মিমকে টেক্কা দিয়ে বিহারী মুসলিমদের মনদখল করতে চাইছেন পিকে?

Political strategist Prashant Kishor: পিকের দাবি, মুসলিম ভোটারা প্রতি বার একপাক্ষিকভাবে আরজেডিকে ভোট দেন, কিন্তু বিনিময়ে তেমন কিছু পান না। উন্নয়ন, শিক্ষা বা চাকরির সুযোগ— কোনো ক্ষেত্রেই মুসলিম সমাজের বিশেষ উন্নতি হয়নি।

Tanvia Barua
৪ মিনিট
মিমকে টেক্কা দিয়ে বিহারী মুসলিমদের মনদখল করতে চাইছেন পিকে?

বিহারের রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছেন ভোটকুশলী তথা জন সুরজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর। তিনি বলছেন, বিজেপিকে হারাতে হলে শুধু মুসলিম ভোটে হবে না। মুসলিমদের উচিত এমন হিন্দুদের সঙ্গে একজোট হওয়া, যারা মহাত্মা গান্ধী, ড. বি.আর. আম্বেদকারের চিন্তাধারায় বিশ্বাস করেন। প্রাশান্ত কিশোরের আহ্বান, মুসলিম ভোটাররা যেন বিজেপির ভয় না পেয়ে নিজেরা উন্নয়ন ও বাস্তব সমস্যার কথা ভেবে ভোট দিন। তাঁর কথায়, বহু রাজনৈতিক দল মুসলিম ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ভোট চায়। “ভোট না দিলে বিজেপি জিতে যাবে”— এই ভয় দেখানো রাজনীতি থেকে মানুষকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাঁর এই বক্তব্যে আরজেডি ও কংগ্রেসও কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে, কারণ তাঁর সমালোচনার তীর সেই দলগুলোর দিকেও। তবে প্রশ্ন উঠছে, কেন এ কথা বলছেন পিকে?

পিকে-র যুক্তি, দেশের ৮০% মানুষ হিন্দু, কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ৪০% বিজেপিকে ভোট দেয়। বাকি হিন্দুরা বিজেপির সঙ্গে নেই, এই অংশের হিন্দুদের সঙ্গেই মুসলিমদের একজোট হওয়া দরকার। যদি ২০% মুসলিম আর ৪০% বিজেপিবিরোধী হিন্দু একসঙ্গে হয়ে যায়, তাহলেই শক্তিশালী বিকল্প তৈরি হবে। তাঁর কথায়, “এখন আর কোনো নেতাকে বা দলকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই।”

বিহারের সীমাঞ্চল অঞ্চলের মুসলিম ভোটারদের উদ্দেশে প্রাশান্ত কিশোরের সরাসরি বার্তা— “এইবার জাত বা ধর্ম দেখে নয়, তোমাদের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভোট দাও।” বিগত সরকারগুলো মুসলিমদের উন্নয়নে তেমন কাজ করেনি, বলে বারবার দাবি করে গিয়েছেন প্রশান্ত কিশোর। বিজেপিকে হারাতে হলে আদর্শ ও যুক্তির উপর ভিত্তি করে জোট গড়তে হবে, শুধু ধর্ম নয়— বলেও মত তাঁর। তিনি নিজে দাবিও করেছেন যে তিনি মুসলিমদের সমর্থন পাচ্ছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, ভোটকুশলী কি মুসলিমদের মসিহা হয়ে উঠতে চাইছেন?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভোটার তালিকায় দু'বার নাম থেকে দলের অর্থের উৎস! বিতর্কের চুম্বক প্রশান্ত কিশোর

Prashant Kishor Controversies: তাঁর দাবি, আয় থেকে প্রশান্ত কিশোর ৯৯ কোটি টাকার বেশি দান করেছেন নিজের দল ‘জন সুরজ’কে।

সাধারণত মুসলিম ভোট বিজেপিবিরোধী হিসেবে ধরা হয়। আর বিহারে মোট ভোটারের প্রায় ১৭-১৮ শতাংশ মুসলিম। রাজ্যটির রাজনীতিতে এই ভোটব্যাঙ্ক সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতদিন পর্যন্ত মুসলিম ভোটের বড় অংশ ছিল আরজেডি-র দখলে। আবার বিহারের বড় অংশের ভোটার হলেন যাদব ও অন্যান্য ওবিসি সম্প্রদায়। ওই রাজ্যের রাজনীতিতে 'মুসলিম-যাদব' ভোটব্যাঙ্ক বা M-Y ফ্যাক্টর বহুদিন ধরে চলে আসছে। লালু প্রসাদ যাদবের সময় থেকেই যাদব ও মুসলিম ভোট একজোট থাকায় আরজেডি শক্তিশালী হয়েছে। প্রশান্ত কিশোর মনে করেন, যদি এই ভোটভিত্তি বদলানো না যায়, তাহলে নতুন কোনো রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। এবার কি সেই সমীকরণই ভাঙতে চাইছেন প্রশান্ত কিশোর?

বিহারের সীমাঞ্চল অঞ্চলের কিসানগঞ্জ, পূর্ণিয়া, আরারিয়া ও কাটিহারে মুসলিম জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০২০ সালে ওয়েইসির দল এআইএমআইএম সীমাঞ্চলের পাঁচটি আসনে জিতে ছিল। তবে পরে তাদের চারজন বিধায়ক আরজেডি-তে যোগ দেন। এতে এআইএমআইএম-এর প্রভাব কিছুটা কমে গেলেও মুসলিম ভোট বিভাজনের ফলে আরজেডি ও কংগ্রেসের অনেকটাই ক্ষতি হয়। ফলে বিজেপি ও জেডিইউ তুলনামূলকভাবে সুবিধা পায়। এবারও মুসলিম ভোট রাজনীতির বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। এখানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৪৫-৫০%, যা বিহারের অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। পাশাপাশি দলিত, ওবিসি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারও উল্লেখযোগ্য। এই কারণেই সীমাঞ্চল বিহারের রাজনীতিতে একটি 'সুইং জোন' অর্থাৎ, যে দল এখান থেকে বেশি আসন পায়, তাদের পক্ষে সরকার গঠন সহজ হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিহারের রাজনীতিতে প্রশান্ত কিশোর! নির্বাচনের সমস্ত সমীকরণ তছনছ করে দেবেন?

Prashant Kishor in Bihar Politics: তিন বছর আগে তিনি জন সুরজ পার্টি গড়ে তুলে বিহার জুড়ে প্রচার শুরু করেছেন। তিনি বারবার বলেন, বিহারের মানুষকে জাতের বেড়া ভেঙে নিজেদের জন্য নতুন দিশা তৈরি করতে হবে।

এবার সীমাঞ্চলে প্রচারে জোর দিয়েছে প্রশান্ত কিশোরের দল জনসুরজ পার্টি। অন্যদিকে, আরজেডি মুসলিম-যাদব ভোটব্যাংক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। আবার বিজেপি ও জেডিইউ 'অবৈধ অভিবাসী' ইস্যু তুলে হিন্দু ভোট এক করতে চাইছে। তবে এআইএমআইএম কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিলেও, আগের মতো প্রভাব রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবার সীমাঞ্চলের মুসলিম ভোট তিন ভাগে ভাগ হতে পারে— আরজেডি, এআইএমআইএম ও জনসুরজ পার্টি-এর মধ্যে। প্রশান্ত কিশোরের বার্তা যদি মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, তাহলে তাঁর দল অনেকটাই সুফল পাবে। এআইএমআইএম যদি কম আসনে লড়াই করে, তাহলে মুসলিম ভোট বিভাজন কিছুটা কমতে পারে। তবে বিশ্লেষক মহলের একাংশই বলছেন, আরজেডি এখনও এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী দল, কিন্তু জনসুরাজ-এর উত্থান তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

পিকের দাবি, মুসলিম ভোটারা প্রতি বার একপাক্ষিকভাবে আরজেডিকে ভোট দেন, কিন্তু বিনিময়ে তেমন কিছু পান না। উন্নয়ন, শিক্ষা বা চাকরির সুযোগ— কোনো ক্ষেত্রেই মুসলিম সমাজের বিশেষ উন্নতি হয়নি। তাই এবার মুসলিম ভোটারদের 'নিজেদের ভবিষ্যৎ ভেবে' ভোট দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

প্রশান্ত কিশোর আগেই জানিয়েছিলেন, তাঁর দল এমন একটি রাজনৈতিক বিকল্প গড়তে চায় যেখানে মুসলিম ভোটাররা শুধু 'বিজেপিকে ঠেকানোর' যুক্তিতে নয়, বরং উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বের জন্য ভোট দেবেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর দলে মুসলিম সমাজ থেকে অন্তত ৪০ জন প্রার্থী মনোনয়ন পাবেন। যদিও প্রকাশিত তালিকায় সেই সংখ্যা ২১। জন সুরজ পার্টির প্রার্থী তালিকা দেখে বোঝা যায়, দলটি বিভিন্ন সম্প্রদায় ও শ্রেণির প্রার্থীকে সুযোগ দিতে চেয়েছে। দলের সদস্যদের মতে, জনসুরজ পার্টি জাত-ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং কাজ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাজনীতি করতে চায়।

সীমাঞ্চলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে তাঁর এই বার্তা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে এতটুকু নিশ্চিত, তাঁর প্রচারে বিহারের ঐতিহ্যগত ভোট-সমীকরণে এক নতুন আলোচনার সূচনা হয়েছে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ভারতের রাজনীতি কতটা বদলে দিয়েছেন মোদী?

25 years of Narendra Modi: ২৫ বছরে মোদী কতটা বদলে দিয়েছেন ভারতের রাজনীতি? উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রচারের ধরন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের ধারণা—কীভাবে বদলেছে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র?

ব্রাজিল থেকে আমেরিকা যে কারণে দক্ষিণপন্থীদের শাস্তি দিচ্ছে শান্তিকামী মানুষ

The Alt - right Tide Turns: বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে। হাঙ্গেরিতে ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান, সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী বিজয়, ব্রাজিলে প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও লুলার জয়, আমেরিকায় মিডটার্মে ডেমোক্র্যাটদের সংসদের দুই কক্ষ দখল, সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থী জোয়ারে ভাটার সুর। তবে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, ইতালিতে দক্ষিণপন্থা এখনও টিকে আছে। সেগুলির বিরুদ্ধেও চলছে জেনজিদের, শ্রমজীবী অভিবাসী মানুষদের বিক্ষোভ।

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।