যে শালপাতার থালা আমরা ভুলে গিয়েছি, ইউরোপে তার দাম ১৫০ টাকা!
Eco Friendly Sal Leaf Products: আমাদের দেশের রাস্তাঘাট থেকে শালপাতার থালা-বাটিগুলি যখন আস্তে আস্তে হেলায় হারিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে সুদূর ইউরোপে এগুলি খুঁজে পেয়েছে এক অভূতপূর্ব সম্মান। জার্মানির একটি স্টার্টআপ ‘লিফ রিপাবলিক’ ২০১৬ সাল নাগাদ পাতায় তৈরি ফেলে দেওয়ার মতো থালা-বাটি বাজারে এনে বিশ্বজুড়ে দারুণ আলোড়ন ফেলে দেয়।
১০-১৫ বছর আগেও কোনো বিয়েবাড়িতে খাওয়া মানেই ছিল শালপাতার প্লেটে ভোজ খাওয়া। ৫ বছর আগেও রাস্তার ধারে ফুচকা খাওয়া মানেই ছিল শাল পাতার বাটিতে খাওয়া। কিন্তু আজ সেই জায়গা নিয়ে নিয়েছে থার্মোকল, প্লাস্টিক, কাগজ ইত্যাদি। শালপাতার সেই চেনা সোঁদা গন্ধ, আর বাঁশের সরু কাঠি দিয়ে জোড়া দেওয়া পাতা, বাটিগুলি হঠাৎ কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল!
তবে আমাদের দেশের রাস্তাঘাট থেকে শালপাতার থালা-বাটিগুলি যখন আস্তে আস্তে হেলায় হারিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে সুদূর ইউরোপে এগুলি খুঁজে পেয়েছে এক অভূতপূর্ব সম্মান। জার্মানির একটি স্টার্টআপ ‘লিফ রিপাবলিক’ ২০১৬ সাল নাগাদ পাতায় তৈরি ফেলে দেওয়ার মতো থালা-বাটি বাজারে এনে বিশ্বজুড়ে দারুণ আলোড়ন ফেলে দেয়। তারা প্লাস্টিক, আঠা বা কোনো ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ছাড়াই সেলাই করা পাতার সঙ্গে উদ্ভিজ্জ তরল-রোধী স্তর যুক্ত করে এক বিশেষ পরিবেশবান্ধব প্লেট তৈরি করে। বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে এটিকে নতুন পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন বলে প্রশংসা করা হয়। অথচ আমরা বাঙালিরা যুগ যুগ ধরে এই জিনিস ব্যবহার করে আসছি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sawantwadi Ganjifa: একসময় মুঘল রাজদরবারের বড় বড় সম্রাট থেকে শুরু করে উপমহাদেশের বিভিন্ন ছোট-বড় রাজপরিবারে এই খেলা ছিল আভিজাত্য আর বিনোদনের প্রধান অঙ্গ। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই ঐতিহ্য যখন সস্তা, কলকারখানায় তৈরি চারকোণা তাসের ভিড়ে প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছিল, তখন এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে আসে মহারাষ্ট্রের এক রাজপরিবার। তাঁদের জেদ আর ভালবাসার উপর ভর করেই আজ শতাব্দীর প্রাচীন এই শিল্প আবার নতুন করে বেঁচে উঠেছে।
পরবর্তীকালে কাঁচামাল সরবরাহের কিছু সমস্যার কারণে সেই জার্মান কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে গেলেও পাতার প্লেটের চাহিদা মোটেও কমেনি। আজ ইউরোপের একাধিক কোম্পানি, যেমন যুক্তরাজ্যের 'তাপারি' নেপাল ও ভারত থেকে এই শালপাতার তৈরি জিনিসপত্র নিয়ে গিয়ে তাদের দেশে বিক্রি করছে। দ্য বেটার ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, এৎসি বা তাপারি-র মতো আন্তর্জাতিক অনলাইন শপিং সাইটে হাতে তৈরি ২৫-৩০টি শালপাতার থালার এক-একটি প্যাকেটের দাম রাখা হচ্ছে প্রায় ৩১.৯৬ ইউরো, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। অর্থাৎ ইউরোপে এক-একটি শালপাতার থালার দাম পড়ছে প্রায় ৯০ থেকে ১৫০ টাকা, অথচ আমাদের দেশে পাইকারি বাজারে এগুলি হয়তো পাওয়া যায় মাত্র ১ থেকে ৩ টাকায়। ইউরোপীয়রা বুঝেছে যে এগুলি শতভাগ প্লাস্টিকমুক্ত, রাসায়নিকবিহীন এবং পরিবেশবান্ধব। ব্যবহারের পর মাটিতে ফেললে মাত্র ২৮ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মিশে যায়, এমনকী গবাদি পশুও খেয়ে নিতে পারে। আর কোনো দুটি পাতা হুবহু এক নয় বলে প্রতিটির মধ্যে রয়েছে নিজস্ব এক নান্দনিক ছোঁয়া।
প্লাস্টিক বা থার্মোকল আবিষ্কারের শত শত বছর আগে থেকেই আমাদের দেশে শালপাতার থালা, দোনা বা পাত্রাবলীর ব্যবহার ছিল। বিয়েবাড়ি, পুজো-পার্বণ, মন্দিরের মহাপ্রসাদ বিতরণ কিংবা মেলায় খাবার দিতে শালপাতার জুড়ি মেলা ভার ছিল। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে আজও মহাপ্রসাদ শালপাতাতেই পরিবেশন করা হয়। এমনকী প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র ‘চরক সংহিতায়’ পাতায় খাওয়ার উপকারিতার কথা স্পষ্ট লেখা আছে। আচার্য চরক বলেছিলেন, শালপাতার মতো প্রাকৃতিক পাত্রে হাত দিয়ে খাওয়ার যে স্পর্শসুখ, তা খাবারের আনন্দকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া শালপাতায় প্রাকৃতিকভাবে জীবাণুনাশক গুণ রয়েছে, যা খাবারে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে দেয় না। গরম খাবার প্লাস্টিকে রাখলে ক্ষতিকর রাসায়নিক খাবারে মিশে যায়, কিন্তু শালপাতায় সেই ভয় একদম নেই। উল্টে শালপাতার হালকা সোঁদা গন্ধ খাবারের স্বাদকে এক আলাদা মাত্রা দেয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mahua liquor: পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যে মহুয়া অন্যতম। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের গভীর জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু জংলি ফুল দিয়ে তৈরি মহুয়া এখন আর স্রেফ ‘কান্ট্রি লিকার’ নয়, বরং হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক লাক্সারি ব্র্যান্ড।
শালপাতার প্লেট তৈরি করতে কখনোই গাছ কাটা হয় না। শালগাছের কোনো ক্ষতি না করেই জঙ্গল থেকে ঝরে পড়া বা নিচের দিকের পাকা পাতা সংগ্রহ করা হয়। গ্রামের ও বনঞ্চলের আদিবাসী পরিবারের নারীরাই এই শিল্পের মূল কারিগর। ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগঢ় এবং পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম বা বীরভূমের হাজার হাজার আদিবাসী নারীর রুটিরুজি জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। ভোরে জঙ্গলে গিয়ে ভালো পাতা তুলে এনে উঠোনে হালকা রোদে শুকানো হয়, যাতে পাতা নমনীয় থাকে অথচ ছিঁড়ে না যায়। এরপর সরু বাঁশের চটা বা নিম গাছের কাঁটা দিয়ে ৬ থেকে ৮টি পাতা একে অপরের উপর চাপিয়ে সূক্ষ্মভাবে সেলাই করা হয়। সেলাইয়ের পর ভারি কিছু দিয়ে চেপে রাখা হয় যাতে থালাগুলো চ্যাপ্টা ও সমান হয়। বর্তমানে অবশ্য অনেক জায়গায় আধুনিক হাইড্রোলিক প্রেস ও সেলাই মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে কাজের গতি ও স্থায়িত্ব দুটোই বেড়েছে।
কিন্তু যে জিনিস পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য এত ভালো, সেটি হঠাৎ আমাদের শহরের মোড়গুলি থেকে কেন উধাও হয়ে গেল?
সস্তা প্লাস্টিক ও থার্মোকলের দাপট। প্লাস্টিকের চামচ বা বাটির দাম মাত্র কয়েক পয়সা হওয়ায় ছোটখাটো ফুচকাওয়ালা বা চাট বিক্রেতারা খরচ বাঁচাতে প্লাস্টিক বেছে নিয়েছেন। কারখানায় তৈরি প্লাস্টিক খুব সহজে যেকোনো দোকানে পেয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু জঙ্গল থেকে শালপাতা সংগ্রহ করে শহরের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাটা অতটা সংগঠিত ছিল না। প্লাস্টিকের পাত্র স্তূপ করে রাখা সহজ আর ভিজে নষ্ট হওয়ার ভয় কম হওয়ায় শহুরে জীবন খুব সহজেই শালপাতাকে সরিয়ে প্লাস্টিককে আপন করে নেয়।
তবে প্লাস্টিক বর্জ্যের আকাশছোঁয়া দূষণ কমাতে শালপাতা আবার নিজের দেশেও নতুন করে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। ওড়িশার কান্ধমাল বা ময়ূরভঞ্জের মতো জেলায় সরকারি উদ্যোগে ‘বন ধন বিকাশ কেন্দ্র’ এবং নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে শালপাতার কারখানা গড়ে উঠেছে। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়াতেও হাজার হাজার নারী আধুনিক মেশিনে শালপাতার থালা বানিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এমনকী জলপাইগুড়ির কিছু পিকনিক স্পটে প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে শালপাতার থালা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যে শালপাতার বাটি আমাদের কাছে নিতান্তই সাধারণ আর পুরনো বলে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে গিয়ে সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে দামি এবং পরিবেশবান্ধব সম্পদ।






