে ওঠেন তিনি।

 

আরও পড়ুন: অর্জুন সিংকো গুসসা কিঁউ আতা হ্যায়? ‘ঘর ওয়াপসি’ না অন্য কারণ?

 

বারাকপুর থেকে আগেও, ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অর্জুন। কিন্তু সিপিএম-এর তড়িৎবরণ তোপদারের কাছে পরাজিত হন। ফলে, বারাকপুরের সাংসদ হওয়ার বাসনা মুলতুবি রেখে তৃণমূলের হিন্দি শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, পাঞ্জাবের মতো রাজ্যে দলের রাশও তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতে। ভাটপাড়া পুরসভার চেয়ারম্যানও নিযুক্ত হন। কিন্তু মনের মধ্যে সাংসদ হওয়ার বাসান লালন করে রেখেছিলেন অর্জুন। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তাই একপ্রকার জেদ ধরেই বসেন। কিন্তু জোড়াফুল নেতৃত্ব দীনেশ ত্রিবেদিকে প্রার্থী করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। নবান্নে ডেকে অর্জুনকে সেই সময় নিরস্ত করার চেষ্টা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Mamata Banerjee)।

 

কিন্তু অর্জুন ছিলেন নাছোড়বান্দা। তাই তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে বেছে নেন বিজেপি-কে। ২০১৯ সালের ১৪ মার্চ গেরুয়া শিবিরে যোগ দেন সপুত্র অর্জুন। সেই সময় বিজেপি-তে থাকা মুকুল রায় এবং বাংলায় বিজেপি-র পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় অর্জুনকে যোগদান করান। অর্জুনের আত্মবিশ্বাসেরই জয় হয়। লোকসভা নির্বাচনে দীনেশকে হারিয়ে বারাকপুরের সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। উপনির্বাচনে ছেলে পবন সিংকেও জিতিয়ে আনেন। কিন্তু ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি-র ফলাফলই বুঝিয়ে দেয় শিল্পাঞ্চলে অর্জুনের সেই দাপট আর নেই। কারণ যাবতীয় হাঁকডাককে মিথ্যে প্রমাণ করে সাতটি আসনেই জয়ী হয় তৃণমূল। পৌর নির্বাচনেও সবুজ আবিরে ঢেকে যায় গোটা এলাকা।

 

তার পর থেকে অর্জুন এক প্রকার নিস্তেজই হয়েছিলেন এতদিন। এপ্রিলের মাঝে আচমকাই ঝাঁঝ বাড়াতে শুরু করেন তিনি। তবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে নয়, কেন্দ্রে নিজেরই দল বিজেপি-র সরকারের বিরুদ্ধে। কাঁচা পাটের দামের ঊর্ধ্বসীমা নিয়ে কেন্দ্রের সমালোচনায় সরব হন তিনি। পাটের দাম এবং জোগান নিয়ে সরাসরি নিশানা করেন কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী পীযূষ গয়ালকে। পাটশিল্পের সংকট মেটাতে চিঠি দেন মমতাকে। বিজেপি-তে থাকলেও, পাটশিল্পকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দেন অর্জুন। এর পর যথারীতি দিল্লিতে ডাক পড়ে তাঁর। দফায় দফায় বৈঠকে তাঁর মান ভাঙানোর চেষ্টা শুরু হয়। শেষমেশ অর্জুনের দাবি মেনেই পাটের দামের ঊর্ধ্বসীমা প্রত্যাহার করে নেয় কেন্দ্র।

 

কিন্তু তার পরেও মন ভেজেনি অর্জুনের। বরং প্রকাশ্যে রাজ্য বিজেপি-র বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেন তিনি। জানান, তৃণমূল থেকে বিজেপি-তে আসা লোকজনের কদর নেই বিজেপি-তে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপেই রাজনীতি সীমাবদ্ধ বঙ্গ বিজেপি-র। তৃণমূল স্তরে পৌঁছনো, লড়াই করার মানসিকতা নেই কারও। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অর্জুন। জানান, যাঁরা কাজ করতে পারেন, তাঁদের পদ নেই। দিল্লির অঙ্গুলিহেলন ছাড়া নড়ন-চড়নের অধিকারও নেই কারও। ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার করে রাখা হয়েছে তাঁকে।

 

স্বাভাবিকভাবেই অর্জুনের মতিগতি ভালো ঠেকছিল না বঙ্গ বিজেপি নেতাদের। সেই আবহেই শনিবার ট‍্যুইটারে শায়েরির আকারে সিদ্ধান্তের জানান দেন অর্জুন। আত্ম অহংকারে মগ্ন বিজেপি-তে থাকার চেয়ে, ঝড়ের কাছে নোঙর করা ঢের ভালো বলে লেখেন ট‍্যুইটারে। তাতেই মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায় তাঁর ভবিতব্য। ধনুক থেকে একেবারে মোক্ষম জায়গাতেই গিয়ে বেঁধে অর্জুনের তির। তাই অস্বস্তি ঢাকতে দিলীপ ঘোষকেও (Dilip Ghosh) বলতে হয় যে, অর্জুন দলে থেকেও কোনও লাভ হয়নি তাঁদের।

 

এরপর আর দায়বদ্ধতা দেখানোর তাগিদও অনুভব করেননি অর্জুন। রবিবার সকালে সটান কলকাতায় এসে হাজির হন। তাজ হোটেলে জিরিয়ে সন্ধেয় হাজির হন ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) দফতরে। সন্ধে গড়ানোর আগেই ফিরে আসেন পুরনো দলে। তিন বছর আগের সেই চেনা ঢঙেই জানিয়ে দেন, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ৪২টি আসনেই জয়ী হবে তৃণমূল। ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে বিজেপি জানায়, তৃণমূলের দাদাগিরিতে ব্যবসাপত্র লাটে উঠছিল অর্জুনের। আমদানি বন্ধের জোগাড় হয়েছিল। তাই মাথা নত করা ছাড়া উপায় ছিল না তাঁর। তবে বিজেপি নেতারা যা-ই বলুন, শুধু পণ্য ব্যবসা নয়, রাজনীতির কারবারেও যে সিদ্ধহস্ত অর্জুন, একমাসে সবকিছু পাল্টে দিতে পারেন, তা মানছেন রাজনীতির বোদ্ধারাও।

 

More Articles

;