মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?
natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।
সম্প্রতি, পৃথিবী থেকে প্রায় ৮.২ কিলোপারসেক বা ২৬,৭৩২ আলোকবর্ষ দূরে, আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে একটি মনোস্যাকারাইডের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যার নাম ‘এরিথ্রুলোজ’। কিটোজ পরিবারের অন্তর্গত এই জাতীয় সরল শর্করা, সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে রাস্পবেরির মতো ফলগুলিতে পাওয়া যায়। সোজা কথায়, আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে, এক প্রকার প্রাকৃতিক চিনির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যার চারপাশে ঘিরে রয়েছে গ্যাস এবং ধূলিকণার এক বিশাল আণবিক মেঘের আস্তরণ। গত ১৩ জুলাই, নেচার অ্যাস্ট্রোনমি-তে প্রকাশিত হয়েছে এই আবিষ্কারের কথা। এখন প্রশ্ন হলো, ছায়াপথের কেন্দ্রে চিনি আসল কোথা থেকে?
সারাদিন ডায়েট নিয়ে চিন্তিত তরুণ সমাজ চিনির নাম শুনে যতই মুখ বাঁকাক না কেন, এটি মানবদেহের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় এক শর্করা; শরীরের শক্তি-সঞ্চয়কারি অণু হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সেই সঙ্গে, ডিএনএ এবং আরএনএ-র মতো জৈবিক বিল্ডিং ব্লকের অপরিহার্য মূল উপাদান এই চিনি। তবে গঠনগত দিক দিয়ে এগুলি প্রচণ্ড ভঙ্গুর, ফলে পরীক্ষাগারে এটিকে তৈরি করা কঠিন। নেচারে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক এবং স্পেনের স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যারোস্পেস টেকনোলজির সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোবায়োলজির জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ইজাস্কুন জিমেনেজ সেরা এবং তাঁর দল, G + 0.693-0.027 নামক আণবিক মেঘে এই এরিথ্রুলোজের সন্ধান পেয়েছেন। সেরা বলেন এই জাতীয় আণবিক মেঘগুলি আদতে বিরাট এক নাক্ষত্রিক নার্সারি, যার মধ্যে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মৌলের সংযুক্তিতে নিত্য নতুন রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Largest Diamond in Universe: মহাকাশে সত্যিই রয়েছে চাঁদের চেয়েও বড় একটি হিরে? ‘লুসি’ নামে পরিচিত এই শ্বেত বামন নক্ষত্র কী ভাবে পরিণত হয়েছে বিশাল হীরকখণ্ডে? বিটলসের একটি গানের সঙ্গে এর নামের সম্পর্কই বা কী? ভবিষ্যতে আমাদের সূর্যও কি এমন হিরের তারায় রূপান্তরিত হতে পারে?
মহাশূন্যে শনাক্ত হওয়া প্রথম এরিথ্রুলোজ
এই আবিষ্কারের রাসায়নিক তাৎপর্যই আলাদা: ইতোপূর্বে, গ্লাইকোলালডিহাইড বেশ কয়েকটি আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিবেশে পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু এরা প্রকৃত অর্থে মনোস্যাকারাইড নয়; অর্থাৎ এই গ্লাইকোলালডিহাইড অণুতে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা ৩-এর চেয়ে কম। প্রকৃত মনোস্যাকারাইড হতে গেলে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা কমপক্ষে ৩ হতে হয়, যেমন গ্লিসারালডিহাইড (𝐶3H6O3); সেক্ষেত্রে গ্লাইকোলালডিহাইডে মাত্র ২টি কার্বন পরমাণু রয়েছে। তাই গঠনগত দিক দিয়ে এটি শর্করা গোত্রের(সাধারণ সংকেত (Cn(H2O)n) মধ্যে পড়লেও, প্রকৃত মনোস্যাকারাইড নয়। কিন্তু, চার কার্বন পরমাণু বিশিষ্ট, এরিথ্রুলোজ (C4H8O4) অন্যতম সরল মনোস্যাকারাইড; আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস ও ধূলিকণার মধ্যে পাওয়া ‘সহজতম প্রাকৃতিক চিনি (এখনও পর্যন্ত)।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Superkilonova: এই বারের পর্যবেক্ষণটা একটু আলাদা; বিজ্ঞানীরা এবার জোড়া বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁদের ধারণা এটিই প্রথম সুপারকিলোনোভা।
কীভাবে এই চিনির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা?
গবেষকরা গুয়াদালাজারায় ৪০ মিটার দীর্ঘ ইয়েবেস রেডিও টেলিস্কোপ এবং গ্রানাডার পিকো ভেলেটায় আইআরএএম ৩০ মিটার দীর্ঘ টেলিস্কোপের সাহায্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল বর্ণালী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখেন, মহাকাশে ঘূর্ণায়মান অণুগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট যুক্ত রেডিও তরঙ্গ নির্গত করে, যেগুলি পরীক্ষাগারে এরিথ্রুলোজের বিশ্লেষণে পাওয়া বর্ণালীর সঙ্গে মিলে যায়।
অ্যাস্ট্রোকেমিক্যাল বিশ্লেষণে দেখা যায় G+0.693-0.027 আণবিক মেঘে, এরিথ্রুলোজের প্রাচুর্য, গ্লিসারালডিহাইড এবং ডাইহাইড্রোক্সিএসিটোনের তুলনায় কমপক্ষে আটগুণ! এরিথ্রুলোজের প্রাচুর্যের উপর ভিত্তি করে গবেষকরা অনুমান করছেন যে প্রায় চার বিলিয়ন বছর আগে এই চিনির কিয়দংশ পৃথিবী পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে। বিভিন্ন কোয়ান্টাম-রাসায়নিক গণনা এবং কম্পিউটেশনাল সিমুলেশনগুলি ইঙ্গিত দেয়, মাইক্রোস্কোপিক আন্তঃনাক্ষত্রিক ধুলো কণাগুলির উপরে থাকা বরফের পৃষ্ঠে এরিথ্রুলোজ গঠনের জন্য দ্বি-কার্বন যৌগগুলির পারস্পরিক রাসায়নিক সংযুক্তি দায়ী। একদিকে মহাজাগতিক বিকিরণগুলি এই বরফের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, অন্যদিকে মহাজাগতিক মেঘের মধ্য দিয়ে ভ্রমণকারী শকওয়েভ গুলি পরবর্তীতে নবগঠিত অনুগুলিকে মুক্ত করে, যেগুলি ধরা পড়ে রেডিও টেলিস্কোপে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, আগেই পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা বিভিন্ন উল্কা এবং গ্রহাণু বেনুর নমুনা বিশ্লেষণের সময় রাইবোজ, গ্লুকোজ এবং অন্যান্য শর্করার সন্ধান পেয়েছেন। কিন্তু এগুলি তো মহাবিশ্বের প্রথম শর্করা নয়, তাহলে এদের উৎস কোথায়? জীবনের উৎপত্তি সংক্রান্ত গবেষণায় এই প্রশ্নের গুরুত্ব অনেক। বর্তমানে, আন্তনাক্ষত্রিক জগতে সরাসরি এরিথ্রুলোজের শনাক্তকরণ, এটা নিশ্চিত করে যে নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরি হওয়ার অনেক আগেই মহাকাশে জটিল জৈব যৌগ তৈরি হতে পারে; ফলে তারা বা তাদের রাসায়নিক উত্তরসূরিরা গ্রহাণু, ধূমকেতু এবং গ্রহ-উপগ্রহে বিরাজ করতে পারে। এখন মহাকাশে চিনি তো মিলল, তাহলে কি পৃথিবীর বাইরেও প্রাণের স্পন্দন রয়েছে? তা নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি, তবে সেরাদের গবেষণা এই কৌতূহলে আরও ইন্ধন জোগাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।






