ছোট্ট তুকেই সারতে পারে এইডস! দিশা দেখাচ্ছে নতুন আবিষ্কার

এবারে আর ভ্যাকসিন নয়, HIV/AIDS-এর চিকিৎসার জন্য সরাসরি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংকে হাতিয়ার করতে চলেছেন ইজ়রায়েলের তেল আভিভ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা। তার জন্য এইবারে আর শরীরে অ্যান্টিবডি প্রবেশ করানো বা অ্যান্টিবডি তৈরিতে দায়ী জেনেটিক বস্তু প্রবেশ করানো নয়। অ্যান্টিবডি তৈরি করে, সেরকম কোশকেই সরাসরি নিশানা করলেন তাঁরা। আর ভোল বদলে দিলেন সেই কোশের জিনের।

এগুলি কোন ধরনের কোশ, যাদের ভোল বদলালেন বিজ্ঞানীরা? এই কোশ এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা, যাদের বি সেল (B-Cell) বলা হয়। এবং শরীরে ভাইরাসের আক্রমণ হলে এই কোশগুলি অ্যান্টিবডি তৈরি করে, ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে সাহায্য করে।

কিন্তু সব অ্যান্টিবডি সব ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। এইচআইভি বা এইডসের ভাইরাসের বিরুদ্ধে যে অ্যান্টিবডি কাজ করে, নির্দিষ্ট সেই অ্যান্টিবডি আবার নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না, বা হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। একদম তালা-চাবির মতো নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি নির্দিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধেই কাজ করে।

আরও পড়ুন: করোনাকে চিনিয়েছিলেন তিনিই, আজ আক্রান্ত নিজেই, যে কারণে অ্যান্টনি ফাউসি থেকে যাবেন ইতিহাসে

বি সেলগুলির জিনে ভোল বদলানো হলো, যাতে তারা এইচআইভির বিরুদ্ধে কার্যকরী অ্যান্টিবডি তৈরি করবে। জিন এডিটিং-এর মাধ্যমে বি সেলের ডিএনএ-তে নির্দিষ্ট জিন প্রবেশ করানো হলো, যেগুলি ঠিক এমন অ্যান্টিবডি উৎপাদনের জন্য দায়ী। আবার বি সেলগুলিকে শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেখা হলো শরীরে এইচআইভির বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু শুরুতেই তো আর যে কোনও পরীক্ষা মানুষের ওপর করে দেখা যায় না। তাই জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করার পর, বি সেলগুলিকে ইঁদুরের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেখা হয় আদৌ তারা (বি সেল) এইচআইভির বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি করছে কি না।

বি সেল সাধারণত তৈরি হয় আমাদের হাড়ের মজ্জায়। তারপর যখন তারা পরিণত হয়, তখন আমাদের রক্ত এবং লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমে এসে মেশে। তারপর সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের বিভিন্ন প্রান্তে। এক্ষেত্রে মানুষের রক্ত থেকে বি সেল সংগ্রহ করে, ক্রিস্পার প্রযুক্তির সাহায্যে জিন এডিটিং করেছেন গবেষকরা।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জন্য একটি বহুল-ব্যবহৃত প্রযুক্তি হল ক্রিস্পার। ক্রিস্পারকে (CRISPR) বলা হয় আণবিক কাঁচি বা মলিকিউলার সিজা়র। যার সাহায্যে জিনের অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকর অংশ কেটে বাদ দেওয়া যায়।

জিনকে কল্পনা করা যাক একটি লম্বা ফুলের মালার মতো করে, যার মাঝের কিছু অংশ আমরা কেটে ফেলতে চাই বা টানা সেই ফুলের মালার মাঝে অন্য কোনও ফুল এনে জুড়তে চাই। এই দু'টি কাজের কোনও একটি করতে গেলে ছিঁড়তে হবে মালার কিছু অংশ, যার জন্য দরকার একটি কাঁচির ।

ক্রিস্পার হল সেই কাঁচি, যার সাহায্যে ঠিক যেখানে দরকার, জিনের ঠিক সেখানেই কেটে জায়গা তৈরি করে বসিয়ে দেওয়া যাবে নতুন কোনও জিন। সেই কাজ হলো, আবার জিনের কাটা অংশগুলিকে জুড়ে একটি নিরবছিন্ন জেনেটিক বস্তু তৈরি করা হয়।

এই গবেষণা যাঁর তত্ত্বাবধানে হয়েছে, তিনি তেল আভিভ ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. অ্যাডি বার্জে়ল। ড. বার্জে়ল সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হাতে গোনা কিছু গবেষকই আজ অবধি শরীরের বাইরে বি সেলকে এনে, এই কোশের জিন এডিটিং করতে পেরেছেন এবং তাঁদের মধ্যে ড. বার্জে়ল ও তাঁর গবেষণার দল অন্যতম। এবং ড. বার্জে়ল ও তাঁর তত্ত্বাবধানে কাজ করা গবেষকরাই প্রথম, যাঁরা শরীরে এরকম পরিবর্তন আনতে পেরেছেন এবং বি সেল থেকে কাঙ্ক্ষিত অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পেরেছেন। খুব সম্প্রতি এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে 'নেচার' জার্নালেও।

ক্রিস্পারের সাহায্যে জিন এডিটিং তো হলো। কিন্তু তার আগের মূল যে ধাপ, অর্থাৎ অ্যান্টিবডি তৈরি করবে যে জিন, সেটিকে বি সেলের ভেতরে ঢোকানো হলো কী করে? এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ভাইরাসের বাইরের অংশ বা এনভেলপকে। এটি একটি খাঁচার মতো অংশ এবং তার ভেতরেই আগে প্রবেশ করানো হয় সেই জিন, যেটি এইডসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে। বলা যেতে পারে, ভাইরাসের খোলস একটি খাঁচা, যা মালবাহী কার্গোর মতো বয়ে নিয়ে যাবে জিনটিকে।

ভাইরাসের খোলস বা বাইরের এনভেলপ অংশটি বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়। ঘুরিয়ে বললে, একটি ভাইরাসই ব্যবহার করা হচ্ছে, আরেকটি ভাইরাসকে দমন করার জন্যে। তবে ভাইরাসের বাইরের অংশ বা এনভেলপটিতে আবার এক্ষেত্রে একটু ছোট পরিবর্তন আনতে হয়, যাতে আবার তাদের থেকে রোগ সৃষ্টি না হয়। এই গবেষণার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

ড. বার্জে়ল জানাচ্ছেন, গবেষণায় ব্যবহৃত ইঁদুরগুলির রক্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে এইচআইভি-র বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছিল, তাদের রক্ত পরীক্ষার পর। আর সেখান থেকে গবেষকরা নিশ্চিত হন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কেবল সফল হয়েছে এমন নয়, পর্যাপ্ত পরিমাণ এইচআইভি-র বিরুদ্ধে কার্যকরী কাঙ্ক্ষিত অ্যান্টিবডিও তৈরি হয়েছে এর ফলে।

কিন্তু এখানে উল্লেখ্য, গবেষণায় ব্যবহৃত ইঁদুরগুলিকে এইচআইভি সংক্রমণ করে দেখা হয়নি তারা আদৌ ভাইরাসটিকে প্রতিরোধ করতে পারছে কি না। তবে ড. বার্জে়ল আশা করছেন, অ্যান্টিবডিগুলি যে পরিমাণে তৈরি হয়েছে, তা এইচআইভি-কে প্রতিরোধ করতে যথেষ্ঠ। কিন্তু তার পরেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ভাইরাল লোড বেশি হলে বাস্তবে মানুষের দেহে যে পরিমাণ অ্যান্টিবডি তৈরি হবে, তা কতটা পারবে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ করতে।

এটি এখনও মানুষের শরীরে প্রয়োগ করে দেখা হয়নি, তার ফলে এখনও জানা যায়নি, এই পদ্ধতির কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া মানুষের শরীরে দেখা যাবে কি না।

তবে ভ‍্যাকসিন প্রয়োগের থেকে এই পদ্ধতি অনেকাংশে আলাদা তো বটেই, পাশাপাশি সুবিধাজনকও। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে কিছুদিন পরেই শরীরে নির্দিষ্ট ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডির সংখ্যা কমতে শুরু করে। এক্ষেত্রে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কারণ শরীরে পাকাপাকিভাবে অ্যান্টিবডি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জিন থেকে যাচ্ছে।বলা যায়, শরীরেই থেকে যাচ্ছে অ্যান্টিবডি তৈরির কারখানা। যা আবার ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে হয় না।

আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে, যদি মিউটেশনের কারণে এইচআইভি ভাইরাসের রূপ বদল হয়, সেক্ষেত্রে এই অ্যান্টিবডিগুলি আর কাজ করবে কি না। তবে গবেষকদের ধারণা, মানুষের শরীরে প্রবেশ করালে, এই প্রযুক্তির সাহায্যে মিউটেশন হওয়া এইচআইভি ভাইরাসকেও প্রতিরোধ করা যাবে।

 

More Articles

;