ভরা ব্রিগেডে মরা সভা, কারণ নিস্প্রভ মোদি
নির্বাচনের মুখে কার্যত প্রথম নির্বাচনী জনসভায় কোন পথে মানুষের দিনানুদিনের সমস্যার সুরাহা, বোঝা গেল না মোদির ভাষণে।
বিবেচনাধীন ভোটারের সংখ্যা ৬০ লক্ষ, তাদের তথ্য নিষ্পত্তি না করেই ভোট হবে বাংলায়? এই প্রশ্নে বিজেপি যে ব্যাকফুটে সেটাই পরিস্কার হলো বাংলায় বিজেপির তথা নরেন্দ্র মোদীর প্রথম নির্বাচনী জনসভায়। মোদির মুখ থেকে ঘণ্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়ানো মানুষের জন্যে বেরোলো না একটিও আপ্তবাক্য। শোনা গেল না, গ্যাস দুর্গতি নিয়ে কোনো সুরাহার কথা। নন্দীগ্রাম দিবসের মতো ঐতিহাসিক দিনে জনসভা, মোদি কি এই দিনটির গুরুত্ব বিস্মৃত হলেন? এমনকী অনুপ্রবেশ জুজুও স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় বারবার ঝোলা থেকে বের করতে পারলেন না নরেন্দ্র মোদী। ভরা মাঠের মরা সভায় হাতে রইল কেন্দ্রীয় উন্নয়ন আর তৃণমূলের দুর্নীতির খতিয়ান।
এদিন মোদীর সভা উপলক্ষে প্রস্তুতিতে ফাঁক রাখেনি বিজেপি। মঞ্চ সাজানো হয়েছিল দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে। স্রেফ হিন্দু ভোট টানতে মন্দিরের থিমে এই মঞ্চ নির্মাণ, এভাবে ভাবলে ভুল হবে; কালীঘাট নয়, তারাপীঠ নয়, কেন একশো কুড়ি বাই সত্তর ফুটের মঞ্চ নির্মাণে দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মন্দিরকে বাছল বিজেপি? কারণ, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা রাণী রাসমণি 'শূদ্রকন্যা'। অর্থাৎ হিন্দুত্বত্বের নিম্নবর্গকে আত্মীকরণের নীতিকে মান্যতা দিতেই এই কৌশলী নির্মাণ। পাশাপাশি, জোর দেওয়া বাঙালিয়ানায়। টেরাকোটা, বাউল, বিষ্ণুপুরী থিমে সাজানো হয়েছিল ব্রিগেড মাঠ। মোদী যে সময় কলকাতায় আসছেন, সে বড় সুসময় নয়। কলকাতার তামাম রেস্তোরাঁ-চেইন গ্যাসের অভাবে যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্বয়ং রেস্তোরাঁ মালিকরাই। গ্যাসের জোগান থমকে থাকলে পয়লা বৈশাখে মিষ্টির জোগান দিতে হয়তো পারবে না মিষ্টির দোকানগুলিও। আর অন্যদিকে, নিষ্পত্তি হয়নি ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সমস্যার। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মুখে কার্যত প্রথম নির্বাচনী জনসভায় কোন পথে মানুষের দিনানুদিনের সমস্যার সুরাহা, বোঝা গেল না মোদীর ভাষণে। ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ২৯৪ আসনে আমিই প্রার্থী। নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বে ভরসা নেই, নেই কোনো প্রতিষ্পর্ধী মুখ, তাই বারবার তাঁর ভাষণে এল 'মোদির গ্যারান্টি' কথাটি। মোদি বোঝাতে চাইলেন, এই ভোট মোদি বনাম দিদি।
এদিন মোদীর বক্তব্যকে আসলে তিনভাগে ভাঙা যায়। প্রথম পর্বে মোদী তুলে ধরলেন সরকারি প্রকল্পগুলির কথা। জলজীবন মিশন থেকে আয়ুষ্মান ভারত, পিএম আবাস যোজনা থেকে চা শ্রমিক প্রকল্প, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূল জমানায় তামাম কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে বঞ্চিত বলে দাবি করলেন নরেন্দ্র মোদী। তাঁর কথায়,
কর্ম সংস্থানের জন্য কেন্দ্র বিশ্বকর্মা প্রকল্প শুরু করেছি। কেন্দ্র টাকা দেয়। তবুও তৃণমূল সরকার তা মানুষের কাছে পৌঁছতে দেয় না। বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দিতে আমরা প্রকল্প শুরু করেছি। এরা আটকে দিচ্ছে। এরা বাংলার শত্রু। মানুষের শত্রু। চা শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে বঞ্চিত করা হয়। পিএম আবাস যোজনার নাম পালটে দিয়েছে। লিস্ট বদল করে দিয়েছে। গরিবদের বাড়ি দেওয়া হয়নি। এই তৃণমূল সরকার তা হতে দেবে না। একই হাল জলজীবন মিশনের। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প এরা চালু করতে দেয় না। ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার খরচ পাওয়া যায় এই যোজনায়। কিন্তু বাংলার গরিব পরিবারগুলোকে বঞ্চিত করেছে এই সরকার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Bjp Brigade: রাজ্যের ২৯৪টি আসন দখলের লড়াইয়ে এখন থেকেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে রাজনৈতিক দলগুলি। এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী শক্তি ভারতীয় জনতা পার্টি।
বক্তব্যের দ্বিতীয় ধাপে এল তৃণমূল জমানায় চাকরি দুর্নীতি আর নারী সুরক্ষার প্রশ্ন। যদিও, আরজি কর কাণ্ডে কেন কোনো সর্বাত্মক আন্দোলন বিজেপি জিইয়ে রাখতে পারল না, সে প্রশ্নের সদুত্তর কার কাছে পাওয়া যাবে বোঝা গেল না।
বক্তব্যের তৃতীয় ধাপে মোদি আনলেন অনুপ্রবেশ তাস। তাঁর মতে, অবৈধ ভোটারকে মান্যতা দিতে চাইছে তৃণমূল। গণতন্ত্রের জন্যই এসআইআর প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনকেও ক্লিনচিট দিতে হলো মোদিকে।
গো ব্যাক জ্ঞানেশ কুমার
স্লোগান ওঠার পাঁচ দিনের মাথায় মোদির বিবৃতি কার্যত ড্যামেজ কন্ট্রোলের মতোই শোনাল।
এসআই এর কারণে বিপাকে পড়েছে নমঃশূদ্র সমাজ। রানাঘাট উত্তর-পূর্ব ও রানাঘাট দক্ষিণে বাদ পড়েছে ৪২ হাজার মতুয়ার নাম। উত্তর চব্বিশ পরগনায় সাড়ে ৭ লক্ষ মানুষের নাম নো ম্যাপিংয়ের আওতায় এসেছে। গত বছর শেষের দিকেই মতুয়া সমাজকে আশ্বস্ত করার জন্য রাজ্য বিজেপিকে খামবন্দী চিঠি দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। অথচ এদিন মতুয়া শব্দটি একবারও বলতে শোনা গেল না তাঁকে। বরং,রাষ্ট্রপতির অসম্মান প্রসঙ্গটিকে তিনি আদিবাসী সমাজের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। বললেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
India Russian oil imports: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দফতর জানিয়েছে, এই অনুমতি মাত্র ৩০ দিনের জন্য। অর্থাৎ এই পরিবর্তন স্থায়ী নয়, বর্তমান পরিস্থিতি সামলানোর জন্য নেওয়া একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত।
ওরা শুধু রাষ্ট্রপতিকে অপমান করেনি, আদিবাসীদের অসম্মান করেছে। কোটি কোটি মহিলাকে অপমান করেছে, দেশের সর্বোচ্চ পদের গরিমাকে খাটো করেছে।
দেশজুড়ে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক নির্যাতন প্রসঙ্গটিতে নীরবতা বজায় রাখতে হলো নরেন্দ্র মোদিকে। বাঙালি যুবককে রাজ্যের বাইরে কাজ করতে যেতে হয় বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন,
এখানকার নির্মম সরকার যুবক-যুবতীদের পালিয়ে যাওয়ার অভিশাপ দিয়েছে। বাংলার যুবসমাজ মেহনতি। একসময় এই বাংলা সকলের আগে ছিল। আজ এখানকার যুবক-যুবতী না এখান থেকে ডিগ্রি পাচ্ছেন, না চাকরি।
কিন্তু তাদের কর্মসংস্থান কী ভাবে হবে? সেব্যাপারে কার্যত কোনো দিশা রইল না মোদির বক্তব্যে। রাজ্যে শিল্প পরিকাঠামো সম্পর্কে আগামী দিনে বিজেপির কোনো বিনিয়োগ পরিকল্পনা আছে কিনা তাও বোঝা গেল না।
বদলা নয় বদল চায়, এই স্লোগানে কালাপাহাড় সরিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মোদি কিন্তু হিসেবের কথা বললেন। বললেন,
সব হিসেব বুঝে নেওয়া হবে।
এই পর্যায়ে তাঁকে ধর্না মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের উত্তর দিতে শোনা গেল। তিনি বললেন, "এখানে খোলাখুলি ধমক দেওয়া হচ্ছে একটি বিশেষ সম্প্রদায় আপনাদের খতম করে দেওয়া হবে।" সংবিধানের কুরসিতে বসে এসব কথা বলতে পারেন না। পাল্টা প্রশ্ন উঠতে পারে, 'ওদের বেশি বাচ্চা', 'পোশাক দেখে চেনা যায়' জাতীয় কথাও কি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী বলতে পারেন?
মোদির সভা শেষ হলো "তৃণমূলকে কেউ বাঁচাতে পারবে না", এই স্লোগানে। কিন্তু কোন পথে বিদায়? কার নেতৃত্বে? কোন একটি ইস্যুকে সামনে রেখে তৃণমূলকে টেনে নামাবে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি? প্রথম নির্বাচনী জনসভায় অন্তত পরিষ্কার হলো না, লুকনোও গেল না অস্বস্তি।






