বিজেপির ব্রিগেড: অনুপ্রবেশ মন্ত্রে বাজিমাতই মোদির লক্ষ্য?
West Bengal Bjp Brigade: রাজ্যের ২৯৪টি আসন দখলের লড়াইয়ে এখন থেকেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে রাজনৈতিক দলগুলি। এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী শক্তি ভারতীয় জনতা পার্টি।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। রাজ্যের ২৯৪টি আসন দখলের লড়াইয়ে এখন থেকেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে রাজনৈতিক দলগুলি। এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী শক্তি ভারতীয় জনতা পার্টি।
এই প্রেক্ষাপটে ১৪ মার্চ কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বড় সভা করতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর সঙ্গে মঞ্চে থাকার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহেরও। বিজেপির এই সভাকে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার মঞ্চ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এই সভা ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপির কৌশল ও প্রচারের দিকনির্দেশও স্পষ্ট করতে পারে।
বিজেপির এই ব্রিগেড সভার মাধ্যমেই রাজ্যে তাদের প্রথম পর্বের প্রচার সমাপ্ত হবে। গত ১ মার্চ থেকে রাজ্যজুড়ে 'পরিবর্তন যাত্রা' শুরু করেছিল তারা। ভোটের আবহে প্রধানমন্ত্রীর জনসভার মাধ্যমেই শেষ হবে এই যাত্রা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুরু হয়েছিল ন'টি পরিবর্তন যাত্রা। রাজ্যের সমস্ত বিধানসভা এলাকায় পৌঁছে যাওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। ষাটটির বেশি জনসভা এবং তিনশোর-ও বেশি ছোট সভার পরিকল্পনা ছিল বিজেপির রাজ্য নেতাদের। শেষে এই ন'টি যাত্রা এসে একত্র হবে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। যেখানে সম্বোধিত করবেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। আর এর মাধ্যমেই রাজ্যে নির্বাচনী আবহে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে চায় বিজেপি। কারণ বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে, ব্রিগেডের সভা সর্বদাই ভিন্ন মাত্রা যোগ করে দেয়।
বাংলা দখলের লক্ষ্য নিয়ে বিজেপি বহুদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসতে পারেনি। সেই নির্বাচনে বিজেপি ৭৭টি আসনে জয় পায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জিততে গেলে অন্তত ১৪৮টি আসন দরকার। তাই বিজেপি এবার আরও সংগঠিতভাবে নির্বাচনী কৌশল সাজাতে চাইছে। রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপির অন্যতম মুখ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ফলে আগামী নির্বাচনের লড়াই মূলত তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Narendra Modi’s Bengal strategy: তাহেরপুরের সভায় মোদির বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে ‘গো ব্যাক মোদি’ বলতে ব্যস্ত, কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে নীরব।
গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংগঠন দ্রুত বড় হয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে দলটি। উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় বিজেপির প্রভাব এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তাই এবার দলটি বিশেষভাবে নজর দিচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের দিকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং হুগলি—এই কয়েকটি জেলাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে বিজেপি। এই অঞ্চলগুলিতে ভোটার সংখ্যা অনেক বেশি। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই অঞ্চলের বেশ কিছু আসনে ভালো ফল করেছিল। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি। তাই এবার সংগঠন আরও শক্তিশালী করার দিকে জোর দিচ্ছে দল। বিজেপির হিসাব, দক্ষিণবঙ্গের বড় ভোটবাজারে ভালো ফল করা গেলে গোটা নির্বাচনের ফলেও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।
২০২৬ সালের নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) নিয়ে। নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়ায় বহু নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ৫৮ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে অনেককে মৃত বা স্থানান্তরিত বলে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বহু মানুষ দাবি করছেন, তাঁদের নাম ভুলভাবে বাদ পড়েছে।
বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলের সরাসরি অভিযোগের তির নির্বাচন কমিশনের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় সংশোধন আদতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, ভোটার তালিকা পরিষ্কার করার জন্য এই ধরনের প্রক্রিয়া জরুরি। এতে ভুয়ো বা অযোগ্য নাম বাদ পড়বে এবং নির্বাচন আরও স্বচ্ছ হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BJP Uses Bengali Icons as Electoral Tools: বাংলায় বিজেপির শিকড় নেই বলে সাংস্কৃতিক ধারকেই ব্যান্ডউইডথ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-নেতাজিকে এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যেন তাঁরা হিন্দুত্ব রাজনীতির অগ্রদূত ছিলেন।
এসআইআর বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে বেশি সংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগ। উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার একাধিক কেন্দ্র—যেমন গাইঘাটা, বাগদা, বনগাঁ ও রানাঘাট মতুয়া জনসংখ্যার জন্য পরিচিত। এই এলাকাগুলিতেই নো-ম্যাপিং ভোটারের হার রাজ্যের গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে যাঁদের নিয়ে বিজেপি এতদিন নাগরিকত্ব রাজনীতি করেছে, তাঁরাই এখন ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি বিজেপির জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি নদিয়ার তাহেরপুরে একটি সভায় নরেন্দ্র মোদির যোগদানের কথা ছিল, আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে মোদি আর তাহেরপুরে যেতে না পারায় দমদম বিমানবন্দর থেকে ভার্চ্যুয়ালি ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই সভায় মোদির বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে ‘গো ব্যাক মোদি’ বলতে ব্যস্ত, কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে নীরব। মোদি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি গলিতে লেখা থাকা উচিত—'গো ব্যাক অনুপ্রবেশকারী।' এই বক্তব্য বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি। ওই সভায় মোদি মতুয়াদের উদ্বেগের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। ফলে ওই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ একটি বড় সমস্যা। তাদের অভিযোগ, তৃণমূল সরকার ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির কারণে এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কিন্তু খসড়া ভোটার তালিকার পরিসংখ্যান কিছু প্রশ্নও তুলেছে। যেসব বিধানসভা কেন্দ্র মুসলিম অধ্যুষিত যেমন ডোমকল, রানিনগর, সামসেরগঞ্জ বা লালগোলা, সেখানে নো-ম্যাপিং ভোটারের হার খুবই কম। অনেক ক্ষেত্রে তা এক শতাংশের কাছাকাছি। ফলে বিজেপির প্রচারিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ভোটার’ তত্ত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বিজেপির প্রচারের কিছু দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপি হয়তো একটি নতুন ধরনের প্রচার কৌশল নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে, তাঁদের ‘বৈধ ভোটার’ হিসেবে তুলে ধরে একটি আবেগ তৈরি করার চেষ্টা করা হতে পারে। এই ধরনের প্রচারের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বার্তা থাকতে পারে, যারা তালিকায় আছে তারাই আসল নাগরিক। এই ধরনের প্রচার ভোটারদের মধ্যে পরিচয়ভিত্তিক আবেগ তৈরি করতে পারে। বিজেপি সেই আবেগকেই ভোটে রূপান্তর করার চেষ্টা করতে পারে।
বিজেপির জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ইস্যু এখন আগের মতো তীব্র নেই। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি-সহ একাধিক অভিযোগ একসময় বিজেপির বড় রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ইস্যুগুলির রাজনৈতিক তীব্রতা কিছুটা কমেছে। ফলে বিজেপিকে নতুন করে প্রচারের বিষয় তৈরি করতে হচ্ছে।
এর মধ্যেই রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছেন ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তৃণমূল থেকে দূরত্ব তৈরি করে তিনি নতুন রাজনৈতিক দল গড়েছেন এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে বড় ভূমিকা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাধারণত, এই ধরনের নতুন শক্তি ভোটের সমীকরণে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। এখানে উদাহরণ টানা যেতে পারে মজলিস-ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (মিম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি-র। তিনি ‘ভোটকাটুয়া’ নেতা হিসেবে বেশ পরিচিত।
ব্রিগেডের মঞ্চ থেকেই পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের জন্য মোট ১৮ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে রেল, সড়কপথ, বন্দর-সহ একাধিক প্রকল্প। প্রায় ৪২০ কিলোমিটার দীর্ঘ জাতীয় সড়ক নির্মাণ প্রকল্পও এই তালিকায় রয়েছে। ভোটের মুখে এমন বড়সড় উন্নয়ন প্যাকেজ ঘোষণা রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছে অনেক মহল। বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বার্তা দিতেই কি উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন অত্যন্ত জটিল সমীকরণের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে বিজেপি সংগঠন শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করারও চেষ্টা করছে। কিন্তু সামনে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। মতুয়া অসন্তোষ, ভোটার তালিকা বিতর্ক এবং দুর্নীতির ইস্যুর ম্লান হয়ে যাওয়া, এই তিনটি বিষয় বিজেপির কৌশলকে জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসও নিজেদের সংগঠন ও সামাজিক সমর্থনের জোরেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে চলেছে, তা এখন থেকেই স্পষ্ট। ১৪ মার্চের ব্রিগেড সভা সেই বড় লড়াইয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে।






