কীসের টানে গান্ধীজির আশ্রমে আসেন বিদেশি রাষ্ট্রনায়করা?

Sabarmati Ashram: মাটিতে আসনে বসে চরকায় সুতো কাটছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। এক মহিলা তাঁকে শিখিয়ে দিচ্ছেন, কীভাবে চালাতে হয় চরকা।

tiasa gupta
৩ মিনিট
কীসের টানে গান্ধীজির আশ্রমে আসেন বিদেশি রাষ্ট্রনায়করা?

সবরমতী আশ্রম বললেই মাথায় আসে লবণ সত্যাগ্রহ এবং গান্ধীজির প্রসঙ্গ। আর তাই বারবার বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতা ভারতে সফরে এলেই উপস্থিত হন গুজরাতের সবরমতী আশ্রমে। সেখানে ভিজিটর্স বুকে লিখে দিয়ে যান নিজেদের অনুভূতি। এখান থেকে ঘুরে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

মাটিতে আসনে বসে চরকায় সুতো কাটছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। এক মহিলা তাঁকে শিখিয়ে দিচ্ছেন, কীভাবে চালাতে হয় চরকা। এই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ১৯১৭ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত গুজরাতের এই সবরমতী আশ্রমই ছিল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ঠিকানা। সেখানে এসে মুগ্ধ বরিস। আশ্রম ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে 'ভিজিটর্স বুক'-এ লেখেন বরিস, 'দুনিয়ায় বদল আনতে এই অসাধারণ মানুষটি কীভাবে সত্য ও অহিংসার সহজ-সরল নীতিকে কাজে লাগিয়েছিলেন, আশ্রমে এসে তা উপলব্ধি করে সমৃদ্ধ হলাম!'

তবে এর আগেও বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতারা এসেছেন সবরমতীতে।

সবরমতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা

২০২০ সালে গুজরাতের বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে নিজে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর স্ত্রীকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তারপর সেখান থেকেই তাঁদের সবরমতী আশ্রমে নিয়ে যান তিনি। গোটা আশ্রমটি তাঁদের ঘুরিয়ে দেখান প্রধানমন্ত্রী। ওই আশ্রমে থাকা মহাত্মা গান্ধীর একটি ছবিতে সস্ত্রীক মালা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কীভাবে চরকায় সুতো কাটতে হয়, তাও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেখান মোদি। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভিজিটর্স বুকে লেখেন, "প্রিয় বন্ধু মোদিকে আমি এই অসাধারণ আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানাই।"

গান্ধীজির স্মৃতি বুকে আগলে রাখা সবরমতী আশ্রমের ভিজিটর্স বুকে যখন নিজের মতামত জানান তৎকালীন মার্কিন মুলুকের প্রেসিডেন্ট, তখন তাতে শুধুই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশংসা। বাপুর আশ্রমে গেলেন, অথচ গান্ধীজির সম্পর্কে একটি কথাও লিখলেন না মন্তব্য খাতায়- ট্রাম্পের এই আচরণ নিয়েই শুরু হয়ে যায় বিতর্ক।

২০১০ সালে একবার ভারত সফরে এসেছিলেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেই সময় তিনিও সবরমতী আশ্রমে যান। আশ্রম পরিদর্শনের পর 'ভিজিটর্স বুক'-এ একেবারে অন্য কথা লেখেন তিনি। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেখেন: "গান্ধীজির জীবনের এই অধ্যায়টি দেখার সুযোগ হওয়ায় আমি অনুপ্রেরণায় পূর্ণ হয়েছি। তিনি যে শুধু ভারতের কাছে একজন নায়ক ছিলেন তা নয়, গোটা বিশ্বের কাছে তিনি একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, একজন নায়ক।"

অথচ ওবামার দেখানো পথের ধারেকাছেও হাঁটলেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প।

২০১৮ সালে নেতানিয়াহু

ভারত সফরে এসে সবরমতী আশ্রমে এসেছিলেন ইজরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। পরিবারের সঙ্গে এখানে এসেছিলেন তিনি। ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করেন বাপুর অহিংসা। যাওয়ার আগে ভিজিটার্স বুকে লেখেন,

"মহাত্মা গান্ধী হলেন বিশ্বমানবতার পূজারী।"

২০১৮ সালে জাস্টিন ট্রুডো

এক সপ্তাহের জন্য ভারতে এসেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। সপরিবারে আসেন গান্ধীজির সবরমতী আশ্রমে। ভিজিটর্স বুকে তিনি লেখেন,

"সত্য, মানবতা এবং শান্তির অসাধারণ জায়গা। আজকের দিকে এর প্রয়োজন অসীম।"

চরকায় সুতো কাটতে দেখা যায় ট্রুডোকেও।

২০১৭ সালে শিনজো আবে

২০১৭ সালে দু'দিনের সফরে ভারতে আসেন জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। তিনি আসেন সবরমতী আশ্রমে। যাওয়ার আগে লেখেন তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া,

"ভালবাসা এবং ধন্যবাদ।"

২০১৪ সালে শি জিনপিং

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে চিনের প্রিমিয়ার শি জিনপিং আহমেদাবাদে এসেছিলেন। আসেন সবরমতী আশ্রমে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মোদি। তিনি জিনপিংকে চিনা ভাষায় অনূদিত গীতা উপহার দেন। 'রঘুপতি রাঘব রাজা রাম' গানের ধ্বনি আপ্লুত করে এই রাষ্ট্রনায়ককেও।

আজাদি কি অমৃত মহোৎসব

২০২১ সালে 'আজাদি কি অমৃত মহোৎসব' অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এখানে এসেছিলেন মোদি। তিনি লেখেন, এই আশ্রমে এসে বাপুর প্রেরণায় আমার দেশগঠনের অঙ্গীকার দৃঢ়তর হল।

ইতিহাসের ছোঁয়া

গান্ধীজির সবরমতী আশ্রমকে সত্যগ্রহ আশ্রমও বলা হয়। তবে গান্ধীজি অন্যান্য কাজকর্ম ছাড়াও কৃষিকাজ ও পশুপালনের মতো বিভিন্ন কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। যার জন্য অনেক জমির ব্যাপক প্রয়োজন হয়েছিল। ১৯১৭ সালের ১৭ জুন আশ্রমটি সবরমতী নদীর তীরে ছত্রিশ একর জায়গায় স্থানান্তরিত হয় এবং এটি সবরমতী আশ্রম নামে পরিচিতি লাভ করে। গান্ধীজি ১৯২৩ সালের ১২ মার্চে দণ্ডি মার্চকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা 'লবণ সত্যাগ্রহ' নামে পরিচিত। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর এই মার্চটির যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল, তার স্বীকৃতি হিসেবে ভারত সরকার আশ্রমটিকে একটি জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

কীসের টানে এখানে বারবার ছুটে আসেন বিদেশিরাও?

আশ্রমে এখন একটি জাদুঘর রয়েছে, গান্ধী স্মারক সংগ্রহালয়। এটি মূলত আশ্রমের ভেতর গান্ধীজির নিজস্ব বাড়ি 'হৃদয়কুঞ্জ'-তে ছিল। তারপরে ১৯৬৩ সালে স্থপতি চার্লস কোরিয়া-র নকশা অনুযায়ী জাদুঘরটি তৈরি করা হয়েছিল। সংগ্রহালয়টি তখন সু-নকশাকৃত ও সজ্জিত জাদুঘর ভবনে পুনরায় স্থাপন করা হয়েছিল এবং ১০ মে, ১৯৬৩ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তা উদ্বোধন করেন। আশ্রমে অনেক ভবন রয়েছে এবং প্রতিটিরই রয়েছে নিজস্ব নাম। গান্ধীই অধিকাংশ ভবনের নামকরণ করেছেন। আশ্রমের কয়েকটি বিল্ডিংয়ের নাম যেমন 'নন্দিনী', 'রুস্তম ব্লক' প্রভৃতি গান্ধীর দেওয়া। গান্ধীর লেখা চিঠি থেকে তা প্রমাণিত হয়।

বাপুর জীবনচর্যা, অহিংসার আদর্শ অনুভব করতে বারবার এখানে এসেছেন বিদেশিরা। আজ বিশ্বের বহু দেশ যখন হিংসায় মত্ত, তখন বাপুর আদর্শ ছুঁয়ে দেখতে সবরমতী আশ্রম অহিংসারই পীঠস্থান।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।