'মিত্রো' থেকে 'ফ্রেন্ডস': জেন জি-র জ্যাকেটে মোদী?

Prime Minister Narendra Modi: মধ্যরাতে ইনস্টাগ্রাম রিল, 'মিত্রো'-র বদলে 'ফ্রেন্ডস' সম্বোধন, আর মন্ত্রীদেরও রিল বানানোর পরামর্শ—জেন জি-র ভাষায় কথা বলতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদী? নিট প্রশ্নফাঁস ও ছাত্র আন্দোলনের চাপেই বদলাচ্ছে সরকারের ডিজিটাল যোগাযোগের কৌশল?

inscript
৩ মিনিট
'মিত্রো' থেকে 'ফ্রেন্ডস': জেন জি-র জ্যাকেটে মোদী?

গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন বলতে সাধারণ মানুষের মনে যে ছবি তৈরি হয়েছে, তা ছিল অনেকটাই একমুখী। 'মন কি বাত', বড় বড় জনসভা, নির্দিষ্ট সময়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ কিংবা এক্স-এ বার্তা—এটাই ছিল তাঁর পরিচিত রাজনৈতিক স্টাইল। কিন্তু ২০২৬ সালের ভারতের ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সেই ছবিতে দৃশ্যত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এখন তিনি সেলফি ক্যামেরায় ভিডিও করছেন, মধ্য রাতে ইনস্টাগ্রাম-ধাঁচের রিল পোস্ট করছেন, ভিডিওর শেষে বলছেন, 'Friends', এত বছর দেশবাসী মোদীকে 'মিত্র' বলতে শুনেছেন। আবার মন্ত্রিসভার সহকর্মীদেরও পরামর্শ দিচ্ছেন, তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইনস্টাগ্রাম রিল এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশন করতে।

এই পরিবর্তন শুধুই কি প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা? নাকি এর পিছনে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় যুব আন্দোলনের রাজনৈতিক চাপ? এই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

এবারের আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল, এটি শুধু রাস্তায় নয়, সোশ্যাল মিডিয়াতেও সমান শক্তিশালী। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু হওয়া নিট প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনের ভাষা ছিল মিম, রিল, এআই ভিডিও, ব্যঙ্গ এবং পপ কালচারের রেফারেন্স। প্রতিবাদকারীদের বড় অংশই জেন জি প্রজন্ম। ফলে আন্দোলনের ভাষাও হয়ে উঠেছিল সেই প্রজন্মের ভাষা। প্রচলিত রাজনৈতিক স্লোগানের বদলে অ্যালগরিদম, ট্রেন্ডিং অডিও এবং ভাইরাল কনটেন্ট আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

ঠিক এই সময়েই প্রধানমন্ত্রী মোদীর যোগাযোগের কৌশলেও পরিবর্তন দেখা যায়। দীর্ঘ নীরবতার পর তিনি পরপর দুদিন মধ্য রাতে ভিডিও প্রকাশ করেন। তাও আবার রিল ফরমেটে। সেখানে প্রশ্নফাঁস বিষয়টিকে সামনে এনেছেন 'লক্ষ লক্ষ ছাত্র ও তাদের পরিবার'। মোদী লাইভে জানান, আরও কঠোর আইন আনা হবে, ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠন করা হবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় সেই সংক্রান্ত বিল আনার কথাও ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু এখানেই বিষয়টি শুধু নীতিগত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভিডিওটির উপস্থাপনাও ছিল আলাদা। নির্দিষ্ট মঞ্চ বা সরকারি সেটআপ নয়, বরং ফোনের ক্যামেরায় রেকর্ড করা বার্তা। রাত প্রায় বারোটার সময় পোস্ট করা হয় সেই ভিডিও। ভারতের রাজনীতিতে, বিশেষ করে মোদীর যোগাযোগ কৌশলে, এটি ছিল তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কীভাবে ছড়াল আরশোলাদের আন্দোলন, জালবিস্তারের নেপথ্যকথা

Cockroach movement spread: কীভাবে একটি আদালতের অপমান, এক তরুণ জনসংযোগবিদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং দুই সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের মৈত্রী ভারতের সবচেয়ে আলোচিত ব্যাঙ্গাত্মক আন্দোলনের জন্ম দিল?

পরদিন (২৪ জুলাই) আবার আরেকটি ভিডিও পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, 'Thank you, friends.' তিনি জানান, তরুণদের কাছ থেকে অসংখ্য মতামত ও পরামর্শ পেয়েছেন এবং সেই অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানান। আগে যেখানে 'মিত্রো' সম্বোধনটি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল, সেখানে এখন 'Friends' শব্দের ব্যবহার অনেকের কাছেই নতুন বার্তা হিসেবে ধরা পড়েছে।

একই সময়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহকর্মীদের উদ্দেশে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেন। তিনি জানতে চান, কতজন মন্ত্রী নিয়মিত ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন। এরপর তিনি বলেন, দেশের তরুণদের বড় অংশ এই প্ল্যাটফর্মেই রয়েছে। তাই শুধু সরকারি প্রকল্পের তথ্য নয়, রিল, ছোট ভিডিও এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশনের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

গত কয়েক বছরে বিজেপির ডিজিটাল প্রচার মূলত এক্স, ইউটিউব এবং হোয়াটসঅ্যাপকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তরুণদের বড় অংশের রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইনস্টাগ্রাম। সেখানে তথ্য যেমন দ্রুত ছড়ায়, তেমনই ব্যঙ্গ, মিম এবং ছোট ভিডিওর মাধ্যমে রাজনৈতিক বয়ানও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করেই সরকার নিজেদের যোগাযোগ কৌশল বদলাচ্ছে বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

তবে এটাও সত্য, সরকারের এই নতুন ডিজিটাল যোগাযোগের ধরন এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রশ্নফাঁস নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক চাপ ও ছাত্রদের ক্ষোভ তুঙ্গে। প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে ছাত্রদের ক্ষোভ, বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণ এবং যন্তর মন্তরের আন্দোলন কেন্দ্রকে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করেছে। প্রধানমন্ত্রী কড়া আইনের আশ্বাস দিলেও আন্দোলনের অন্যতম দাবি—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ—সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা করেননি। ফলে সরকারের পদক্ষেপকে অনেকেই আংশিক সাড়া হিসেবে দেখছেন।

আগে সরকার সাধারণত নীতি ঘোষণা করত, পরে সেই বার্তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত। এবার যেন উল্টো ছবি দেখা গেল। প্রথমে ভাইরাল ভিডিও, তারপর রিল, তারপর ধন্যবাদ বার্তা, এরপর মন্ত্রীদের ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ। অর্থাৎ নীতির পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মও এখন রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

এর প্রভাবও দ্রুত দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী যে ভিডিওটি পোস্ট করেছিলেন, সেটি ব্যাপকভাবে শেয়ার হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসরণকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।

সব মিলিয়ে এই ঘটনাগুলি একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। জেন জি ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে এখন শুধু উন্নয়নের ভাষণ বা দীর্ঘ বক্তৃতা যথেষ্ট নয়। তারা ছোট ভিডিও দেখে, মন্তব্য করে, মিম বানায় এবং রিলের মাধ্যমেই রাজনৈতিক বার্তা গ্রহণ ও প্রচার করে। ফলে দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক প্রচারযন্ত্রও সেই ভাষা শেখার চেষ্টা করছে।

জেন জি জ্যাকেটে মোদী নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইমেজ-পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কিন্তু সেই নতুন জ্যাকেট তরুণদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, তার উত্তর শেষ পর্যন্ত দেবে দেশের রাজনীতি এবং তরুণ ভোটাররাই।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

২৩ দিনের অনশন থেকে জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন, রাজপথই নেহা বোরার হয়ে ওঠার সাক্ষী

Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

বরফের গভীরে নিউট্রিনোর খোঁজ: মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে এবারের পদার্থবিদ্যায় নোবেল

IceCube Neutrino Observatory: অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে কীভাবে কাজ করে আইসকিউব টেলিস্কোপ? কীভাবে অদৃশ্য নিউট্রিনো কণার সংকেত ধরে কৃষ্ণগহ্বর, ব্ল্যাজার এবং মহাবিশ্বের গভীর রহস্য উন্মোচন করছেন বিজ্ঞানীরা?

ইন্ডিয়া জোটের মিছিলে বাধা, সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হলো রিট

INDIA bloc's march towards supreme court: সোমবার কনট প্লেস থেকে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে ইন্ডিয়া ব্লকের ‘চলো দিল্লি’ মিছিল অনুষ্ঠিত হলো। রাহুল গান্ধীর দুই পাশে ছিলেন, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও নেহা বোরা। মিছিলে অংশ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, ডি রাজা, সুপ্রিয়া সুলে। ভগবান দাস রোডে মিছিল পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়। শেষমেশ সুপ্রিম কোর্টে ‘রাহুল গান্ধী বনাম নির্বাচন কমিশন অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি রিট পিটিশন দাখিল হয়।

ব্যারিকেড ঘেরা দিল্লি, নজরদারির চোখে নাগরিক: নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ?

Delhi Under Siege: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে। ৩৫ হাজার পুলিশ, কাঁটাতারের ব্যারিকেড, ড্রোন নজরদারি, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ২৪ ঘণ্টার ইন্টারনেট শাটডাউন, ৭ হাজারের বেশি আটক। ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতির অভিযোগ তুলেছেন, দিল্লিতে 'কাশ্মীর মডেল'-এর প্রয়োগ চলছে।

প্রতিবাদের মানচিত্র থেকে মুছে গেল যন্তর মন্তর

Jantar Mantar protest site: আঠারো শতকে নির্মিত যন্তর মন্তর মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার পাশের রাস্তা হয়ে ওঠে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিবাদীদের মিলনস্থল।

‘দুই নেহা’-র কাণ্ডে বিভ্রান্ত দিল্লি পুলিশ! AISA নেত্রী-কে আটকানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই

AISA-র সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করতে গিয়ে তাঁরই মতো দেখতে এক মেয়েকে আটক করল দিল্লি পুলিশ। অথচ সেই সময় আসল নেহা বোরা দিল্লির কনট প্লেসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যারিকেড পেরিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছিলেন।