দেহ উদ্ধারের ১২ ঘণ্টা পরেও কেন সিল হয়নি ক্রাইম সিন? রাজ্যকে প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের
R G Kar Hospital Incident: বিচারপতি পারদিওয়ালা রাজ্যকে প্রশ্ন করেন, অস্বাভাবিক মৃত্যু কখন দায়ের করা হয়? রাজ্য জানায়, দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছিল।

আরজি কর মামলা নিয়ে জল গিয়েছে অনেক দূর। আরজি কর কাণ্ড নিয়ে একাধিক জনস্বার্থ মামলার শুনানি হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে ইতিমধ্যেই। এরই মধ্যে ওই ঘটনা নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করেছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই মামলার দ্বিতীয় শুনানি আজ, বৃহস্পতিবার।
মঙ্গলবার প্রথম শুনানিতে আরজিকরের চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় সিবিআইয়ের কাছে তদন্তেরর অগ্রগতি সংক্রান্ত স্ট্যাটাস জানতে চেয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই নির্দেশ মতোই এদিন সুপ্রিম কোর্টে স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার। শুধু সিবিআই নয়, রাজ্যের থেকেও তদন্তরিপোর্ট চেয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। মহিলাদের রাতদখলের রাতে অর্থাৎ গত ১৪ অগস্ট, হঠাৎ করেই সুপ্রিম কোর্টের ভিতরে ঢুকে আসে একদল দুষ্কৃতি। আরজি কর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর চালানো হয়, ভেঙে দেওয়া হয় ওষুধপত্র, ফ্রিজ, পুলিশের জিপ, সিসিটিভির ঘর-সহ বিভিন্ন জায়গা। সেই ঘটনা নিয়ে রাজ্যপুলিশ এখনও পর্যন্ত কী পদক্ষেপ করেছে, তা নিয়ে রাজ্যকেও রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।
গত রবিবারই আরজি কর মামলা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় ছাড়াও ওই বেঞ্চে থাকছেন বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি মনোজ মিশ্র। এদিন সুপ্রিম কোর্টে রাজ্য পুলিশ ও সিবিআইয়ের পাশাপাশি আন্দোলনরত চিকিৎসকদের একটি পক্ষও হাজির ছিল। তাদের তরফে শীর্ষ আদালতে জানানো হয়, আরজিকর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাঁদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের পরিবেশ এখনও ভয়ের বলেও জানান তাঁরা। একদিন আগেই সিজিও কমপ্লেক্স থেকে মিছিল করে স্বাস্থ্যভবনে যায় চিকিৎসকদের মিছিল। স্বাস্থ্যভবনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের দাবিদাওয়ার কথাও জানান তাঁরা। এমনকী কেন নয়া অধ্যক্ষ সুহৃতা পাল কলেজে আসছেন না, স্বাস্থ্যভবন থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন, সে নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তবে যতদূর জানা গিয়েছে, তেমন কোনও আশ্বাস মেলেনি স্বাস্থ্যভবনের তরফে। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন তাঁরা সেই অনুষ্ঠান থেকেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Doctor Rape-Murder Case: স্লোগান, গানের পাশাপাশি এই আন্দোলনের চরিত্র হয়ে উঠেছে রং-তুলিও। আর তার প্রমাণ মিলবে কলেজ স্ট্রিটে গেলেই। সেখানে রাস্তা জুড়ে প্রতিবাদ এঁকে দিয়েছেন শিল্পীরা।
এদিন চিকিৎসকদের অভিযোগ শোনার পর প্রধান বিচারপতি বলেন, “কে এমন করছেন? তাঁর নাম আমাদের দিন।” এর পরেই চিকিৎসকদের আইনজীবী আদালতে পাল্টা অভিযোগ জানিয়ে বলেন, “রাজ্য এমন একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে, যাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এদিকে, এদিন আদালতের নির্দেশ মেনেই সুপ্রিম কোর্টে তাদের তদন্তের স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিয়েছে সিবিআই। প্রধান বিচারপতি বলেন, “প্রথমে আমরা তদন্তের রিপোর্ট দেখব। তার পরে রাজ্যের গঠিত সিট নিয়ে আদালত বিবেচনা করবে।” পাশাপাশি আরজি করে ভাঙচুরের ঘটনা সংক্রান্ত রিপোর্ট শীর্ষ আদালতে জমা দিয়েছে রাজ্যও। সেই রিপোর্ট পড়েন সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতি। শুরু হয় সেগুলি নিয়ে নিজেদের মধ্য়ে আলোচনাও।
কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলার শুনানির সময়েও বারবার আদালতের তরফে আন্দোলনরত চিকিৎসকদের কাজে ফেরার কথা বলা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের তরফেও প্রথম শুনানিতে একই অনুরোধ করা হয় চিকিৎসকদের। গত ৯ অগস্ট আরজি কর হাসপাতালের বক্ষ বিভাগের সেমিনার রুম থেকে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিলেন আরজি করের চিকিৎসকেরা। দেখতে দেখতে গোটা রাজ্যের সমস্ত হাসপাতাল জুড়ে আন্দোলনে নামে জুনিয়র ডাক্তারেরা। যার প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যপরিষেবায়। বৃহস্পতিবার ফের চিকিৎসা পরিষেবা স্বাভাবিক করতে চিকিৎসকদের কাজে ফেরার অনুরোধ করলেন প্রধান বিচারপতি।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
R G Kar Protest: । এদিন বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতেই দেখা গিয়েছে 'প্রিন্সিপ্যাল হাওয়া' লেখা পোস্টার। কেন নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ আরজিকরে নেই, প্রশ্ন আন্দোলনকারীদের।
এদিকে ওই রিপোর্ট পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরজি কর কাণ্ডের অভিযুক্তের মেডিক্যাল রিপোর্ট নিয়ে সিবিআইয়ের কাছে জানতে চায় প্রধান বিচারপতি। ঘটনাটি ঘটার দিন দুয়েক পরেই সঞ্জয় রায় নামে এক সিভিক ভলিন্টিয়ারকে অভিযুক্ত সন্দেহে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিন সুপ্রিম কোর্টে সিবিআই জানায়, রাজ্য অভিযুক্তের মেডিক্যাল রিপোর্ট কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে দেয়নি। তার উত্তরে রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিব্বল জানান, কেস ডায়েরির মধ্যে সব রয়েছে। রয়েছে ওই রিপোর্টও।
এর পরেই আদালতের মধ্যে শুরু হয়ে যায় কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত। শীর্ষ আদালতে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তাঁর সওয়ালে বলেন, “ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় সিবিআই প্রবেশ করেছে। সব কিছু বদলে গিয়েছে।” পাল্টা রাজ্যের তরফে বলা হয়, “কিছু বদলে যায়নি। সব কিছুর ভিডিয়োগ্রাফি রয়েছে।” সলিসিটর জেনারেল বলেন, “সবচেয়ে অবাক করেছে, চিকিৎসকের দেহ সৎকারের পরে রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে এফআইআর করা হয়েছে।” রাজ্য আদালতে জানায়, কী কী হয়েছে, প্রতি মিনিটের টাইমলাইন তাদের কাছে রয়েছে।

ইতিমধ্য়েই প্রকাশ্যে এসেছে নির্যাতিতার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। এদিন শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট সেই রিপোর্ট দেখতে চায়। তার আগেই সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, “প্রথমে পরিবারকে বলা হয় আত্মহত্যা। পরে বলা হয় মৃত্যু। তখন সন্দেহ তৈরি হতে তার পর থেকে ভিডিয়োগ্রাফি করা হয়।” তবে তার পরেও প্রশ্ন উঠেছে রাজ্যের গাফিলতি নিয়ে। প্রধান বিচারপতি এদিন শুনানিতে বলেন, " “একটা জিনিস নিয়ে খটকা লাগছে। সকাল ১০টা ১০ মিনিট নাগাদ টালা থানা অভিযোগ দায়ের করল। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ ঘটনাস্থল সিল করল পুলিশ? এত ক্ষণ সেখানে কী হয়েছিল?” তার উত্তরে অবশ্য রাজ্যের তরফে বলা হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। সব কিছুর ভিডিয়োগ্রাফি রয়েছে। এদিকে এফআইআর দায়েরে গাফিলতি নিয়ে এদিন সলিসিটর জেনারেল পুরো দায়টাই ঠেলেন মৃতার পরিবারের উপরে। সলিসিটর জেনারেল জানান, “রাজ্য বলছে মৃতার বাবা এফআইআর দায়ের করার অনুমতি দেননি।”
এর পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পারদিওয়ালা জানতে চান, কখন ময়নাতদন্ত হল? যার উত্তর রাজ্য জানিয়েছে, সন্ধ্যা ৬টা ১০ থেকে ৭টা ১০-এর মধ্যে।রাজ্যের তরফে এদিন আদালতে জানানো হয়, আর্জি কর-কাণ্ডে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে। কিন্তু কেস ডায়েরি উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, “এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, রাত ১১টা ৩০ মিনিটে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছিল।” এরপরেই বিচারপতি পারদিওয়ালা রাজ্যকে প্রশ্ন করেন, অস্বাভাবিক মৃত্যু কখন দায়ের করা হয়? রাজ্য জানায়, দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছিল। বিচারপতি পারদিওয়ালা বলেন, “এটা কি অস্বাভাবিক মৃত্যু? যদি হয়, তবে ময়নাতদন্তের কী প্রয়োজন ছিল? এখানে দেখতে পাচ্ছি রাত সাড়ে ১১টায় জেনারেল ডায়েরি হয়। তার ১৫ মিনিটের মাথায় এফআইআর হল? আদালতের কাছে সঠিক ভাবে বক্তব্য রাখুন।” বিচারপতি পারদিওয়ালা আরও বলেন, “অবাক হচ্ছি, ময়নাতদন্তের আগেই বলে দেওয়া হল অস্বাভাবিক মৃত্যু?” এই প্রসঙ্গেই পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্টের ভূমিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট? বিচারপতি পারদিওয়ালা বলেন, “পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট কে? তদন্তে তাঁর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এমন ভাবে তদন্ত হল?” কেন সেই অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্টের এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে চালাতে চেয়েছিলেন, তা নিয়েও ওঠে প্রশ্ন।
এদিন সুপ্রিম কোর্টের তরফে সাফ জানানো হয়েছে, পরের শুনানিতে এমন দায়িত্ববান অফিসার কে রাখতে হবে যিনি পুরো ঘটনাক্রম আদালতকে বুঝিয়ে বলতে পারবেন। বিরতির পরে দুটো নাগাদ শুনানি ফের চালু হবে বলে জানিয়েছে আদালত।






