স্যাকরার ঠুকঠাক, মমতার এক ঘা || ছোট পদ থেকে সরিয়ে 'বড়' বার্তা পার্থকে?

Kanad Dasgupta
৩ মিনিট
স্যাকরার ঠুকঠাক, মমতার এক ঘা || ছোট পদ থেকে সরিয়ে 'বড়' বার্তা পার্থকে?

দল এবং মন্ত্রিসভায় স্বচ্ছতাকে কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তা স্পষ্ট হলো তৃণমূলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি-র মাথা থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে ছেঁটে ফেলার পরই৷ তৃণমূল সুপ্রিমো বার্তা দিয়েছেন, দায়িত্ব পালন না করে স্রেফ দলের পদ আঁকড়ে বসে থাকবেন, এমন আর চলবে না৷ যে যত বড় নেতা-ই হোন, দলের তরফে দেওয়া নির্দিষ্ট কাজ করতে হবে, না হলে সরে যেতে হবে৷ দলের রাজ্য সভাপতি তথা জাতীয় কমিটির সহ সভাপতি সুব্রত বকসিকে শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির চেয়ারম্যানের পদে এনে পার্থকে স্রেফ কমিটির একজন সদস্য রাখা হয়েছে৷ এই কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং অরূপ বিশ্বাস।

আচমকাই পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অন্যতম শীর্ষনেতাকে এভাবে দলের এক গুরুত্বপূর্ণ কমিটির প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ায় তৃণমূলের অন্দরের পাশাপাশি জোর জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলেও৷ চর্চা চলছে, পার্থকে এভাবে সরানোর প্রকৃত কারণ কী? একাধিক তত্ত্ব সামনে আসছে৷ এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, এসএসসি-দুর্নীতিতে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে যাওয়া৷ কলকাতা হাইকোর্ট এই দুর্নীতির তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিয়েছে৷ বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় যেদিন নির্দেশ দিয়েছেন, প্রয়োজনে সিবিআই তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, ঠিক সেদিনই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা তলব করেন পার্থকে৷ ফৌজি তৎপরতায় সেদিন পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের আইনজীবীরা সিবিআই দফতরে তাঁর হাজিরার নির্দেশে স্থগিতাদেশ আদায় করেন৷ পরে ডিভিশন বেঞ্চ থেকেও একমাসের রক্ষাকবচ পান তৎকালীন এই শিক্ষামন্ত্রী৷

চর্চায় উঠে এসেছে, রক্ষাকবচের মেয়াদ শেষ হলে ফের সিবিআই ডাকতে পারে পার্থবাবুকে, তবে তা নির্ভর করবে ডিভিশন বেঞ্চ রক্ষাকবচের মেয়াদ বৃদ্ধি করবে কি'না অথবা সিবিআই তদন্তের নির্দেশ খারিজ করে কি'না, তার ওপর৷ তাছাড়া, আইকোর-অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে আনা মামলাতেও জড়িয়েছে তাঁর নাম। মোদ্দা কথা, রাজ্যের প্রাক্তণ শিক্ষামন্ত্রী তথা বর্তমান শিল্পমন্ত্রীর ঘাড়ে সিবিআইয়ের 'থ্রেট' থাকছেই, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কাছে চরম অস্বস্তিকর৷

অতীতে দলের একাধিক জনের ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, সিবিআই স্ক্যানারে কারো নাম ভেসে উঠলে, দল তাঁর সঙ্গে দূরত্ব বাড়ায়৷ শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির প্রধান নিজেই এক বা একাধিক বিশৃঙ্খল কার্যকলাপে ফেঁসে থাকলে, সেই কমিটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয়৷ এসবই পার্থ- অপসারনের কারন হতে পারে বলে অনেকের ধারনা৷ অন্যদিকে দলের একাধিক নেতার অভিমত, পার্থ চট্টোপাধ্যায় ইদানিং সংগঠনের ক্ষমতাশালী অংশের বিরাগভাজন হয়েছেন নানা কারনে৷ তাঁকে যাবতীয় পদ থেকেই সরানোর প্রচ্ছন্ন একটা দাবিও উঠেছে৷ পাশাপাশি 'কথা' শুরু হয়েছে আরও একটি বিষয় নিয়েও৷ বেশ কিছুদিন ধরেই দলের একাধিক নেতা বা পদাধিকারী সংবাদমাধ্যমের কাছে খোলাখুলিভাবে সতীর্থদের বিরুদ্ধেই সরব হলেও, স্রেফ 'একটু বকে দেওয়া' ছাড়া পার্থ'র নেতৃত্বাধীন শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি কিছুই করেনি।

এর ফলে, "এভাবে মুখ খুললেও কেউ কিছু করতে পারবে না", এমন একটা ধারনা দলের অন্দরে তৈরি হয়েছে৷ তরজা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে৷ অথচ শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি এই ইস্যুতে কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করলে, এই প্রবনতা থামানো যেত বলেই নেতৃত্বের ধারনা৷ এ ধরনের ব্যর্থতার জন্যও পার্থকে সরানো হয়ে থাকতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে।

দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি দলনেত্রীর অনুমোদন ছাড়াই সম্প্রতি শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক ডেকেছিলেন পার্থ। এমন কাণ্ড নিয়ে সম্ভবত উষ্মাও প্রকাশ করেন নেত্রী। শৃঙ্খলারক্ষা কমিটিতে বদল ঘটিয়ে তৃণমূল-সুপ্রিমো না'কি জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে কথা না বলে শৃঙ্খলা কমিটি ভবিষ্যতে কোনও বৈঠক ডাকতে পারবে না৷

সব মিলিয়ে, গোটা পরিস্থিতিই পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল৷ পার্থ'র আমলে ঘটে যাওয়া এসএসসি-দুর্নীতির জেরে প্রশাসনের অহেতুক বিপাকে পড়া, দুর্নীতির তদন্তে জেরা করার জন্য পার্থকে সিবিআই তলব, বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার সঙ্গে পার্থর নাম জড়ানো, শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির প্রধান হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনে পার্থ'র ব্যর্থতা, দলের একাংশের পার্থ-অপসারনের জোরালো দাবি ইত্যাদি বিষয়গুলি যথেষ্ট বিব্রত করছে দলকে৷ এই সব কারনেই তাঁকে তুলনায় ছোট একটি পদ থেকে সরিয়ে 'বড়' একটি বার্তা দেওয়া হলো বলেই দলের একাংশ মনে করছে৷ এই পদ থেকে সরানো হলেও এখনও দলের রাজ্য কমিটির মহাসচিব এবং সরকারের শিল্পমন্ত্রীর পদে থাকছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়৷ তবে কতদিন থাকবেন, তা নির্ভর করছে তাঁর কর্মতৎপরতা এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বহরের উপরই৷

লিখেছেন
Kanad Dasgupta
Kanad Dasgupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।