বারবার হত্যার পরিকল্পনা || কারা ছিল গান্ধী-নিধনের নেপথ্যে?

Debabrata Mondal
৩ মিনিট
বারবার হত্যার পরিকল্পনা || কারা ছিল গান্ধী-নিধনের নেপথ্যে?

সালটা ১৯৪৮। দীর্ঘ সময় ব্রিটিশদের পদানত থাকার পর ভারতের স্বাধীনতার সূর্য তার নিজস্ব দীপ্তিতে বিরাজমান। সেদিন দিল্লির বিড়লা হাউজে বয়ে গেছে জনস্রোত। বক্তব্য রাখছেন স্বয়ং গান্ধীজি। ভারতের স্বাধীনতা তাঁকে তৃপ্তি দিলেও রক্তক্ষয়ী দেশভাগ তাঁর আত্মাকেও দ্বিখণ্ডিত করেছে। জাতির জনকের সেই বক্তৃতা শুনতে জনতার ঢল নামবে, সে তো স্বাভাবিক!

হঠাৎ একটা গুলির শব্দ, মঞ্চের ওপর শীর্ণকায় মানুষটি লুটিয়ে পড়লেন, সমবেত জনতা হতচকিত। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন স্বয়ং গান্ধীজি।

তার কিছুক্ষণের মধ্যে জওহরলাল নেহরুর ঘোষণা– "আমাদের জীবন থেকে আলো চলে গেছে।" গান্ধীজির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সমাপ্তি ঘোষণা হল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অধ্যায়ের। তবে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারির আগেও বহুবার গান্ধীজিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই পরিকল্পনার মূলে ছিল হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। ক্ষেত্রবিশেষে ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপও ছিল তাতে।

১৯১৭ সালের ১৫ এপ্রিল। বিহারের মতিহার রেলস্টেশনেও সেদিন ছিল দিল্লির বিড়লা হাউজের মতোই জনসমুদ্র। পরের ট্রেনেই আসছেন এক অবিসংবাদিত স্বাধীনতা সংগ্রামী– মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। বিহারে তখন জমিদারদের অত্যাচার ঊর্ধ্বমুখী। স্থানীয় চাষিদের নীল চাষে বাধ্য করাচ্ছে জমিদাররা।

খবর পৌঁছল গান্ধীজির কানে। রাজেন্দ্র প্রসাদকে সঙ্গে নিয়ে মহাত্মা পৌঁছলেন বিহারের মতিহার স্টেশনে। সারাদিন চাষিদের অভাব–অভিযোগের বিস্তারিত বর্ণনা শুনে ক্লান্ত গান্ধীজি রাত্রিবাসের জন্য গেলেন স্থানীয় ইংরেজ অধিকর্তা আরউইনের বাড়ি। সেখানেই গান্ধীজির জন্য নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিল মৃত্যুফাঁদ। ভারত-বিদ্বেষী আরউইন রাঁধুনি বটুক মিঞাকে নির্দেশ দেন গান্ধীজির দুধে বিষ মেশানোর জন্য, যাতে তা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয় গান্ধীজির। কিন্তু দেশপ্রেমী বটুক মিঞা তা পারেননি। দুধে বিষ মেশালেও গোপনে আগেভাগে মহত্মাকে সমগ্র পরিকল্পনাটি জানিয়ে দেন তিনি। তবে এর পরিণাম ভাল হয়নি, বটুক মিঞাকে হাজতে পাঠান আরউইন, ভেঙে দেওয়া হয় তাঁর বাড়িও।

এরপর ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বারবার আক্রমণ নেমে এসেছে গান্ধীজির ওপর। শেষ কয়েকটি আক্রমণের নেপথ্যে ছিল নাথুরাম গডসের মাথা। ১৯৪৮ সালে অবশেষে সফল হল এই দীর্ঘ চক্রান্ত, দেশ হারাল প্রিয় 'বাপু'-কে।

তবে গান্ধীজির মতো দেশ নায়কের ব্যক্তিগত জীবন বা যৌনজীবন নিয়েও কিন্তু কম কাটাছেঁড়া হয়নি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু গান্ধীজির যৌনজীবনকে ‘অস্বাভাবিক ও অপ্রাকৃতিক’ বলে উল্লেখ করেন, যা নিয়ে পরবর্তীকালে বিতর্ক দানা বাঁধে। তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী, কস্তুরবার সঙ্গে বিবাহের পর গান্ধীজি যখন তাঁর সঙ্গে মিলনে ব্যস্ত, সেই সময় তার বাবার মৃত্যু হয়। এবং তার পরই গান্ধীজি সিদ্ধান্ত নেন তিনি সম্পূর্ণ কৌমার্যব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে তার জীবন অতিবাহিত করবেন।

একসময় গান্ধীজির স্ত্রী কস্তুরবার মৃত্যু হয়, এই সময় থেকেই মৃদুলা নামক এক মহিলা থেকে যান গান্ধীজির সঙ্গে। তবে মৃদুলা নিজেই তার দিনপঞ্জিতে লিখেছেন– গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অনেকটা মা–মেয়ের মতো। গান্ধীজি তাঁর পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া- সমস্ত ব্যাপারে একজন সার্থক মায়ের মতোই খোঁজ রাখতেন। এমনকী, মায়ের সঙ্গে মেয়ে যেমন ঘুমোয়, গান্ধীজির সঙ্গে তিনিও সেভাবেই ঘুমোতেন। এমনকী, কোনওরকম লজ্জা ছাড়া গান্ধীজিকে ম্যাসাজ করে দিতেন মৃদুলা। এতটাই সহজ ছিল তাঁদের সম্পর্ক।

তবে গান্ধীজির কৌমার্য ব্রত পালনের সঙ্গী হওয়ার জন্য একসময় তীব্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় মহিলামহল। ১৯৪৭ সালের ২৪ ফ্রেব্রুয়ারি মৃদুলা তাঁর ডায়েরিতে লেখেন– “আজ বাপু আমাতুসসালামকে খুব শক্ত ভাষায় এক চিঠি লিখে জানিয়েছেন, কৌমার্যচর্চার অংশ হতে না পেরে আমাতুসসালামের যে অনুতাপ হচ্ছে, তা তার চিঠি থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।”

তবে গান্ধীজির এই জীবনযাপন নিয়ে দলের মধ্যেও মতবিরোধ তুঙ্গে ওঠে। কিশোরীলাল এক চিঠিতে মৃদুলাকে ‘মায়াবী নারী’ বলে উল্লেখ করেন, গান্ধীজির জীবন স্বয়ং বল্লভভাই প্যাটেলেরও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। প্যাটেল জানান, এই জীবনযাপনের খবর দলের কর্মী বা অন্যদের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়লে ‘কেলেঙ্কারি’ হয়ে যাবে। তবে সমস্ত বিতর্কের পরেও গান্ধীজি অবিচল ছিলেন।

দেশের জন্য ‘জাতির পিতা’-র চরম আত্মত্যাগের পরেও ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু গান্ধীজির ব্যক্তিগত জীবন বা যৌনজীবনকে যেভাবে নিশানা করেছেন তা চরম দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করেছিলেন অনেকে। এমনকী, একইভাবে অভিযোগের আঙুল উঠেছিল বল্লভভাই প্যাটেলের দিকে। তবে, গান্ধী-হত্যা পীড়া দিয়েছিল নেহরু-প্যাটেল উভয়কেই।

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।