দ্রুততার যুগে বেলা তারের ক্লান্তির দর্শন

Bela Tarr: তিনি বিশ্বাস করতেন, বাস্তবতা এতটাই জটিল যে তাকে সরল ভাষায় ধরা অসম্ভব। তাই তাঁর কাজ রাজনৈতিক হয়েও প্রচারমূলক নয়, মানবতাবাদী হয়েও আবেগপ্রবণ নয়। এই সংযমই তাঁর সিনেমাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

Tuhinangshu Mukherjee
৫ মিনিট
দ্রুততার যুগে বেলা তারের ক্লান্তির দর্শন

বেলা তার আর নেই—এই সংবাদটি এমন এক সময়ে এসে পৌঁছল, যখন সিনেমা নিজেই ক্রমশ নিজের অতীত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। দৃশ্য ছোট হচ্ছে, সময় ভাঙছে, অর্থ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, দর্শকের ধৈর্য কোনোভাবেই আর শিল্পের প্রত্যাশিত শর্ত নয়। এই বাস্তবতায় বেলা তারের মৃত্যু কেবল একজন বিশিষ্ট পরিচালকের প্রস্থান নয়; এটি নির্দিষ্ট একটা চলচ্চিত্র ভাবনার অনন্তের পথে যাত্রা, যা বিশ্বাস করত যে সিনেমা দ্রুততার এবং চটুলতার উদযাপন নয়, বরং সময়ের ভিতর দাঁড়িয়ে মানুষের অস্তিত্বকে সহ্য করার একটি কঠিন অভিজ্ঞতা।

বেলা তারের সিনেমা কখনও দর্শককে আরাম বা নাগাল দেয় না, তাঁর কাজ দেখার অভিজ্ঞতা কখনও অস্বস্তিকর, কখনও বিরক্তিকর এবং প্রায়শই ক্লান্তিকর ভাবে দর্শকের স্নায়ুর উপর প্রত্যক্ষ আঘাত। কিন্তু এই ক্লান্তি বা বিরক্তি কোনও ত্রুটি নয়; বরং সেটিই মূলত তাঁর কাজের প্রারম্ভিক শর্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবন স্বকীয় ভাবেই ক্লান্তিকর, পুনরাবৃত্ত, প্রায় ঘটনাহীন—এবং যদি সিনেমা সেই সত্যকে অস্বীকার করে, তবে তা বাস্তবতার সঙ্গে অসৎ আচরণ করা। তাই তাঁর ক্যামেরা থেমে থাকে, দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে, কিছু না ঘটলেও দৃশ্যপট ছাড়ে না। এই তাকিয়ে থাকার মধ্যেই তিনি মানুষের অস্তিত্বকে হাতড়ে যান, তার নাগাল পান এবং নাড়ির শব্দ ফেরাতে চান আমাদের গোপনে গোপনে। বেলা তারের চলচ্চিত্রচর্চার সবচেয়ে মৌলিক দিক ছিল সময়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। আধুনিক সিনেমা যেখানে সময়কে সংকুচিত করে, বেলা তার সেখানে সময়কে প্রসারিত করেছেন। তাঁর সিনেমায় সময় এগোয় না, সময় থেমে থাকে, প্রতিটি মুহূর্ত আগের মুহূর্তের ভারগ্রস্ত আচ্ছন্ন অবয়বে বিরাজ করতে থাকে, এই ভারই দর্শকের কাঁধে এসে পড়ে। ফলে সিনেমা আর শুধু দেখা নয়, এক ধরনের মানসিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে; এই দায়িত্ব নিতে না পারলে বেলা তারের সিনেমা অসহ্য বলে মনে হয়। কিন্তু যাঁরা এই দায়িত্ব নেন, তাঁদের কাছে সিনেমার জাদুদণ্ড অলৌকিক রমন নিয়ে আসে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

এই দর্শনের এক সংহত রূপ পাওয়া যায় 'Damnation'-এ। ছবিটির জগৎ ধূসর, বৃষ্টিভেজা, প্রায় অবসন্ন। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু মুক্তি নেই; আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু পূর্ণতা নেই। চরিত্ররা ছোট ছোট স্বার্থ, ঈর্ষা আর ব্যর্থতার মধ্যে ঘুরপাক খায়। বেলা তার এখানে কোনো নাটকীয় সংঘর্ষ তৈরি করেন না। বরং দীর্ঘ শটের মধ্য দিয়ে দেখান, কীভাবে মানুষ নিজের দুর্বলতার সঙ্গে ধীরে ধীরে আপস করে ফেলে। 'Damnation' আমাদের কোনো নৈতিক শিক্ষা দেয় না, কিন্তু এক ধরনের নৈতিক ক্লান্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়—যেখানে মানুষ জানে সে ভুল করছে, তবু থামতে পারে না। এই ক্লান্তি বেলা তারের সিনেমায় বারবার ফিরে আসে। তাঁর চরিত্ররা লড়াই করে না, বিপ্লব করে না, ইতিহাস বদলাতে চায় না; তারা শুধু টিকে থাকে। এই টিকে থাকার প্রক্রিয়াটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সিনেমা যেখানে নায়কোচিত পেশিমুখর রতিসুখে ধাবিত কিংবা আঁতেল মননের মধুযাপন, বেলা তার সেখানে নিষ্ক্রিয়তাকে, স্থবিরতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, মন্থরতাও এক ধরনের অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা, এবং তাকে অস্বীকার করা মানেই মানুষকে অস্বীকার করা, মানুষের জীবনকে অস্বীকার করা। এই ভাবনার চূড়ান্ত ও সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকাশ ঘটে 'Satantango'-তে। এই ছবিটি শুধু তার দৈর্ঘ্যের জন্য নয়, তার সময়বোধের জন্য অনন্য। সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একটি ভেঙে পড়া গ্রাম, তার বাসিন্দারা, তাদের প্রতীক্ষা, প্রতারণা এবং বিভ্রম—এই সব মিলিয়ে বেলা তার এমন এক জগৎ নির্মাণ করেন, যেখানে সময় আর সরলরেখায় এগোয় না। একই ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে ফিরে আসে, চরিত্ররা বারবার একই ভুল করে, আর দর্শক ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে এখানে কোনো চূড়ান্ত মুক্তি নেই। 'Satantango' দেখার অভিজ্ঞতা শারীরিক। দর্শক ক্লান্ত হয়, বিরক্ত হয়, এমনকি রেগেও যায়। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়াগুলিই ছবির অংশ। বেলা তার যেন ইচ্ছাকৃতভাবে দর্শককে সেই মানসিক অবস্থায় নিয়ে যান, যেখানে চরিত্ররা বাস করে। এই সমান্তরাল অভিজ্ঞতাই তাঁর সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি দর্শককে ছবির বাইরে রেখে গল্প বলেন না, তাদেরও ছবির ভিতরে ঢুকিয়ে দেন।

বেলা তারের 'Satantango' ছবির দৃশ্য

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পরাঙ্মুখ, হৃদয়ে দূরগামী; বেলা তার

Bela Tarr: তিনি চলচ্চিত্রকে কোনো মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দিতে চাননি। তাঁর মনে হয়েছিল তাঁর অন্তর্গত বেদনার কথা— আমরা যারা বেদনার সন্তান, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত এক গূঢ় ভাষায়।

বেলা তারের চলচ্চিত্রভুবনে 'Werckmeister Harmonies' একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণ তৈরি করে। এই ছবিতে তাঁর নান্দনিক শৈলী যেমন পরিপক্ব, তেমনই তাঁর দার্শনিক উদ্বেগ আরও স্পষ্ট ও সার্বজনীন হয়ে ওঠে। ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ছোট শহর, এক অদ্ভুত সার্কাস, একটি তিমির মৃতদেহ এবং এক রহস্যময় ‘প্রিন্স’-এর অনুপস্থিত উপস্থিতি—কিন্তু এই বাহ্যিক উপাদানগুলোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, কীভাবে বেলা তার শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার দ্বন্দ্বকে মানবসমাজের গভীরতম স্তরে নামিয়ে আনেন। সংগীতের ‘হারমনি’ এখানে নিছক সুরের বিষয় নয়; এটি এক আদর্শ সামাজিক ভারসাম্যের রূপক, যা বাস্তবে কখনও স্থায়ী হয় না। 'Werckmeister Harmonies-এর দীর্ঘ উদ্বোধনী শট—যেখানে একদল চরিত্র গ্রহ-নক্ষত্রের গতি বোঝাতে মানুষকে সাজিয়ে নেয়—বেলা তারের চিন্তার এক সংকেতবাক্য। এই দৃশ্য কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, কিন্তু দর্শককে জানিয়ে দেয় যে মানুষ নিজের শরীর দিয়েই মহাজাগতিক শৃঙ্খলা অনুকরণ করতে চায়, অথচ সেই শৃঙ্খলা শেষ পর্যন্ত ভেঙেই পড়ে। ছবির পরবর্তী অংশে যে গণহিংসা, উন্মত্ততা ও নিস্তব্ধতা আসে, তা কোনো রাজনৈতিক থ্রিলারের মতো নয়; বরং তা ধীরে ধীরে জন্ম নেওয়া এক নৈতিক শূন্যতার ফল। এখানে বেলা তার দেখান, সভ্যতা ভাঙে চিৎকার করে নয়, বরং খুব নীরবে—যখন মানুষ আর কোনো সামঞ্জস্যে বিশ্বাস করতে পারে না। এই ছবিতে বেলা তারের মানবতাবাদ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে অবস্থান করে। একদিকে রয়েছে ভিড়ের সহিংসতা, অন্যদিকে রয়েছে কিছু বিচ্ছিন্ন চরিত্র, যারা এখনও বোঝার চেষ্টা করে—কেন এই ভাঙন, কেন এই অস্থিরতা। কিন্তু বেলা তার কোনো পক্ষ নেন না। তিনি কাউকে নায়ক বানান না, কাউকে খলনায়কও বানান না। তার ক্যামেরা সমান দূরত্ব বজায় রাখে, যেন বলতে চায়, এই অরাজকতা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, এটি এক সামষ্টিক নৈতিক ক্লান্তির ফল।

বেলা তারের 'Werckmeister Harmonies' ছবির দৃশ্য

এই ক্লান্তির আরও নির্মম রূপ প্রকাশ পায় 'The Turin Horse'-এ। এখানে গল্প বলতে গেলে প্রায় কিছুই নেই। একজন বৃদ্ধ, তাঁর মেয়ে, একটি ঘোড়া—আর প্রতিদিনের একই কাজ। আলু সেদ্ধ করা, খাওয়া, জামা পরা, জানালা দিয়ে বাতাস দেখা। দিন আসে, দিন যায়। কিন্তু প্রতিদিন কিছু একটা কমে যায়—আলো, শব্দ, শক্তি। এই কমে যাওয়াই ছবির মূল বিষয়। 'The Turin Horse' কোনো কাহিনি নয়, এটি এক ধরনের অস্তিত্বগত অনুশীলন। বেলা তার এখানে সভ্যতার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চিত্র এঁকেছেন—যেখানে আর কিছু করার নেই, শুধু অভ্যাসের জোরে টিকে থাকা। এই ছবিতে বেলা তারের মানবতাবাদ সবচেয়ে নগ্নরূপে ধরা পড়ে। এখানে কোনো সহানুভূতির আবেদন নেই, কোনো আবেগের বিস্তার নেই। কিন্তু ঠিক এই নিরাসক্তির মধ্যেই রয়েছে গভীর মানবিক মর্যাদা। তিনি মানুষকে করুণার পাত্র বানাননি, নায়কও বানাননি। তিনি মানুষকে দেখিয়েছেন ঠিক যেমনটি সে আছে, তেমন ভাবেই—ক্লান্ত, সীমাবদ্ধ, কিন্তু তারপরও সংগ্রামরত, ক্ষীয়মান।

বেলা তারের 'The Turin Horse' ছবির দৃশ্য

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নধরের ভেলা: গতিময়তার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ

Nadharer Bhela Review: প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ছবিতে বারবার উঠে এসেছে গ্রাম্য লোকের ছাপোষা জীবন, মফসসলের মানুষদের খুচরো পয়সার যাপন, সর্বহারাদের এক মহাকাশ ভালবাসার কথা।

এই ছবিতে এসে বেলা তার যেন ইতিহাস, দর্শন ও মানবিক সহানুভূতির শেষ বিন্দুতে দাঁড়ান। নীটশের সেই বিখ্যাত মুহূর্ত—যেখানে এক দার্শনিক ঘোড়ার গলায় জড়িয়ে ধরে ভেঙে পড়েছিলেন—এখানে কোনো বর্ণনার বিষয় নয়, বরং এক নীরব পূর্বশর্ত। বেলা তার প্রশ্ন করেন না, নীটশে কী ভাবছিলেন; তিনি দেখান, সেই চিন্তার পর পৃথিবী কেমন হতে পারে। এখানে মানুষ আর ভাবনার ভার বহন করতে পারে না, সভ্যতা আর অর্থ উৎপাদন করতে পারে না। থাকে শুধু দৈনন্দিনতার কঙ্কাল—খাওয়া, পোশাক, বাতাস, আলো। সময় এগোয় না, সময় ক্ষয়ে যায়। প্রতিটি দিন আগের দিনের পুনরাবৃত্তি, কিন্তু সামান্য করে কমে আসা এক অস্তিত্বের দিকে যাত্রা। এই ক্ষয় কোনো বিপর্যয় নয়; এটি ধীর, অনিবার্য, প্রায় নির্বিকার। এই ছবিতে বেলা তারের মানবতাবাদ চরম সংযমে পৌঁছয়। তিনি দুঃখকে ব্যাখ্যা করেন না, দর্শককে সহানুভূতিতে প্রলুব্ধও করেন না। বৃদ্ধ মানুষটি ও তাঁর মেয়ের মধ্যে কোনো আদর্শিক সংলাপ নেই, কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা নেই। তবু এই নীরব সহাবস্থানই মানুষের শেষ নৈতিক অবস্থান। ঘোড়ার না চলা যেন কেবল প্রাণীর অবাধ্যতা নয়—এটি ইতিহাসের ক্লান্তি, যুক্তির অবসান, প্রগতির থেমে যাওয়া। আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাষাও অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এই ছবি কোনো উপসংহার টানে না; এটি আমাদের সঙ্গে বসে থাকে—অন্ধকারে, নীরবতায়। আর এই বসে থাকাটাই বেলা তারের সবচেয়ে মৌলিক দাবি—সভ্যতা শেষ পর্যন্ত আমাদের কিছু দেয় না, তবু আমরা তার ভিতর মানুষ হয়ে থাকার চেষ্টা ছেড়ে দিই না।

বেলা তারের এই অবস্থান তাঁকে সমসাময়িক রাজনৈতিক বা সামাজিক সিনেমা থেকে আলাদা করে। তিনি কখনও সরাসরি বক্তব্য দিতে চাননি। তাঁর সিনেমা স্লোগান দেয় না, দাবি তোলে না, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয় না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাস্তবতা এতটাই জটিল যে তাকে সরল ভাষায় ধরা অসম্ভব। তাই তাঁর কাজ রাজনৈতিক হয়েও প্রচারমূলক নয়, মানবতাবাদী হয়েও আবেগপ্রবণ নয়। এই সংযমই তাঁর সিনেমাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। এই সংযমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের লেখক সঙ্গ, বিশেষত লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। এই সম্পর্ক ছিল এক ধরনের যৌথ চিন্তার পরিসর, যেখানে সাহিত্য ও সিনেমা একে অপরকে ব্যাখ্যা করেনি, বরং একে অপরের সময়বোধকে প্রসারিত করেছে। ইতিহাসের অবসান, সামাজিক ভাঙন, মানুষের বিশ্বাসহীনতা—এই বিষয়গুলো তাঁদের কাজে বারবার ফিরে এসেছে। কিন্তু সবটাই এসেছে নীরবে, প্রায় নিঃশ্বাসের মতো। এই দৃষ্টিভঙ্গি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং আদর্শগত পথচলাও এই ধীর, সন্দিগ্ধ, আপসহীন দৃষ্টির জন্ম দিয়েছে। তরুণ বেলা তার হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এ কথা গোপন নয়। সমাজতন্ত্রের সাম্য, শোষণহীনতার প্রতিশ্রুতি, এবং পুঁজিবাদী ভোগের বিরুদ্ধে অবস্থান তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের বাস্তব রূপ আদর্শের সঙ্গে মেলে না। পার্টি-রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের মধ্যে মানুষ আবারও হারিয়ে যায়—শুধু ভাষাটা বদলে যায়, শোষণের কাঠামো নয়। এই মোহভঙ্গ তাঁকে কোনো দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলতায় ঠেলে দেয়নি, আবার তাঁকে দলীয় রাজনীতির মুখপাত্রও বানায়নি। বরং বেলা তারের রাজনীতি ক্রমশ রূপ নেয় এক ধরনের নৈতিক সন্দেহে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, যে কোনো বড় আদর্শ—তা যত মানবমুখীই হোক নে কেন—রাষ্ট্রের হাতে পড়লে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এই সন্দেহই তাঁর সিনেমার গভীরে কাজ করে। 'Damnation' বা 'Satantango' ভেঙে পড়া কমিউনিটিগুলোকে পড়া যায় রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র-পরবর্তী হাঙ্গেরির এক নীরব প্রতিচ্ছবি হিসেবে—যেখানে আদর্শ শেষ, কিন্তু মানুষ এখনও আটকে আছে অভ্যাস, নির্ভরতা আর প্রতারণার চক্রে।

'Damnation' ছবির দৃশ্য

বেলা তারের সিনেমায় তাই কোনো বিপ্লব নেই, কোনো সংগ্রামের আহ্বান নেই। তাঁর মানুষগুলো বিশ্বাস হারিয়েছে—কিন্তু তারা বিদ্রোহীও নয়। এই অবস্থান অনেক বামপন্থী সমালোচকের কাছেই অস্বস্তিকর লেগেছে। অভিযোগ উঠেছে—এই সিনেমা নৈরাজ্যবাদী, নিষ্ক্রিয়, রাজনৈতিকভাবে অসার। কিন্তু বেলা তার সচেতনভাবেই এই অভিযোগ বহন করেছেন। তাঁর মতে, মিথ্যা আশা দেখানো রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং মানুষের ভাঙন, ক্লান্তি ও বিশ্বাসহীনতাকে সততার সঙ্গে দেখানোই এক ধরনের নৈতিক অবস্থান। এই কারণেই তাঁর মানবতাবাদ কোনো প্রগতিশীল স্লোগানের উপর দাঁড়ায় না। এটি দাঁড়ায় সহনশীলতার উপর—মানুষ যত দুর্বলই হোক, তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায় না। বেলা তার কমিউনিস্ট আদর্শ থেকে সরে এলেও সাম্যের প্রশ্ন ছাড়েননি। তিনি বুঝেছিলেন, সাম্য কোনো কাঠামোর ফল নয়, এটি মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ফল। তাঁর ক্যামেরা তাই ক্ষমতার দিকে নয়, পড়ে থাকা মানুষের দিকে ঝুঁকে থাকে। এই দৃষ্টিই তাঁকে দ্রুতগতির, বাজারমুখী, তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়াশীল সিনেমা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।

আজকের ডিজিটাল সংস্কৃতিতে, যেখানে সব কিছু দ্রুত গ্রহণযোগ্য করে তোলাই মুখ্য, সেখানে, বেলা তারের কাজ আরও বেশি করে প্রান্তিক হয়ে পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, যতদিন কেউ সময়কে গুরুত্ব দিয়ে ভাববে, ততদিন তাঁর সিনেমা প্রাসঙ্গিক থাকবে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, সব শিল্প তাৎক্ষণিক হওয়ার জন্য নয়। কিছু শিল্প আছে, যেগুলো ধীরে ধীরে বোঝা যায়, কিছু শিল্প আছে, যেগুলো সহ্য করতে হয়। বেলা তার কোনো আন্দোলনের নেতা ছিলেন না, কোনো মতবাদের মুখপাত্রও ছিলেন না। তিনি নিঃশব্দে নিজের কাজ করে গেছেন, আপস করেননি, সহজ পথ নেননি। তাঁর প্রভাব তাই উচ্চকণ্ঠ নয়, কিন্তু গভীর। তাঁর মৃত্যু আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি এখনও এমন শিল্পের জন্য সময় রাখি, যা আমাদের ধীর হতে বলে, অপেক্ষা করতে বলে, আরাম না দিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে? আমরা কি আমাদের শরীর মনন আবেগ ছাড়িয়ে আরও গভীরে ডুব দিতে জানি?

বেলা তার চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর সিনেমাগুলো রয়ে গেল— দীর্ঘ, নীরব, অনমনীয়। তারা আমাদের ডাকবে না, আমাদের তাড়া দেবে না। কিন্তু একবার সামনে দাঁড়ালে তারা আমাদের ছাড়বে না। তারা কোনো উত্তর দেবে না, কোনো স্বস্তিও দেবে না। তারা শুধু আমাদের সময়বোধকে অস্বস্তিতে ফেলবে, আমাদের ধৈর্যের সীমা স্পর্শ করবে। হয়তো এই কারণেই বেলা তার কেবল একজন চলচ্চিত্রকার নন; তিনি সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব নৈতিক আধ্যাত্মিক উপস্থিতি—যার প্রয়োজন আমাদের ছিল, এবং থাকবে, বিশেষত অধার্মিকতার এই চরমতম উদযাপনে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।