আরজি করের সেই সেমিনার রুম সিল হবে আবার
ঘটনার দীর্ঘদিন পরেও সেই সেমিনার রুমটিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে নানা প্রশ্ন, রহস্য আর আইনি লড়াই। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট এই সেমিনার রুমটিকে আবার নতুন করে ও নিশ্ছিদ্রভাবে সিল করার নির্দেশ দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৯ অগাস্ট। কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের বুকে ঘটে গিয়েছিল এমন এক নৃশংস ঘটনা, যা শুধু তিলোত্তমা বা বাংলা নয়, নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশের বিবেককে। হাসপাতালের চেস্ট ডিপার্টমেন্টের (পালমোনারি মেডিসিন বিভাগ) তৃতীয় তলার একটি সাধারণ সেমিনার রুম রাতারাতি হয়ে উঠেছিল এক ক্রাইম সিন। আজ, ঘটনার দীর্ঘদিন পরেও সেই সেমিনার রুমটিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে নানা প্রশ্ন, রহস্য আর আইনি লড়াই। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট এই সেমিনার রুমটিকে আবার নতুন করে ও নিশ্ছিদ্রভাবে সিল করার নির্দেশ দিয়েছে।
১. কী হয়েছিল সেই অভিশপ্ত সেমিনার রুমে?
ঘটনার দিন অর্থাৎ ৯ অগাস্ট ভোরে আরজি কর হাসপাতালের চেস্ট ডিপার্টমেন্টের তৃতীয় তলার সেমিনার রুমে ৩১ বছরের এক পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি (PGT) মহিলা ডাক্তারকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়। দেশের বহু মানুষ এবং আন্দোলনকারীরা তাঁকে ভালোবেসে 'অভয়া' বা 'তিলোত্তমা' নামে ডাকেন।
ঘটনার দিন অভয়া টানা ৩৬ ঘণ্টার একটি দীর্ঘ ও অত্যন্ত ক্লান্তিকর ডিউটির পর রাতে সহকর্মীদের সঙ্গে একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার পর, একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ওই সেমিনার রুমে যান। রুমে একটি কাঠের স্টেজের উপর তোশক (ম্যাট্রেস) ও চাদর পাতা ছিল। সেখানেই তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ ও সিবিআই (CBI) তদন্ত অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ৪:০৩ মিনিটে সঞ্জয় রায় নামের এক সিভিক ভলান্টিয়ার মদ্যপ অবস্থায় ওই সেমিনার রুমে ঢোকে।
চিকিৎসকদের অনুমান এবং ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, রাত ৪:১৫ থেকে ৪:৪০ মিনিটের মধ্যে ঘরের ভিতরেই অভয়াকে চরম নির্যাতন, ধর্ষণ এবং শেষে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে খুন করা হয়। সঞ্জয় রায় প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট ঘরের ভিতরে ছিল এবং ভোর ৪:৩৭ নাগাদ হাসপাতাল চত্বর ছেড়ে চলে যায়।
সকাল ৯:৩০-১০:০০ টার দিকে চেস্ট ডিপার্টমেন্টের প্রথম বর্ষের এক ছাত্র সেমিনার রুমে গিয়ে অভয়ার অর্ধনগ্ন ও ক্ষতবিক্ষত দেহ প্রথম দেখেন। তাঁর চোখ, মুখ এবং যৌনাঙ্গে রক্তের দাগ ছিল, শরীরে ছিল একাধিক আঘাতের চিহ্ন।
২. ঘটনার পর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?
দেহ উদ্ধারের পর পুলিশ আসে। কিন্তু শুরুতেই গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। প্রথমে ঘটনাটিকে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ডায়েরি (GD) করা হয়। এরপর ময়নাতদন্তের পর, রাতে (১১:৪৫ নাগাদ) এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়। ততক্ষণে নির্যাতিতার দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকে সেমিনার রুমটি প্রথমবার সিল করে পুলিশ। ১০ অগাস্ট গ্রেফতার করা হয় মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে।
হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ ও সিবিআই তদন্ত
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
R G Kar Hospital Incident: বিচারপতি পারদিওয়ালা রাজ্যকে প্রশ্ন করেন, অস্বাভাবিক মৃত্যু কখন দায়ের করা হয়? রাজ্য জানায়, দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছিল।
কলকাতা পুলিশের তদন্তে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে গত ১৩ অগাস্ট ২০২৪-এ কলকাতা হাইকোর্ট এই মামলার দায়িত্ব তুলে দেয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)-এর হাতে।
সিবিআই দায়িত্ব নিয়েই আধুনিক '3D লেজার স্ক্যানিং' এবং ডিজিটাল ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে টানা ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সেই সেমিনার রুমের নিখুঁত ম্যাপিং করে।
ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং হাসপাতালের ডাক্তার, কর্মী ও নির্মাণকর্মীসহ প্রায় ৪০ জনেরও বেশি মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
আরজি করের তৎকালীন বিতর্কিত প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার ওসির বিরুদ্ধে এফআইআর দেরিতে করা এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টার অভিযোগে চার্জশিট দেওয়া হয়।
বিচার ও বর্তমান আইনি পরিস্থিতি
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শিয়ালদহ সেশন কোর্ট সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। তবে সিবিআই-এর মূল তদন্ত এখানেই শেষ হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মামলাটি আবার কলকাতা হাইকোর্টের নজরদারিতে আসে। ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ এই ঘটনার পিছনে থাকা "বৃহত্তর ষড়যন্ত্র" (Larger Conspiracy)-এর অংশটির তদন্ত মনিটর করছে।
৩. কোথায় অসঙ্গতি মনে হয়েছিল?
এই মামলার শুরু থেকেই সাধারণ মানুষ এবং জুনিয়ার ডাক্তারদের মনে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন ও অসঙ্গতি দানা বেঁধেছিল, যা সিবিআই-এর চার্জশিট এবং ফরেনসিক রিপোর্টের পর আরও জোরালো হয়:
লড়াই বা ধস্তাধস্তির চিহ্নের অভাব: সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি (CFSL)-এর রিপোর্টে একটি তথ্য সামনে আসে। সেমিনার রুমের তোশক বা তার আশেপাশে কোনো বড় ধরনের ধস্তাধস্তি বা লড়াইয়ের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি। একজন সুস্থ তরুণী চিকিৎসকের উপর যখন এমন নৃশংস আক্রমণ হলো, তখন সেখানে কোনো জিনিসপত্র ছড়ানো-ছিটানো বা ধস্তাধস্তির চিহ্ন কেন নেই? তবে কি অন্য কোথাও অপরাধ ঘটিয়ে দেহ পরে সেমিনার রুমে এনে রাখা হয়েছিল? এই প্রশ্নটির আজও কিনারা হয়নি।
ক্রাইম সিনের সুরক্ষা না করা: দেহ উদ্ধারের পর সকালের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে দেখা যায় সেমিনার রুমের ভিতরে পুলিশ, ডাক্তার, আইনজীবী এবং বহু বহিরাগত মানুষের ভিড়। একটি খুনের ঘটনার পর ক্রাইম সিন যেভাবে সুরক্ষিত রাখার কথা, তা করা হয়নি। এতে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অথচ, নির্যাতিতার পরিবারকে দীর্ঘক্ষণ ঘরের বাইরে বসিয়ে রাখা হয়েছিল।
তড়িঘড়ি ভাঙচুর ও সংস্কার কাজ: ঘটনার ঠিক পরপরই হাসপাতালের ওই সেমিনার রুমের সংলগ্ন দেওয়ালে এবং শৌচাগারে ভাঙাভাঙি ও সংস্কারের কাজ শুরু করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সাধারণ মানুষের অভিযোগ ছিল, প্রমাণ লোপাট করতেই এই তড়িঘড়ি সংস্কারের চেষ্টা।
দেরিতে এফআইআর: সকাল ১০টার মধ্যে দেহ উদ্ধার হলেও, রাত পৌনে বারোটা পর্যন্ত কেন এফআইআর করতে দেরি হলো, তা নিয়ে কোনো সদুত্তর পুলিশ দিতে পারেনি।
৪. হাইকোর্ট কেন আবার সিল করার নির্দেশ দিল?
২০২৬ সালের মে মাসের সাম্প্রতিক শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ আরজি করের সেই অভিশপ্ত সেমিনার রুমটি অবিলম্বে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পুনরায় সিল করার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ:
১. প্রমাণ সংরক্ষণ: যেহেতু 'বৃহত্তর ষড়যন্ত্র' এবং 'তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা'-র তদন্ত এখনও সিবিআই চালিয়ে যাচ্ছে, তাই মূল ঘটনাস্থলটিকে কোনোভাবেই খোলামেলা বা অরক্ষিত রাখা যাবে না।
২. নতুন করে ট্যাম্পারিংয়ের আশঙ্কা: আদালতের ভয়, রুমটি যদি সঠিকভাবে সিলড না থাকে, তবে বাকি থাকা অবশিষ্ট প্রমাণও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৩. হাইকোর্টের সিবিআই-কে নির্দেশ: হাইকোর্ট সিবিআই-কে স্পষ্ট জানিয়েছে, শুধু সেমিনার রুমই নয়, তদন্তের স্বার্থে যদি আশেপাশের অন্য কোনো অংশ বা ঘরও সিল করার প্রয়োজন মনে হয়, তবে সিবিআই তা তৎক্ষণাৎ করতে পারবে।
আরজি করের সেই সেমিনার রুমটি আজ আর পাঁচটা হাসপাতালের সাধারণ ঘরের মতো নয়। এটি এখন বিচার ব্যবস্থার লড়াই, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সত্যকে আড়াল করার চেষ্টার এক জ্বলন্ত প্রতীক। নিম্ন আদালতে একজনের শাস্তি হলেও, পর্দার আড়ালে থাকা বাকি অপরাধীদের মুখোশ টানতে এবং মূল ক্রাইম সিনের তথ্য প্রমাণ রক্ষা করতে হাইকোর্টের এই আবার সিল করার নির্দেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তদন্ত এখনও চলছে, আর পুরো দেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে চূড়ান্ত সত্য এবং সম্পূর্ণ সুবিচারের জন্য।








