সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন
Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।
মানুষ সাধারণত জমি কেনে বাড়ি বানাতে, চাষবাস করতে কিংবা ভবিষ্যতে চড়া দামে বিক্রি করে মুনাফা লুটতে। কিন্তু স্রেফ বুনো জন্তুরা যাতে নিশ্চিন্তে চরে বেড়াতে পারে, তার জন্য নিজের জমানো সব পুঁজি ঢেলে বিঘের পর বিঘে রুক্ষ জমি কিনে কেউ ফেলে রাখে—এমন কথা সচরাচর শোনা যায় না। ঠিক এই অবিশ্বাস্য কাণ্ডটাই ঘটিয়েছিলেন আদিত্য সিং এবং তাঁর স্ত্রী পুনম সিং। দিল্লির সরকারি চাকরি আর বিলাসী শহরের মোহ এক লহমায় তুচ্ছ হয়ে যায় রাজস্থানের এক বাঘকে দেখার পর। রণথম্ভোর ব্যাঘ্র প্রকল্পের সীমানায় পড়ে থাকা ৩৫ একরেরও বেশি রুক্ষ, পাথুরে জমি কিনে, তাকে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে এক গভীর অরণ্যে রূপান্তরিত হতে দেন এই যুগল।
১৯৮৪ সালে স্কুল শেষ করে আদিত্য প্রথম পা রাখেন রণথম্ভোরে। তাঁর বাবা ছিলেন ভারতীয় সেনার রাজপুতানা রাইফেলসের ব্রিগেডিয়ার। বাবার সুবাদেই রণথম্ভোরের কিংবদন্তি ফিল্ড ডিরেক্টর, যাঁকে অনেকেই ‘টাইগার গুরু’ বলে ডাকতেন, সেই ফতেহ সিং রাঠোরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। ফতেহ আদিত্যকে রণথম্ভোরের বিখ্যাত জোগি মহলের একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। সেখানে প্রায় এক মাস ফতেহের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সময় একদিন আদিত্যের সরাসরি চোখাচোখি হয় ‘গেঙ্গিস’ নামের এক রাজকীয় বাঘের সঙ্গে। সেই একটা মুহূর্তই তাঁর গোটা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সরকারি চাকরি বা শহরের বাঁধাধরা নিয়মের প্রতি তাঁর মন আর টানেনি। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৮৮ সালে আদিত্যের সঙ্গে প্রথমবার রণথম্ভোরে আসেন পুনম। সেখানে তিনি দেখেন বিখ্যাত বাঘিনী ‘মাছলি’ তার তিন ছানাকে নিয়ে খেলছে। পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার ও ভাস্কর পুনমের মনে সেই দৃশ্য এমন ছাপ ফেলেছিল যে সফর শেষে তিনি সরাসরি আদিত্যকে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁরা চিরতরে রণথম্ভোরে চলে আসতে পারেন কি না।
তবে দিল্লি ছেড়ে আসা অত সহজ ছিল না। আদিত্য ১৯৯২ ব্যাচের ইউপিএসসি সিএসএস আধিকারিক হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর মন সবসময় পড়ে থাকত সেই বাঘের ডেরায়। অবশেষে ১৯৯৮ সালে দম্পতি এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। আদিত্য দিল্লির সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন, পুনমও গুটিয়ে নেন শহরের কাজ। দুজনে মিলে চলে আসেন রাজস্থানের সওয়াই মাধোপুরে। ফতেহ সিং রাঠোরের পরামর্শে পর্যটকদের থাকার জন্য তাঁরা শুরু করেন ‘রণথম্ভোর বাগ’ নামের একটি ছোট হোমস্টে। পুনম নিজের কাঁধে তুলে নেন অতিথি আপ্যায়নের ভার, আর আদিত্য তাঁর দীর্ঘদিনের শখকে পেশা বানিয়ে ক্যামেরা হাতে নেমে পড়েন জঙ্গলে। বিবিসি ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তিনি পুরোদমে কাজ শুরু করেন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ও তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Lotus Farming India: ২০২০ সালে গতানুগতিক চাষের ঝুঁকি এড়িয়ে তিনি পা বাড়ান ফুল চাষে। নিজের শেষ সঞ্চয়ের ১.০৮ লাখ টাকা দিয়ে চুক্তি করেন লক্ষ্ণৌর ‘ন্যাশনাল বোটানিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (NBRI)-এর সঙ্গে। সেখান থেকে নিয়ে আসেন ‘নমঃ-১০৮’ (লক্ষ্মী কমল) নামের বিরল ১০৮ পাপড়ির পদ্ম চাষের প্রযুক্তি, ৪০০টি চারা ও বীজ।
ক্যামেরা হাতে আদিত্য 'ডিকি' সিংহ
রণথম্ভোরে বসবাস শুরু করার ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে, বিবিসির একটি তথ্যচিত্রের কাজের সূত্রে আদিত্য পৌঁছন ভাদলাভ উপত্যকায়। জাতীয় উদ্যানের খুব কাছে অবস্থিত এই জায়গাটি দেখে তাঁর মন ভেঙে গিয়েছিল। চারিদিকে পাথর ভাঙার অবৈধ খাদান চলছিল এবং অবাধে গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছিল। সংরক্ষিত বনের সীমানা কাছে হওয়ায় খাবারের সন্ধানে প্রায়ই হরিণ, নীলগাই আর বুনো শুয়োর ঢুকে পড়ত কৃষকদের জমিতে। ফসল বাঁচাতে না পেরে এবং বুনো জন্তুর উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে বহু স্থানীয় কৃষক তাঁদের নষ্ট হয়ে যাওয়া জমি জলের দরে বিক্রি করে দেওয়ার পথ খুঁজছিলেন। আদিত্য ও পুনম খেয়াল করলেন, এই কৃষিজমিগুলি আসলে বাঘ এবং অন্য বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলের পথের মধ্যে পড়ছে। জঙ্গল ছোট হয়ে যাওয়ায় প্রাণীরা মানুষের এলাকায় ঢুকছে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাড়ছে। দম্পতি ভাবলেন, এই জমিগুলি যদি কোনো ব্যবসায়ীর হাতে চলে যায়, তবে সেখানে বড় বড় রিসর্ট বা খনি তৈরি হবে, যা জঙ্গলের ভারসাম্যকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Eco Friendly Sal Leaf Products: আমাদের দেশের রাস্তাঘাট থেকে শালপাতার থালা-বাটিগুলি যখন আস্তে আস্তে হেলায় হারিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে সুদূর ইউরোপে এগুলি খুঁজে পেয়েছে এক অভূতপূর্ব সম্মান। জার্মানির একটি স্টার্টআপ ‘লিফ রিপাবলিক’ ২০১৬ সাল নাগাদ পাতায় তৈরি ফেলে দেওয়ার মতো থালা-বাটি বাজারে এনে বিশ্বজুড়ে দারুণ আলোড়ন ফেলে দেয়।
সেই শঙ্কা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক পরিকল্পনা। ২০০০ সালে আদিত্য প্রথম এক টুকরো জমি কেনেন। শুরুতে তাঁরা নিজেরাও পুরোপুরি জানতেন না যে এই জমি নিয়ে ঠিক কী করবেন। পুনম পরে জানিয়েছিলেন, তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপরের কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।
সাধারণত বন তৈরি করার কথা উঠলেই মানুষ হাজার হাজার গাছের চারা পোঁতার কথা ভাবে। কিন্তু আদিত্য ও পুনমের দর্শন ছিল একেবারেই আলাদা। আদিত্য বিশ্বাস করতেন, বন তৈরি করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাকে মানুষের ছোঁয়া থেকে দূরে রাখা এবং প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেওয়া। তাঁরা কোনো কৃত্রিম ল্যান্ডস্কেপিং বা বাগান সাজানোর চেষ্টা করেননি। জমি কেনার পর তাঁরা প্রথমে শক্ত বেড়া দিয়ে পুরো এলাকাটি ঘিরে ফেলেন, যাতে বাইরে থেকে গবাদিপশুর পাল ঢুকে কচি ঘাস না খেয়ে ফেলে এবং কেউ কাঠ কাটতে না পারে। এরপর জমি থেকে উপড়ে ফেলা হয় ক্ষতিকর আগাছা। বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য তৈরি করা হয় কয়েকটি ছোট জলাশয়, যা রাজস্থানের কাঠফাটা গরমে প্রাণীদের জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে। সবথেকে বড় কথা, তাঁরা স্থানীয় গ্রামবাসীদের শত্রু না ভেবে বন্ধু বানান। স্থানীয় গ্রামের সুমের নামের এক যুবককে তাঁরা বনরক্ষী হিসেবে নিয়োগ করেন, যিনি দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে এই সবুজ অঞ্চলকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Plastic Recycling: বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ব্যাগ, ফ্যাশনেবল ওয়ালেট কিংবা ঘরের সুন্দর প্ল্যান্টার! প্রথম শুনলে হয়তো একটু খটকা লাগতে পারে—‘ফেলে দেওয়া জঞ্জাল দিয়ে আবার ফ্যাশন?’ কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কণিকা আহুজা। দিল্লির বর্জ্যের পাহাড়কে তিনি রূপ দিয়েছেন এক অনন্য সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে, যার নাম ‘লিফাফা’ (Lifaffa)।
আদিত্য, পুনম ও তাঁদের কন্যা
মানুষের অত্যাচার বন্ধ হতেই প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ দেখাতে শুরু করে। প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই রুক্ষ পাথুরে মাটিতে জন্ম নেয় স্থানীয় প্রজাতির ঘাস আর কাঁটাঝোপ। সেই ঘাসের আড়ালে ধীরে ধীরে মাথা তোলে দেশীয় গাছের চারা এবং বছর দশেকের মধ্যে রুক্ষ, ফাটা জমি ঢেকে যায় সবুজ পাতার ছাউনিতে। যে জমিতে একসময় এক টুকরো ঘাস দেখা যেত না, সেখানে এখন গাছপালা, পাখি ও প্রজাপতি মিলিয়ে তিনশোরও বেশি প্রজাতির বসত। ঘাস আর জল পেয়ে প্রথমে এলাকায় ভিড় জমায় হরিণ, সম্বর, নীলগাই আর বুনো শুয়োর। আর তাদের পিছু পিছু স্বাভাবিক নিয়মেই ফিরে আসে বনের রাজা—বাঘ। রণথম্ভোরের মূল জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বাঘ ও চিতাবাঘ নিয়মিত এই ব্যক্তিগত বনে এসে আশ্রয় নিতে শুরু করে। বৈশাখের তীব্র গরমে এখানকার ঠান্ডা ছায়া আর জলাশয় বাঘেদের কাছে স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে। কখনো কখনো বাঘেরা টানা কয়েক দিন এই বনে কাটিয়ে আবার জঙ্গলে ফিরে যায়। মানুষের এলাকায় না ঢুকেই প্রাণীরা এখানে খাবার ও জল পাওয়ায় স্থানীয় এলাকায় মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমে যায়। জমি মাফিয়া বা রিসর্ট ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার প্রস্তাব নিয়েও এই জমি কিনতে পারেনি, কারণ এই দম্পতির কাছে এটি কোনো ব্যবসায়িক সম্পত্তি ছিল না।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে রণথম্ভোরের প্রতিটি বাঘকে নিজের সন্তানের মতো চিনেছিলেন আদিত্য। তিনি সাত হাজারেরও বেশি সাফারি করেছেন, প্রতিটি বাঘের জীবন ক্যামেরাবন্দি করে নথিভুক্ত করেছেন এবং বাঘিনী নূরকে নিয়ে চমৎকার বইও লিখেছেন। চোরাশিকার রোখার জন্য বন দপ্তরের সঙ্গে কাজ করা থেকে শুরু করে শিশুদের সচেতন করা—সবক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। নিজের পুরস্কারের অর্থও তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় বনকর্মী ও গ্রামের শিশুদের শিক্ষার জন্য। কিন্তু ২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ৫৭ বছর বয়সে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান আদিত্য। আদিত্য চলে গেলেও তাঁর স্বপ্ন থেমে যায়নি। কন্যা ন্যায়রাকে সঙ্গে নিয়ে পুনম আজও রণথম্ভোরে সেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি একাই হোমস্টে পরিচালনা করছেন, অতিথিদের প্রকৃতির পাঠ দিচ্ছেন এবং ভাদলাভের সেই অরণ্যকে সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন।
ভাদলাভের এই বন হয়তো রণথম্ভোর ব্যাঘ্র প্রকল্পের বিকল্প নয়, কিন্তু এটি প্রমাণ করেছে যে প্রকৃতিকে বাঁচাতে বড় বড় বৈজ্ঞানিক ল্যাব বা কোটি কোটি টাকার কৃত্রিম প্রকল্পের প্রয়োজন পড়ে না। প্রয়োজন পড়ে শুধু একটু ধৈর্য আর ভালবাসার। মানুষ যদি ধ্বংস করা বন্ধ করে প্রকৃতিকে ছেড়ে দেয়, তবে প্রকৃতি নিজেই নিজের ক্ষত সারিয়ে নিতে পারে।






