মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে ২০২৯-এর রাজনৈতিক অঙ্ক কষছে কেন্দ্র?
Delimitation: ডিলিমিটেশন ও আসন বৃদ্ধির প্রস্তাবে কেন বাড়ছে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা? মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোই কি আসল লক্ষ্য, নাকি এর আড়ালে রয়েছে বড় রাজনৈতিক হিসাব?
মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের কথা নতুন নয়। ২০২৩ সালেই সংসদে পাশ হয়েছে নারী শক্তি বন্দন আইন। কিন্তু এখন কেন্দ্র যে নতুন তিনটি বিল আনতে চাইছে, তা নিয়ে বিরোধিতা হচ্ছে অন্য জায়গায়। আপত্তি মহিলাদের সংরক্ষণে নয়, আপত্তি সেই সংরক্ষণকে লোকসভা আসন বৃদ্ধি এবং ডিলিমিটেশনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া নিয়ে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ পর্যন্ত করা হতে পারে। একই সঙ্গে ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাস হবে, এবং সেই পুনর্বিন্যাসের ভিত্তিতে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ করা হবে। সরকারের বক্তব্য, এতে ২০২৯ সালের মধ্যেই মহিলাদের সংরক্ষণ কার্যকর করা সম্ভব হবে। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, যদি সত্যিই মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে বর্তমান ৫৪৩টি আসনের মধ্যেই সংরক্ষণ কার্যকর করা হচ্ছে না কেন?
সমালোচকদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় মহিলাদের সংরক্ষণকে একটি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ সংরক্ষণের বিরোধিতা করলে তা সহজেই 'মহিলা বিরোধী' বলে তুলে ধরা যাবে। অথচ বিরোধী দলগুলির অধিকাংশই বলছে, তারা মহিলাদের সংরক্ষণের পক্ষে, কিন্তু তা ডিলিমিটেশন এর সঙ্গে জুড়ে থাকুক, তা চায় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal delimitation controversy: ডিলিমিটেশন নিয়ে কেন হঠাৎ এত বিতর্ক? কেন্দ্র কি সত্যিই বাংলাকে ভাগ করার পরিকল্পনা করছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী অভিযোগ করেছেন? জনগণনা ছাড়াই ডিলিমিটেশন হলে কী বদল আসতে পারে দেশের নির্বাচনী মানচিত্রে?
ডিলিমিটেশন কী? ডিলিমিটেশন মানে হলো জনসংখ্যার ভিত্তিতে নতুন করে লোকসভা এবং বিধানসভার আসন ভাগ করা। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী একসময় প্রতি জনগণনার পরই এই পুনর্বিন্যাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৭৬ সালে সিদ্ধান্ত হয়, ১৯৭১ সালের জনগণনাকেই ভিত্তি ধরা হবে, যাতে যেসব রাজ্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পরে সেই স্থগিতাদেশ ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
এখন নতুন প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, সংসদ চাইলে যে কোনো জনগণনার তথ্যকে ভিত্তি করে ডিলিমিটেশন করতে পারবে। বাস্তবে এর অর্থ, ২০১১ সালের জনগণনাকেও ভিত্তি করা হতে পারে। আর সেখানেই তৈরি হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা। কারণ উত্তর ভারতের বড় হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা অনেক বেশি বেড়েছে, অন্যদিকে দক্ষিণ এবং পূর্ব ভারতের অনেক রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম। ফলে ডিলিমিটেশন হলে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির লোকসভা আসন অনেক বেশি বাড়বে, আর দক্ষিণের রাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়বে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, ছত্তীসগঢ়, উত্তরাখণ্ড এবং দিল্লি মিলিয়ে বর্তমানে লোকসভায় ২০৭টি আসন রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে ৩৩৬ হতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি, যাদের বর্তমানে ১৩২টি আসন রয়েছে, তারা পেতে পারে ১৭৬টি আসন। সংখ্যায় বৃদ্ধি হলেও সামগ্রিক ভাগে তাদের অংশ কমে যাবে। অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BJP Bengal Sankalp Patra: বাংলায় বিজেপির ‘সংকল্প পত্র’ কি দিল্লির পুরনো প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি? ৩ হাজার টাকার ভাতা, অনুপ্রবেশ রুখতে কড়াকড়ি—এসব কি বাস্তবে সম্ভব? শ্লোগান আর বাস্তবের ফারাক কতটা?
এই কারণেই বিরোধীরা বলছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ার শাস্তি যেন দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিকে না পেতে হয়। সোনিয়া গান্ধী, ভগবন্ত মান, উদ্ধব ঠাকরে-সহ একাধিক নেতা বলেছেন, প্রথমে বর্তমান আসনের মধ্যেই মহিলাদের সংরক্ষণ চালু করা হোক, পরে ডিলিমিটেশন নিয়ে আলাদা আলোচনা হোক।
সরকার অবশ্য বলছে, সংসদ বড় না করলে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করা কঠিন হবে। কারণ বর্তমান আসনের মধ্যে সংরক্ষণ করলে বহু পুরুষ সাংসদের আসন বদলাতে হবে। নতুন আসন তৈরি হলে পুরনো আসনও থাকবে, আবার মহিলাদের জন্য নতুন সংরক্ষিত আসনও তৈরি করা যাবে। সমালোচকদের বক্তব্য, এভাবে আসলে পুরুষ সাংসদদের স্বার্থও রক্ষা করা হচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে স্বচ্ছতা নিয়ে। বিরোধীদের অভিযোগ, এত বড় সাংবিধানিক পরিবর্তনের আগে কোনো সর্বদলীয় বৈঠক করা হয়নি, রাজ্যগুলির সঙ্গে আলোচনা হয়নি, এমনকী বিলের খসড়াও শেষ মুহূর্তে দেওয়া হয়েছে। ফলে সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই এত বড় পরিবর্তন আনার চেষ্টা হচ্ছে।
অর্থাৎ, বিতর্কের আসল বিষয় মহিলাদের সংরক্ষণ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সেই সংরক্ষণ কার্যকর করার নামে কি দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেওয়া হচ্ছে? বিরোধীরা বলছে, মহিলাদের সংরক্ষণ জরুরি, কিন্তু তা যেন কোনো বিশেষ রাজনৈতিক লাভের হাতিয়ার না হয়। আর সেই কারণেই 'নারী বন্দন' না '২০২৯-এর জন্য আসন নিশ্চিত” – এই প্রশ্ন এখন জাতীয় রাজনীতির
কেন্দ্রে উঠে এসেছে।






