অর্থ-সমৃদ্ধির বৃষ্টি! কেন পালিত হয় ধনতেরস? জানুন আসল কারণ
Dhanteras 2022: বলা হয়, ধনের অর্থাৎ অর্থ-সম্পত্তি সমৃদ্ধির বর্ষা হয় এদিন। দেবী লক্ষ্মীকে সন্তষ্ট করতে পারলে অর্থের অভাব হয় না।

উৎসবের মরশুম। সবেমাত্র দুর্গাপুজো শেষ হয়েছে। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণে এবার লক্ষ্মীপুজোর পরেই আসছে কালীপুজো। কিন্তু তার আগেও রয়েছে উৎসব। বলা ভালো আচার। যা সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের জন্য অন্যতম স্থান দখল করে রয়েছে। যেমন ভূত চতুর্দশী। কালীপুজোর দিন অর্থাৎ অমাবস্যার আগের দিন পালিত হয় এই আচার। এদিনের সঙ্গেই জড়িত রয়েছে নানা কথকতা। ঠিক এভাবেই ভূত চতুর্দশীর আগের দিন পালন করা হয় ধনতেরস উৎসব। মূলত, অবাঙালিদের মধ্যে এই উৎসব পালিত বা প্রচলিত হলেও বর্তমানে তা ছড়িয়েছে বাঙালিদের মধ্যেও। কথিত আছে, এই দিন নাকি সোনা, রূপো কিনতে হয়। আর নতুন কিছু না কিনলে নাকি বিপদ আসন্ন! আবার এই আচার নিয়ে রয়েছে একাধিক জনশ্রুতিও।
ধনতেরস উৎসব কী
কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী অর্থাৎ অমাবস্যা বা পূর্ণিমার এক দিন আগের দিন। এই ক্ষেত্রে দীপাবলি উৎসবের আগের ত্রয়োদশীতে পালিত হয় ধনতেরস। বলা হয়, ধনের অর্থাৎ অর্থ-সম্পত্তি সমৃদ্ধির বর্ষা হয় এদিন। দেবী লক্ষ্মীকে সন্তষ্ট করতে পারলে অর্থের অভাব হয় না। এই বিশ্বাসে পালিত হয় ধনতেরস। বলা হয়, কুবেরের আরাধনায় এই আচার পালিত হয় বহু আগে থেকেই।
কী করা হয়
ধনতেরস উৎসব পালন প্রদীপ জ্বালিয়ে লক্ষ্মী, গণেশপুজো শুধু নয়। প্রত্যেকেই চেষ্টা করেন কিছু একটা কিনতে। দিকে দিকে বিশেষত, সোনা কিনতে ঝাঁপিয়ে পড়েন বহু মানুষ। কথিত আছে, এইদিন ধাতু, মূলত সোনা বা রূপো কেনা ভালো!
সোনা না কিনতে পারলে কী কিনবেন
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kali Puja 2022: প্রতি বছর রাজ্যের এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ নৈহাটির কিছু বিখ্যাত প্রতিমা দর্শন করতে ভিড় জমান।
অনেকেই আর্থিকভাবে অসুবিধেয় থাকার দরুন সোনা কিনতে পারেন না। রূপোর দামও চড়া। তাহলে ধনতেরসে কী কিনবেন আর? বলা হয়, এদিন ঝাঁটা কেনার কথা। বিশ্বাস, এই ঝাঁটা নাকি ধুলো-ময়লার মতো সমস্ত বিপদ, অশুভকে বিদায় করতে পারে। এছাড়াও নতুন কাঁসা-পিতলের জিনিস কেনাও এদিন শুভ। দাবি করা হয়, ধনতেরস উৎসবের দিন কোনও নতুন বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম; মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ, মাইক্রোওভেন, এসি; এই জাতীয় যে-কোনও দ্রব্য, যেটি নতুন, তা কেনা যেতে পারে। এছাড়াও নতুন বস্ত্র কেনাও শুভ ধনতেরসে। অর্থাৎ শুধু সোনা, রূপো, বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম বা ঝাঁটা নয়, এদিন মা ধনলক্ষ্মীকে, ধনের দেবীকে তুষ্ট রাখতে কেনা যায় নতুন বস্ত্রও।
কী কী করবেন
শুধু নতুন কিছু কেনা নয়। বলা হয়, এদিন কিছু কাজ করলে সংসারে সমৃদ্ধি আসবে দ্রুত। কী করবেন?
এদিন লক্ষ্মীর পুজো করুন। বাড়িতে গণেশ থাকলে তাঁকেও পুজো দিন। লক্ষ্মীর ভোগে রাখুন অন্ন, মিষ্টি। লাল ফুল। সুন্দর করে সাজিয়ে যেমন কোজাগরী পূর্ণিমার দিন পুজো করেন অনেকেই, ঠিক সেভাবেই লক্ষ্মীর আরাধনা করুন। একসঙ্গে লক্ষ্মী এবং গণেশের পুজো করা সবচেয়ে ভালো। অবশ্যই ঘি দিয়ে প্রদীপ জ্বালান পুজোর সময়। পারলে সারারাত আলো অর্থাৎ প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখুন পুজোর ঘরে। আপনার ঘরের কোনও অংশেই যেন অন্ধকার না থাকে।
দেবীমূর্তির সজ্জার দিকেও নজর দিন। নিজেদের বসনেও নজর দিতে বলেন অনেকে। পারলে পুজোর সময় আপনার কেনা নতুন জিনিস রাখুন পুজোর ঘরে।
কী কী করবেন না ভুল করেও
জ্যোতিষ-বিশারদরা বলেন, ধনতেরসের দিন কোনও ভাবেই কাউকে কিছু দান করা ভুল। অর্থাৎ, ঘর থেকে কিছু দেওয়া যাবে না। এর সঙ্গেই সন্ধ্যা হলে ঘরের কোথাও যেন অন্ধকার না থাকে। ভুল করেও দরজা-জানলা সারারাত খোলা রাখা যাবে না। এদিন কালো রঙের বস্ত্র পরিধান না করা ভালো। খুব অসুবিধে না হলে ধনতেরসের দিন নিরামিষ আহার করতে বলেন অনেকেই। সতর্ক থাকতে হবে পুজোর সময় বা আগে যেন কোনও ভাবেই শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত না হন। অর্থাৎ, পুজোর সময় ক্ষত নিয়ে পুজো করা যাবে না। এদিন শান্ত পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। কিছু কিনলে সেটি অবশ্যই যেন নতুন হয়। আর এদিনই কিনতে হবে।
ধনতেরসের পুরাণ-অনুষঙ্গ
পুরাণ অনুযায়ী একাধিক কাহিনি জড়িত আছে এই উৎসবের সঙ্গে। যাঁর মধ্যে অন্যতম রাজা হিমা, মতান্তরে রাজা হিমের কাহিনি। কথিত আছে, হিমার ১৬ বছরের ছেলের উপর একটি অভিশাপ ছিল। তাঁর কুষ্টি করান হলে, দেখা যায়, বিয়ের চার দিনের দিন, সাপের কামড়ে মৃত্যু হবে হিমার পুত্রের। রাজা তাঁর ছেলের বিয়ের পর একথা তাঁর বৌমাকে জানান। বিয়ে হয়। এবার সেই অভিশপ্ত দিনে হিমার পুত্রের স্ত্রী তাঁকে সে দিন ঘুমোতে দেননি। যেখানে তাঁরা ছিলেন, ঠিক সেই ঘরের বাইরে সব গয়না খুলে নিয়ে, রূপার মুদ্রা নিয়ে গিয়ে রেখে আসেন তিনিই। এর সঙ্গে সেই ঘরের ভিতরে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলেন। সারারাত স্বামীকে গল্প-গান শোনালেন, যাতে তিনি জেগে থাকেন। পরের দিন সকালে মৃত্যুর দেবতা যম ঘরের দরজায় এসে উপস্থিত হলে, আলো আর গয়নার ঝলসানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যায় তাঁর। ওই ঘর পর্যন্ত তিনি গেলেন কিন্তু তিনিও সোনার উপরে বসে শুনলেন গান, কবিতা। কাজ সম্পূর্ণ না করেই যম চলে গেলেন অবশেষে। বাঁচলেন হিমার পুত্র। এর আনন্দেই ধনতেরস পালন শুরু হলো দিকে দিকে।
এই উৎসব পালন নিয়ে, অর্থাৎ ধনতেরস নিয়ে আরও একটি কাহিনি রয়েছে। কথিত আছে, দুর্বাসা মুনির অভিশাপে একবার লক্ষ্মীছাড়া হলো দেবতাদের স্বর্গ। এরপর রাক্ষস-দলের সঙ্গে বিরাট যুদ্ধ হল দেবতাদের। সেই অবস্থায় সমুদ্রমন্থনের পর ধনতেরসেই দেবতারা ফের স্বর্গে ফিরে পান লক্ষ্মীকে। সেই ফিরিয়ে আনার আরাধনাই নাকি ধনতেরস।








