পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে বাংলাদেশে জোর চর্চা, কেন আলোচনা ভারতেও?
Padma Barrage: বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদীর উপর বিশাল ব্যারেজ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারের দাবি, এতে জলসংকট কমবে ও শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলি পুনরুজ্জীবিত হবে। তবে পরিবেশবিদদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, এই প্রকল্প নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও ভারত-বাংলাদেশ জলকূটনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
আবারও আলোচনার কেন্দ্রে পদ্মা নদী। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় পদ্মার উপর একটি বিশাল ব্যারেজ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারের দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলসংকট অনেকটাই কমবে, শুকিয়ে যাওয়া বহু নদী নতুন প্রাণ ফিরে পাবে এবং কৃষিক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় একটি প্রকল্প আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত? আর এর প্রভাব ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপর কতটা পড়তে পারে?
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পকে বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘমেয়াদি জলনিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারেজে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার সুইজ এবং দু'টি ফিশ পাস। শুধু জলধারণই নয়, এর সঙ্গে তিনটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির কথাও ভাবা হচ্ছে। জলাধারে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার জল ধরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের যুক্তি হলো, প্রখর গ্রীষ্মে পদ্মায় জলের প্রবাহ এতটাই কমে যাচ্ছে যে দেশের বড় একটি অংশে কৃষি ও পানীয় জলের সমস্যা ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু প্রবীণ বাসিন্দারা মনে করেন, একসময় গড়াই নদীতে সারা বছর নৌকা চলত। কিন্তু শুষ্ক সময়ে নদীর অনেক অংশ এখন প্রায় শুকিয়ে যায়। স্থানীয়দের বক্তব্য, নদীর জল কমে যাওয়ায় মাছ কমেছে, চাষের খরচ বেড়েছে এবং বহু মানুষ জীবিকা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।
সরকার বলছে, পদ্মা ব্যারেজ তৈরি হলে প্রায় ২৪টি জেলার জলসংকট অনেকটাই কমবে এবং প্রায় ২৯ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে এই জলসংকটের প্রশ্ন নতুন নয়। বহুদিন ধরেই সেখানে অভিযোগ উঠেছে, ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মায় পর্যাপ্ত জল পৌঁছায় না। গঙ্গা নদী ভারতের মধ্যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নাম নেয়। ১৯৭৫ সালে ভারত সরকার ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকেই বাংলাদেশে এই ইস্যু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ganga River Bank Erosion: দেড় লাখ পরিবারের মধ্যে মাত্র দশ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন দিয়েছে সরকার। সেটাও আবার গনি খান চৌধুরীর সময়ে— ১৯৭৬-৮০ সময়কালে।
বাংলাদেশের বহু মানুষের বিশ্বাস, ফারাক্কা বাঁধের কারণেই পদ্মার জল কমে যাচ্ছে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। এই অভিযোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব এতটাই বেশি যে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ রাজশাহী অভিমুখে ‘লং মার্চ’-এ অংশ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এখনও ফারাক্কা-বিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সেই সময় বহু মানুষ অভিযোগ করেছিলেন, পদ্মায় জল কমে যাওয়ায় কৃষিকাজ ও নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই আন্দোলন আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।
তবে ভারতের অবস্থান কিছুটা আলাদা। ভারতের জল বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ফারাক্কা বাঁধ মূলত জলকে সম্পূর্ণ আটকে রাখে না, নিয়ন্ত্রণ ও ডাইভার্ট করে। ফারাক্কায় ১১২টি লক গেট রয়েছে এবং একটি ফিডার ক্যানালের মাধ্যমে হুগলি নদীর দিকে জল পাঠানো হয়, যাতে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় থাকে। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী এটি পুরোপুরি 'জল আটকে রাখা' প্রকল্প নয়।
১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা জলবন্টন চুক্তি হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত প্রখর গ্রীষ্মে দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট নিয়মে জল ভাগাভাগি করা হয়। আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার দিক থেকে এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেও দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের একাংশের মতে, বাস্তবে সেই চুক্তি তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
১৯৯৬ সালে গঙ্গা জলবন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বাংলাদেশে অনেকেই আশা করেছিলেন, পদ্মায় আবার আগের মতো জলপ্রবাহ ফিরবে। সেই সময় সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক মহলে এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলা হয়েছিল। যদিও পরে বাংলাদেশের একাংশের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয় যে বাস্তবে প্রত্যাশামতো পরিবর্তন হয়নি।
এই পরিস্থিতিতেই পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জলবন্টন এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিও তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে পদ্মা ব্যারেজের প্রসঙ্গ তুলেছিল। শুধু পদ্মা নয়, ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ৫৪টি অভিন্ন নদীর জলের 'ন্যায্য হিস্যা' পাওয়ার দাবিও জোরালোভাবে উঠছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pollution In Gangotri: গঙ্গার উৎসমুখ, যা এতদিন পৃথিবীর পবিত্রতম স্থান হিসেবে ধার্য করা হত, সেই জায়গাও মানববর্জ্যে কলুষিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই ট্রাইব্যুনালের তরফে রাজ্যকে এ সংক্রান্ত পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জলবন্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। ফলে আগামী কয়েক মাসে জলকূটনীতি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনাই নেই, রয়েছে পরিবেশ ও নির্মাণ সংক্রান্ত উদ্বেগও। বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, পদ্মার মতো একটি চঞ্চল ও গতিশীল নদীকে কংক্রিটের কাঠামোর মাধ্যমে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে। পদ্মা নদীর স্বভাবই হলো বারবার গতিপথ পরিবর্তন করা এবং বিপুল পরিমাণ পলি বহন করা। ফলে বড় ব্যারেজ তৈরি হলে নদীর উজানে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে, এমনকি নদীভাঙন আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পদ্মা ব্যারেজ ভবিষ্যতে নতুন ধরনের পরিবেশগত সংকটও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মাছের প্রাকৃতিক চলাচল, নদীর জীববৈচিত্র্য এবং চরাঞ্চলের পরিবেশের উপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
অনেকে আবার বলছেন, বাংলাদেশের সামনে বিকল্পও খুব বেশি নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রবল দাবদাহের সময় কমে যাওয়া নদীর প্রবাহ এবং ক্রমবর্ধমান কৃষি ও পানীয় জলের চাহিদা মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। ফলে সরকার বড় জলাধারভিত্তিক প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছে। পদ্মা ব্যারেজ সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাজবাড়ী, ফরিদপুর বা কুষ্টিয়ার বহু পরিবার বছরের পর বছর নদীভাঙনের অভিজ্ঞতার কথা বলে। পদ্মার গতিপথ বদলে যাওয়ায় অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। তাই পদ্মা ব্যারেজের মতো বড় প্রকল্প নিয়ে এখন একদিকে যেমন আশার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে নতুন ভাঙনের আশঙ্কাও রয়েছে।
ভারতীয় কূটনৈতিক মহলেও এই প্রকল্প নিয়ে নজর রাখা হচ্ছে। কারণ, পদ্মা বা গঙ্গা নদী দুই দেশের সম্পর্কের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর এবার যদি পদ্মা নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়, তাহলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চাপ বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নানা কারণে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সীমান্ত রাজনীতি, অভিবাসন, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মতো নানা বিষয় দুই দেশের সম্পর্কে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই অবস্থায় পদ্মা ব্যারেজের মতো একটি বড় প্রকল্প শুধু পরিবেশ বা উন্নয়নের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের একটি অংশ মনে করছে, ভারত যদি ভবিষ্যতে আরও সহযোগিতামূলক অবস্থান নেয় এবং অভিন্ন নদীগুলির জল ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগ বাড়ায়, তাহলে উত্তেজনা অনেকটাই কমতে পারে। অন্যদিকে ভারতের বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, আন্তর্জাতিক নদী নিয়ে আবেগের বদলে তথ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা প্রয়োজন।
ফারাক্কা ইস্যুতে যেমন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হয়েছে, তেমনই ভারতে অনেকের ধারণা, সমস্যার জন্য একমাত্র ফারাক্কাকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, কম বৃষ্টিপাত, নদীর স্বাভাবিক পরিবর্তন এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনার সমস্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।







