পুরুষদের বিশ্বকাপে তিন নারীর দাপট, বদলে যাচ্ছে ফুটবলের ইতিহাস
Women referees: টোরি পেনসো যখন প্রথমবার পায়ে বল স্পর্শ করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র দশ। মায়ের বারণ ছিল, পড়ে গিয়ে কালশিটে লাগার ভয় ছিল। অথচ তাঁর দুই ভাই কখনোই এমন বারণের বেড়াজালে বন্দি হয়নি। বৈষম্য? মেয়েরা প্রথম অসমতার রক্তচক্ষু প্রত্যক্ষ করে বোধহয় খানিক পরিবার সূত্রেই।
শব্দের পাহাড়ে অনুষঙ্গ জন্ম নিলে বাক্যের মাধুর্য বাড়ে, নাকি অযথা প্রলাপের ভিড় বাড়ে? 'চা'-এর সঙ্গে 'টা'-এর কিংবা 'খেলা'-এর সঙ্গে 'ধুলো'-এর টান অমোঘ। কিন্তু জীবনে অনুষঙ্গ যদি বৈষম্যের ছায়া হয়ে দাঁড়ায়? নীল গ্রহের আদিম নিয়মে নারী অধিকার খানিক তেমনই বাতিল পাঁচ পয়সা, কিংবা পুরুষের এক চূড়ান্ত অবমাননাকর অনুষঙ্গ। নতুন সুগন্ধির বিজ্ঞাপন থেকে কিংবা বলিউডি ছবির নায়িকা—সব জায়গাতেই নারীকে পুরুষের অনুষঙ্গ পণ্য হিসেবে দৃশ্যায়ন করা হয়েছে। মগজে, মননে, মস্তিষ্কে ও মজ্জায় ঢুকে গিয়েছে এই বন্য বৈষম্যের বীজ।
যার শিকড় আজও ঈর্ষা জোগায় বলিউডের প্রথম সারির নায়িকা আট ঘণ্টা কাজের পাশাপাশি ন্যায্য পারিশ্রমিকের দাবি জানালে, কর্পোরেট ক্ষেত্রে নারী সহকর্মীর উন্নতি হলে, কিংবা বাসে বা মেট্রোর ফাঁকা 'লেডিস সিটে'। অফিসে নিউ জয়েনিকে ইন্টারভিউ টেবিলে বারবার প্রশ্ন করা হয়, 'আগামীর কী প্ল্যানিং?' কিংবা খাতায়-কলমে থাকা অধিকারে মাসিক ছুটির দিনে পুরুষ সহকর্মীর শ্লেষমিশ্রিত কটাক্ষ।
তবুও অনুষঙ্গেও বাড়ে ব্যাকরণ-বিচ্যুতি। নিয়ম আর হিসাবের পাতা ওলটপালট করে লেখা হয় দলছুট মহাকাব্য। 'মিসোজিনি'র দীর্ঘ ছায়া মুছে মহীরুহ হয়ে ওঠে বৃক্ষ। যাবতীয় না-পাওয়া, অবহেলা আর হেরে যাওয়া বন্ধক থাকে কালের গোপন গহিনে। সেখান থেকেই ধুলো ঝেড়ে নেওয়া কিছু আখ্যান। পুরুষ-অধিকৃত সাম্রাজ্যে শোনা যায় দাপুটে কিছু বুটের শব্দ। কারণ, ফুটবল মাঠ কবেই বা বৈষম্যের ধার ধেরেছে?
১৯৯১ সালের নারী বিশ্বকাপ। তৃতীয় স্থান নির্ধারণকারী ম্যাচে মুখোমুখি সুইডেন ও জার্মানি। ফিফা রেফারি কমিশনের এক সদস্য ড্রেসিংরুমে পৌঁছেছেন ক্লডিয়া ভাসকনসেলোস গুয়েদেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। রিও ডি জেনিরোতে বেড়ে ওঠা ক্লডিয়ার ছোটবেলা থেকেই সঙ্গী ছিল ফুটবল। তবুও সেদিন কি বুকটা খানিক ঢিপঢিপ করেনি তাঁর? মনে পড়ছিল, কৈশোরে এক অধ্যাপকের উৎসাহে প্রথমবার পৌঁছে যাওয়া রিওর প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ ফুটবল রেফারিজের দপ্তরে। তারপর টানা এক বছর প্রশিক্ষণের দিনগুলি। পরের বছরই নারীদের রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপ পরিচালনার ছাড়পত্র, পাশাপাশি হাতেখড়ি পুরুষ দলের ম্যাচেও। আজ তিনি পৌঁছেছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। গলায় ঝুলছে জাদুবাঁশি। ফিফা অফিশিয়ালরা এসে পৌঁছলেন। এক কর্মকর্তা করমর্দন করে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেন, "নারী রেফারিংয়ের ভবিষ্যতের ভার আপনার হাতেই তুলে দিলাম।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pickles the dog: ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসার আর মাত্র মাস চারেক বাকি। ঠিক এই সময়েই ইংল্যান্ডের মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলের কড়া নিরাপত্তা বলয় ভেঙে আচমকা চুরি হয়ে যায় ফিফার মহামূল্যবান ‘জুলে রিমে ট্রফি’। কোটি টাকার বিরল ডাকটিকিট অক্ষত রেখে চোরের শুধু এই ট্রফিটি নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য।
সেদিনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ অতিক্রম করেছে ৩৫টি বছর। প্রতিদিন গড়ে ৮৬টি ধর্ষণের রিপোর্ট নথিভুক্ত হয় ভারতে; প্রতি ঘণ্টায় বিশ্বের নিরিখে যে সংখ্যাটা ৫৩। প্রতি বছর ২০০ থেকে ৩০০টি অ্যাসিড আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ছয় হাজারের বেশি বধূহত্যার ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র পণ না দেওয়ার কারণে। পু অনুষঙ্গের ছায়া থেকে মহীরুহ হয়ে ওঠার শব্দে খোদাই হয়েছে কত চিরন্তন কুরুক্ষেত্রর বয়ান। কিন্তু সেসব দলিল কেউ খুলে দেখেনি তেমন। তাই এ পোড়া দেশে আজও ধর্ষকের গলায় মালা ঝোলে, আর ধর্ষিতার ধর্ম ও পরিধানের পরিধি মাপা হয়। রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বারবার, আর ফুটবল সাইডলাইন পেরিয়ে রিজার্ভের শেষ সিটে স্থান পায়; শুধু পরিবর্তিত হয় ফুটবল ফেডারেশনের নাম।
তাই স্বনিয়মে দিব্যি পৃথিবী নিজের অক্ষরেখায় আবর্তন করে হাজির করেছে আরও একটা বিশ্বকাপ। এবার আসর মার্কিন মুলুকে। যে রাষ্ট্র স্বয়ংসম্পূর্ণ, যে রাষ্ট্র সর্বশক্তিমান, যে রাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু বা থামিয়ে দিতে পারে মাত্র একটি অঙ্গুলিহেলনে। যে রাষ্ট্রে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মহিলা নিজেদের জীবনে কখনো না কখনো শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যে রাষ্ট্রে শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে ৭৬ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। বল গড়িয়েছে সেই রাষ্ট্রে।
তিনটি নাম। টোরি পেনসো, ব্রুক মায়ো ও ক্যাথরিন নেসবিট। বিগত কয়েকদিনে অনেকেই শুনেছেন বা কেউই শোনেননি। আসলে শুনলেও ধারেভারে এগিয়ে থাকা অতিকায় তারকাদের ভিড়ে খানিক নিষ্প্রভ, খানিক ম্রিয়মান।
টোরি পেনসো যখন প্রথমবার পায়ে বল স্পর্শ করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র দশ। মায়ের বারণ ছিল, পড়ে গিয়ে কালশিটে লাগার ভয় ছিল। অথচ তাঁর দুই ভাই কখনোই এমন বারণের বেড়াজালে বন্দি হয়নি। বৈষম্য? মেয়েরা প্রথম অসমতার রক্তচক্ষু প্রত্যক্ষ করে বোধহয় খানিক পরিবার সূত্রেই। তবুও দুই ভাইয়ের পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ানো চামড়ার বিস্ময়গোলকের অমোঘ আকর্ষণ বেশিদিন দূরে রাখতে পারেনি টোরিকে। অল্প বয়স থেকেই রেফারিংয়ে হাতেখড়ি। যখন বয়স ১৮, নিজের উপার্জনের পয়সা দিয়ে কিনলেন প্রথম গাড়ি। অলিম্পিক ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম পরিচালিত রেফারিং ক্যাম্পে আমন্ত্রণও পেলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Football Trafficking: বহু লোক এজেন্ট সেজে বসে আছে, যারা তরুণ ফুটবলার ও তাঁদের পরিবারকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে ঋণের জালে। এর ফলে তারা মারাত্মক আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছে।
টোরি পেনসো
তবু এই পেশাকে সর্বক্ষণের পেশা হিসেবে দেখতে সাহস করেননি। অন্তরায় ছিল পরিসংখ্যান। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে কোনো পেশাদার সম্পূর্ণ সময়ের নারী রেফারি ছিলেন না। বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরির পাশাপাশি সমানে চালিয়ে গেলেন ফুটবল পরিচালনার কাজ। একসময় মনে হলো, দুটি ক্ষেত্রে একসঙ্গে সেরাটা দেওয়া সম্ভব নয়। মন সায় না দেওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিলেন। হয়ে উঠলেন দেশের প্রথম পেশাদার নারী রেফারি ও ম্যাচ পরিচালক। এখন তাঁর তিন সন্তান। সঙ্গে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ম্যাচ পরিচালনারও। এই বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম চেক প্রজাতন্ত্র ম্যাচে ২২ জন পুরুষ ফুটবলারকে একাই সামলেছেন তিনি।
২২ জন পুরুষ ফুটবলারকে একাই সামলান টোরি পেনসো
টোরি পেনসোর সঙ্গে সাইডলাইনে ছিলেন আরও দুই সহযোদ্ধা। তাঁদের একজন ক্যাথরিন নেসবিট।অধ্যাপনা করেন। রসায়নশাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। লিঙ্কড-ইনে এখনও তাঁর নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে পিএইচডি শব্দবন্ধ। ২০১৬ সাল থেকে অধ্যাপনার পাশাপাশি নিজেকে যুক্ত রেখেছেন ফিফার অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক রেফারি তালিকায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মনে করা হয় ৬২ই ছিল প্রথম বিশ্বকাপ, যার জন্য নিজস্ব থিম সং তৈরি হয়। চিলির রকব্যান্ড লস র্যাম্বলার্স তৈরি করে 'এল রক দেল মুন্দিয়াল'। দক্ষিণ আমেরিকায় বিপুল জনপ্রিয়তা পায় গানটি। চিলির সঙ্গীতের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত রেকর্ডের তালিকায় স্থান পায় গানটি।
ক্যাথরিন নেসবিট
অধ্যাপনা ও বিজ্ঞান গবেষণার পাশাপাশি ফুটবল মাঠের কঠিন রসায়ন বুঝতে সমান পারদর্শী ক্যাথরিন নেসবিট। ২০১৬ সাল থেকেই তিনি এই পেশাকে আপন করে নিয়েছেন। গত ১০ বছর ধরে গবেষণার কাজে নিযুক্ত নেসবিটের নিজের একটি ল্যাব রয়েছে বাল্টিমোরের টাউসন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্লেষণাত্মক রসায়ন নিয়ে নাড়াচাড়ার পাশাপাশি ২২০১৩ সালে ন্যাশনাল উইমেন্স সকার লিগের (NWSL) উদ্বোধনী ম্যাচে বিপুল সংখ্যক দর্শকের সামনে নেসবিটের পেশাদার রেফারিংয়ে অভিষেক হয়। পরবর্তীতে তিনি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) এবং নারী বিশ্বকাপের গুরুদায়িত্বও সামলেছেন। এবার পুরুষদের বিশ্বকাপেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পতাকা হাতে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অক্লান্ত ছুটে গিয়েছেন এই নারী।
সবুজ মাঠে যেমন গিয়েছেন ক্যাথরিন, তেমনই গিয়েছেন আরেক কন্যা—ব্রুক মায়ো। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভালোবাসতেন ফুটবল আর ভালোবাসতেন নিজেকে—নিজের স্বকীয় চাওয়া-পাওয়াকে। সমাজ বড়ো দায়, কিন্তু নিজের সত্তা বাঁচিয়ে রাখার জেদ যে আরও বড়ো। মায়োর সেই গোঁয়ারতুমিকে প্রশ্রয় দেয় সবুজ মাঠ আর ভরসা দেয় চামড়ার গোলক। মায়ো আজও বিশ্বাস করেন, ফুটবল এক শাশ্বত সুন্দর বস্তু; এর এক অলীক ক্ষমতা আছে বিশ্বকে একসুতোয় বাঁধার। সেই সুতো আগলেই নিজের পরিচয় তৈরি করলেন ব্রুক। বিশ্বের সর্বপ্রথম সমকামী রেফারি তিনি। উদযাপন করেন প্রাইড মান্থ, উদযাপন করেন নিজের সাত্ত্বিক চাহিদাকে আর সব বিধিনিষেধের ঢাল হয়ে থাকা ফুটবলকে।
ব্রুক মায়ো
তিনি জানেন বড়ো হয়ে ওঠার কষ্ট। মাত্র ২৩ বছর বয়সে টেনেসিতে একটি স্কুল তৈরি করেছেন এবং সেখানে ছেলে ও মেয়েদের সকার প্রোগ্রাম চালু করেছেন নিজ দায়িত্বে। রেফারিংয়ের পাশাপাশি অবসরে তিনি কোচিংও করেন। যে দক্ষিণ অঞ্চলে শৈশব কাটিয়েছেন, সেখানে বহুবার লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। তারপর একদিন ঘর ছেড়েছেন। জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেন, 'পাহাড় ভালবেসে আপন করেছে পেনসিলভেনিয়া'। অগোচরে, অলক্ষ্যে চোখের জল লুকান মিথ্যার আশ্রয়ে; কারণ তাঁর পারিবারিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু ফুটবলের মানচিত্র বোধহয় কাউকেই খালি হাতে ফেরায় না। এক অদ্ভুত সাম্যর উপাসনা যার গোটা অভিধান জুড়ে।
তাই টোরি পেনসোর দুই সন্তান ফুটবলার হতে চাইলেও, মাকে অবাক করে ভরসা জোগায় কনিষ্ঠটি। প্রগাঢ় আস্থা চোখে অস্ফুটে বলে ওঠে, সে রেফারি হতে চায়; সে চায় মায়ের মতো হতে। ক্যাথরিনের হাজারো ছাত্রছাত্রী উদ্বুদ্ধ হয় এক নারীর বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব দেখে। এভাবেই ধিকিধিকি মশালের আগুনের হাতবদল হয়। সাইডলাইন থেকে হাসে এক অবোধ বালিকা, যে একসময় ভয় পেয়েছিল নিজের পরিচয়ে। তবুও সে আঁকড়ে ধরেছে সেই সত্তাকে, আষ্টেপৃষ্ঠে জমাট বেঁধেছে সাহস। একজোড়া বুট এভাবেই দমিয়ে রাখে ২২ পুরুষের ঔদ্ধত্য, তোয়াক্কা করে না সমাজের। একজোড়া বুট সবুজ মাঠে লেখে প্রতিরোধের রোজনামচা, আঁকে শেকল ভাঙার উচ্ছ্বাস। একজোড়া বুট তাই বিশ্ব শাসন করে!






