কলম্বিয়া নির্বাচন: ট্রাম্প-সমর্থিত দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে বাম শিবিরের লড়াই?
Colombia election 2026: কলম্বিয়ার আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট দক্ষিণপন্থী প্রার্থীর উত্থানের বিরুদ্ধে বামপন্থী শিবির জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। বিদেশি প্রভাব, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং ক্ষমতার লড়াই মিলিয়ে এই ভোটযুদ্ধ লাতিন আমেরিকার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লাতিন আমেরিকার প্রগতিশীল চেতনার উপর সাম্রাজ্যবাদী ও দক্ষিণপন্থী আঘাতের এক নতুন পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কলম্বিয়ার আসন্ন ২১ জুনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। বর্তমান বামপন্থী ও গণমানুষের প্রতিনিধি রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো পেত্রো সাংবিধানিক নিয়মের কারণে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারায়, এই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে কলম্বিয়ার সার্বভৌমত্বকে আবারও ওয়াশিংটনের করদ রাজ্যে পরিণত করার এক মরিয়া চক্রান্ত শুরু হয়েছে। এই নির্বাচনটি কেবল কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে লাতিন আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল হাওয়াকে জোরপূর্বক রুখে দেওয়ার এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
প্রথম দফার নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে কলম্বিয়ার ধনিক ও শাসক শ্রেণির প্রতিনিধি, উগ্র দক্ষিণপন্থী আইনজীবী আবেল্যার্দো দে লা এস্প্রিয়েল্লা ৪৩.৭৪% ভোট পেয়ে সাময়িকভাবে শীর্ষস্থান দখল করেছেন। এর ঠিক পেছনেই ৪০.৯০% ভোট পেয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন গুস্তাভো পেত্রোর ঘনিষ্ঠ মিত্র তথা মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর, প্রগতিশীল বামপন্থী সিনেটর ইভান সেপেদা। নির্বাচনে দক্ষিণপন্থীদের এই কৃত্রিম সাফল্যের পরপরই কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প লা এস্প্রিয়েল্লাকে সম্পূর্ণ এবং নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়ে তাঁকে 'শক্তিশালী নেতা' হিসেবে বর্ণনা করেন এবং প্রগতিশীল ইভান সেপেদাকে 'উগ্র বামপন্থী মার্ক্সবাদী' বলে আক্রমণ করেন।
মার্কিন নাগরিকত্ব ধারণ করা ও ট্রাম্পের অন্ধ অনুসারী লা এস্প্রিয়েল্লা—যিনি নিজেকে 'দি টাইগার' বলে অহংকার করেন—অত্যন্ত দাসসুলভ ভঙ্গিতে এই বিদেশি হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে এক্স প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, তিনি দেশপ্রেমিক কৃতজ্ঞতা নিয়ে ট্রাম্পের এই অবিচল সমর্থন গ্রহণ করছেন। বিদেশি নির্বাচনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই নাক গলানো অবশ্য নতুন কিছু নয়, এর আগেও ট্রাম্প হন্ডুরাস ও আর্জেন্টিনায় জনগণের স্বার্থবিরোধী দক্ষিণপন্থী পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে একই ধরনের ভূমিকা নিয়েছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Cuba fuel crisis: কিউবাকে দখলে আনতে ট্রাম্প কী কৌশল নিচ্ছেন? একদিকে চাপ, অন্যদিকে আলোচনার ইঙ্গিত—এই দ্বিমুখী নীতি কতটা কার্যকর হতে পারে? এতে কি কিউবার শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে, নাকি পরিস্থিতি আরও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে?
সাম্রাজ্যবাদের এই নগ্ন থাবার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে কলম্বিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষার ডাক দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো পেত্রো এবং প্রগতিশীল প্রার্থী ইভান সেপেদা। সেপেদা ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে সরাসরি 'হস্তক্ষেপমূলক ও ঔপনিবেশিক মনোভাব' বলে নিন্দা জানিয়ে কলম্বিয়ার আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকারকে সম্মান জানানোর দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রধান সেনাপতি গুস্তাভো পেত্রো কলম্বিয়ার বীর জনগণকে কোনো বিদেশি শক্তির দাস বা উপনিবেশে পরিণত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তীব্র ভাষায় বলেছেন, যখন একটি দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে, তখন স্বাধীনতা আক্ষরিক অর্থেই মারা যায়। মূলত পেত্রো সরকারের আমলে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, গাজায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিরোধ এবং গরিব কৃষকদের ধ্বংস না করে মাদক চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে প্রকৃত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে ওয়াশিংটনের পুঁজিপতি শাসকরা বোগোতার উপর ক্ষিপ্ত ছিল, যা এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel Palestine conflict: ইজরায়েলের নেসেটে পাস হওয়া মৃত্যুদণ্ড বিল কেন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক দমননীতি? গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি কি ‘গণসংহার’ কৌশলের অংশ? আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা কি এই বিতর্কিত আইনের পথ আরও সহজ করে দিচ্ছে?
দক্ষিণপন্থীদের এই অগ্রযাত্রার পেছনে যে এক বিশাল জালিয়াতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কারচুপি লুকিয়ে রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণ জনসমক্ষে এনেছেন রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো পেত্রো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বুর্জোয়া পর্যবেক্ষকরা কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় জালিয়াতির কোনো প্রমাণ খুঁজে না পেলেও, পেত্রো দেখিয়েছেন কী ভাবে 'বাউতিস্তা ব্রাদার্স' নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ত্রুটিপূর্ণ সফটওয়্যারের মাধ্যমে জনগণের রায় চুরি করা হয়েছে। ২০১৮ সালেই দেশটির স্টেট কাউন্সিল এই সফটওয়্যারটিকে ভেতর এবং বাহির—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও হ্যাকযোগ্য বলে রায় দিয়েছিল, অথচ এবার নির্বাচন কমিশন এই সফটওয়্যারের মূল সোর্স কোড জনসমক্ষে প্রকাশ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।
পেত্রো প্রমাণ-সহ দেখিয়েছেন, আইনি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত ২৬ মে, ২০২৬ তারিখে এই সফটওয়্যারটি দু'বার গোপনে পরিবর্তন করা হয়। এই জালিয়াতির মাধ্যমে নির্বাচনের মাত্র পাঁচ দিন আগে অফিশিয়াল ভোটার তালিকা ৪,১৪,২১,৯৭৩ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ৪,২৩,০৭,৩৭৩ করা হয়, যার অর্থ প্রায় আট লক্ষ পঁচাশি হাজার ভুয়া ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই রাতারাতি ৬৯৬টি নতুন ভোটকেন্দ্র এবং ১,৪৯৩টি অতিরিক্ত টেবিল তৈরি করা হয়।
পেত্রো আরও উন্মোচন করেছেন, বাউতিস্তা ব্রাদার্সের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ৫,৩০০টি টেবিলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভোট পড়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ ৩০০টি ভোট পড়ার কথা সেখানে কিছু টেবিলে ৭০০টি পর্যন্ত ভোট গণনায় আনা হয়েছে। এই জালিয়াতির টেবিলগুলিতেই লুকিয়ে আছে সেই অতিরিক্ত ছয় লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার ভোট, যা দিয়ে কর্পোরেট দুনিয়ার প্রতিনিধি লা এস্প্রিয়েল্লাকে কৃত্রিমভাবে এগিয়ে রাখা হয়েছে এবং পেত্রো এই সমস্ত জালিয়াতির দলিল উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে প্রস্তুত।
এই জালিয়াতি ও চক্রান্তের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লা এস্প্রিয়েল্লা ভেনেজুয়েলার প্রগতিশীল মাদুরো সরকারের উদাহরণ টেনে সাধারণ মানুষের মনে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মিথ্যা ভয় ছড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়ে পেত্রোকে 'ভোট চোর' বলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি কলম্বিয়ার দরিদ্র কৃষকদের রক্ত ঘামে গড়া কোকা চাষ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে মার্কিন আধিপত্যের কাছে মাথা নত করার দাসসুলভ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফলে, আগামী ২১ জুনের এই ঐতিহাসিক রান-অফ নির্বাচনটি (রান-অফ নির্বাচন হলো এমন একটি দ্বিতীয় দফার ভোট ব্যবস্থা, যা সাধারণত তখনই আয়োজন করা হয় যখন প্রথম দফার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীই এককভাবে সরকার গঠন বা জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট সংখ্যক ভোট, সাধারণত মোট ভোটের ৫০% বা তার বেশি পেতে ব্যর্থ হন) কেবল একটি ব্যালটের লড়াই নয়, এটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদপুষ্ট কর্পোরেট শোষণের বিরুদ্ধে কলম্বিয়ার শোষিত ও মেহনতি মানুষের আত্মমর্যাদা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত শ্রেণি সংগ্রাম। একই সঙ্গে সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।









