কোন পথে দীর্ঘজীবন? ব্রায়ান জনসনের গবেষণা যা বলছে
বয়স ধরে রাখা বা চিরযৌবন পাওয়ার গবেষণায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন প্রযুক্তি ব্যবসায়ী (টেক এন্টারপ্রেনার) ব্রায়ান জনসন। তবে বহু বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার পর, নিজের এই দীর্ঘ পথচলা থেকে তিনি বেশ অদ্ভুত এবং সহজ একটি শিক্ষা পেয়েছেন।
বয়স ধরে রাখা বা চিরযৌবন পাওয়ার গবেষণায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন প্রযুক্তি ব্যবসায়ী (টেক এন্টারপ্রেনার) ব্রায়ান জনসন। তবে বহু বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার পর, নিজের এই দীর্ঘ পথচলা থেকে তিনি বেশ অদ্ভুত এবং সহজ একটি শিক্ষা পেয়েছেন। ব্রায়ান জনসন জানিয়েছেন, সুস্থ ও দীর্ঘজীবী হওয়ার সবচেয়ে দরকারী নিয়মগুলি আসলে অত্যন্ত সাধারণ, যা সাধারণ মানুষের পক্ষেও মেনে চলা সম্ভব।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, জীবনের সেরা পরামর্শগুলি পাওয়ার জন্য আসলে কোনো টাকা লাগে না, সেগুলি একদম ফ্রি। দীর্ঘ জীবন পাওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে তিনি যা শিখেছেন, এটিই তার মূল কথা। তিনি রসিকতা করে এই কথাগুলি "তোমাদের অমর কাকু ও কাকিমা"-র পক্ষ থেকে "আমাদের অমর ভাইপো ও ভাইঝি"-দের উদ্দেশ্যে বলেছেন। সুস্থ থাকার জন্য তিনি ৪১টি নিয়মের একটি তালিকা শেয়ার করেছেন, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিতে পারে।
সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ ঘুম
ব্রায়ান জনসনের এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত এবং ভালো ঘুমের উপর। তাঁর মতে, ঘুম হলো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ। ঘুম ভালো করার জন্য তিনি বেশ কিছু সহজ পরামর্শ দিয়েছেন:
আট ঘণ্টার ঘুম: প্রতিদিন অন্তত আট ঘণ্টা বিছানায় কাটানো উচিত।
নির্দিষ্ট সময়: মাঝরাতের আগেই প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া দরকার।
খাবারের নিয়ম: ঘুমানোর ঠিক আগে কোনো খাবার খাওয়া চলবে না। রাতের খাবারটা শান্ত মাথায়, কোনো তাড়া না হুড়ো না করে খাওয়া উচিত।
স্ক্রিন থেকে দূরে: ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে দূরে থাকতে হবে।
ঘরের পরিবেশ: সূর্যাস্তের পর ঘরের বেশি কড়া বা উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলতে হবে। ঘুমানোর ঘরটি যাতে একটু ঠান্ডা থাকে, সেই ব্যবস্থা করা ভালো। এছাড়া ঘুমাতে যাওয়ার আগে মন শান্ত করার জন্য হালকা কোনো নিয়ম বা অভ্যাস মেনে চলা উচিত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, শরীর ও মনের যাবতীয় কলকবজা ঠিক রাখতে দৈনিক ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা গভীর ঘুম অপরিহার্য। ঘুম কেবল শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া নয়, এটি মস্তিষ্ক ঠিক রাখা এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষার এক জটিল প্রক্রিয়া।
পুষ্টিকর খাবার এবং ডায়েট
খাবারের অভ্যাস কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়েও জনসন বেশ কিছু জরুরি কথা বলেছেন। তাঁর মতে, দামি সাপ্লিমেন্ট বা জটিল ডায়েটের চেয়ে আসল ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া বেশি দরকার।
যা বর্জন করবেন: বাড়তি চিনি, তেলে ভাজা খাবার এবং সাধারণ দোকানে বা প্যাকেটে পাওয়া যায় এমন বাইরের খাবার পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হবে। মদ্যপান থেকে দূরে থাকতে হবে।
যা খাবেন: প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, ডাল ও বেরি জাতীয় আসল খাবারের ওপর জোর দিতে হবে।
জল ও কফি: সারাদিনে পরিমাণ মতো জল খেতে হবে। আর যাঁরা কফি খেতে ভালোবাসেন, তাঁরা দুপুরের ১২টার আগেই কফি খাওয়া শেষ করুন, যাতে রাতে ঘুমের কোনো ক্ষতি না হয়।
শরীর সচল রাখা ও দৈনন্দিন অভ্যাস
শরীরকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের কিছু ছোট ছোট অভ্যাসের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এর জন্য জিম বা ভারী কসরত ছাড়াও সাধারণ কিছু কাজ করা যায়:
হাঁটাহাঁটি ও ব্যায়াম: ভারী খাবার খাওয়ার পর কিছুক্ষণ হাঁটা উচিত। প্রতিদিন নিয়ম করে এমন কিছু শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা দরকার যা হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়।
ভারী জিনিস তোলা ও স্ট্রেচিং: মাঝেমধ্যে হালকা থেকে ভারী জিনিস তোলা এবং প্রতিদিন শরীর স্ট্রেচ করা বা হাত-পা ছড়ানোর অভ্যাস করা ভালো।
বসার ধরন: একটানা অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। সেতার সঙ্গে বসার বা দাঁড়ানোর সময় পিঠ সোজা রাখার অভ্যাস (পোশ্চার) বজায় রাখা দরকার।
প্রকৃতির ছোঁয়া: সকালের দিকে গায়ে রোদ লাগানো খুব উপকারী। তবে দুপুরের কড়া রোদ থেকে নিজের ত্বককে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া কানের বা শোনার ক্ষমতার যত্ন নেওয়াও জরুরি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
30 days no sugar: ৩০ দিন চিনি পুরোপুরি বাদ দিলে শরীর ও মনে কী কী পরিবর্তন ঘটে? প্রথম সপ্তাহের উইথড্রয়াল ফেজে মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও ব্রেন ফগ কি স্বাভাবিক? দ্বিতীয় সপ্তাহে কি সত্যিই এনার্জি ও মনোযোগ বাড়ে? তৃতীয় সপ্তাহে ত্বক ও ওজনেরও পরিবর্তন হয়?
জীবনযাত্রা ও ঘরের পরিবেশ
আমরা কেমন পরিবেশে থাকছি এবং কীভাবে দিন কাটাচ্ছি, তা আমাদের স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। জনসন এই বিষয়েও কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলার কথা বলেছেন:
পরিচ্ছন্নতা ও বাতাস: ঘরের বাইরে পরা জুতো দরজাতেই খুলে রাখা উচিত। ঘরের ভিতরে যাতে শুদ্ধ বাতাস চলাচল করতে পারে, সেই ব্যবস্থা রাখা দরকার।
প্লাস্টিক বর্জন: দৈনন্দিন জীবনে যতটা সম্ভব প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া ভালো।
ডিজিটাল ডিটক্স: সারাক্ষণ ফোনের টুংটাং শব্দ থেকে বাঁচতে নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখা উচিত। সোশ্যাল মিডিয়া বা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের ব্যবহার কমানো দরকার। গাড়ি চালানোর সময় ফোনে মেসেজ করা বা কথা বলা একেবারেই বন্ধ করতে হবে।
ধূমপান ও সামাজিকতা: ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে। আর একাকিত্ব কাটাতে সপ্তাহে অন্তত একজন বন্ধুর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে আড্ডা দেওয়া উচিত।
মানসিক চাপ কমানো
আজকের দিনে সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো মানসিক চাপ বা টেনশন কমানো। ব্রায়ান জনসন বলেন, আমাদের শরীর একটা ঘড়ির মতো চলে। একে যদি একটা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে রাখা যায়, তবে শরীর খুব ভালো সাড়া দেয়।
নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ছোট ছোট ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীর ও মনকে শান্ত রাখতে শিখতে হবে। নিয়মিত দাঁতের ডাক্তারের কাছে গিয়ে মুখের যত্ন নেওয়াও জরুরি।
যাঁদের রাতে সহজে ঘুম আসতে চায় না, তাঁরা ঘুমানোর আগে ফোন না ঘেঁটে কোনো গল্পের বা কাগজের বই পড়তে পারেন।
এই সব অভ্যাস হুট করে একদিনে বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তাই জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পদক্ষেপে আস্তে আস্তে বদল আনা উচিত।
সবশেষে ব্রায়ান জনসন একটি দারুণ কথা বলেছেন। তাঁর মতে, দুনিয়ার বেশিরভাগ দামি বা জটিল জিনিস আসলে তেমন কোনো কাজে আসে না। তাই জীবনকে জটিল না করে সাধারণ রাখাই ভালো। তবে বাড়তি সচেতনতার জন্য নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা (ব্লাড টেস্ট) করিয়ে নিলে শরীরের ভিতরের অবস্থাটা সহজে বোঝা যায়।
কোটি কোটি টাকা খরচ করার পর এই ধনকুবেরের একটাই উপলব্ধি— কোনো দামি ওষুধ নয়, বরং এই অতি সাধারণ নিয়মগুলি দিয়েই জীবনের সুস্থতার পথচলা শুরু করা উচিত। এই সহজ অভ্যাসগুলিই মানুষের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।






