চোদ্দ ফুটের প্রতিমা! 'জাগ্রত বড়মা'-কে দেখতে আজও ভিড় জমে নৈহাটির কালীপুজোয়

Kali Puja 2022: প্রতি বছর রাজ্যের এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ নৈহাটির কিছু বিখ্যাত প্রতিমা দর্শন করতে ভিড় জমান।

Raktim Dey
৩ মিনিট
চোদ্দ ফুটের প্রতিমা! 'জাগ্রত বড়মা'-কে দেখতে আজও ভিড় জমে নৈহাটির কালীপুজোয়

মা দুর্গার কৈলাসে ফিরে যাওয়ার দুঃখ বাঙালির মন থেকে কিছুটা লাঘব করে কালীপুজো। বাংলায় কালীপুজো মানেই বিভিন্ন ধরনের আতসবাজি এবং আলোর রোশনাই। বর্তমানে কলকাতায় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে কালীপুজোর প্রতিমা দর্শনের চল খুবই কমে গিয়েছে। কলকাতা থেকে কিছু দূরেই নৈহাটিতে এর বিপরীত ছবি দেখা যায়। প্রতি বছর রাজ্যের এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ নৈহাটির কিছু বিখ্যাত প্রতিমা দর্শন করতে ভিড় জমান। মণ্ডপের চাকচিক্য খুব কম, কোথাও আবার মণ্ডপ হিসেবে আয়োজন খুবই সামান্য। যদিও সেই সব কিছুর তোয়াক্কা না করেই নৈহাটি এবং তার আশপাশের কিছু জনপ্রিয় প্রতিমা দর্শন করার মানুষের সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে।

নৈহাটির কালীপুজোর কথা উঠলে প্রথমেই বড়মা-র নাম উঠে আসে। নৈহাটি স্টেশন থেকে হাঁটা পথে ঋষি অরবিন্দ রোড ধরে গঙ্গার দিকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই বড়মাকে দেখতে পাওয়া যায়। এই এলাকা এবং অন্যান্য বিভিন্ন এলাকার অগণিত মানুষের বিশ্বাস, বড়মা খুবই জাগ্রত। বড়মা নামে মা কালী-র যে রূপকে পুজো করা হয়, সেই রূপ সাধারণ মানুষের কাছে রক্ষাকালী নামেই পরিচিত। "ধর্ম যার যার, বড়মা সবার", এই নীতি মেনেই প্রতি বছর পুজোর আয়োজন করা হয়। প্রায় শতবর্ষ পূর্ণ করে ফেলা এবং বহু মানুষের কাছে পরিচিত এই পুজোর একটি ইতিহাস রয়েছে, এবং তার সঙ্গেই বড়মার নামকরণ জুড়ে রয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আজও বিলিতি খড়্গে বলি হয় তিনশো বছর পুরনো হালদারবাড়ির কালীপুজোয়

Kali Puja 2022: তিনশো বছরের ঐতিহ্যবাহী হালদারবাড়ির কালীপুজোয় বিলিতি খড়্গ দিয়ে হয় বলি।

নৈহাটির জনৈক ভবেশ চক্রবর্তী একবার তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে নবদ্বীপের ভাঙা রাস দেখতে গিয়েছিলেন। সেই এলাকার প্রতিমার আকার দেখে তিনি ঠিক করেছিলেন, তাঁর নিজের বাড়িতে সেই একই আকারের কালীমূর্তি তৈরি করে পুজো শুরু করবেন। বাড়িতে পুজো শুরু হলেও প্রতিমার আকার প্রতি বছর বৃদ্ধি করার কারণে বর্তমানে সেই পুজোর আয়োজন বাড়ির ভেতরে করা সম্ভব নয়। তাই ঋষি অরবিন্দ রোডের একপাশে প্রতিমা নির্মাণ করে পুজো করা হয়। লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকে প্রতিমা নির্মাণ শুরু হয়। এলাকার প্রবীণ মানুষদের মতে, এই প্রতিমার উচ্চতা প্রায় চোদ্দ হাত। প্রকৃতপক্ষে, বড়মা-র প্রতিমার উচ্চতা হয় প্রায় একুশ থেকে বাইশ ফুট। শুরুতে এই পুজো ভবেশ-কালী অথবা ভবেশের কালীপুজো নামে পরিচিত হলেও ক্রমে প্রতিমার আকার এবং মাহাত্ম্যের কারণে এই প্রতিমা বড়মা নামে পরিচিতি লাভ করে। আজও মা কালীর ভোগের আয়োজন চক্রবর্তী পরিবারের বাড়িতেই করা হয়। পুজোর সেবকরা পুজোর খরচ বহন করে। নৈহাটিতে বড়মা-র একটি মন্দির রয়েছে। সেই মন্দিরে বছরের বাকি দিনগুলোতে পুজোর আয়োজন করা হয়। পুজোর দিনগুলোতে বহু ভক্তদের দেওয়া গয়নায় বড়মা সেজে ওঠেন। বড়মা-র প্রতি শ্রদ্ধার কারণেই বিসর্জনের সময়ে সাধারণত বড়মার মূর্তি প্রথমে বিসর্জন দেওয়া হয় এবং তার পরে এলাকার বাকি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ১৯৭০ সাল অবধি এলাকার শক্তিশালী মানুষরা কাঁধে করে বড়মার প্রতিমাকে বিসর্জনের জন্য নিয়ে যেত। যদিও বর্তমানে সেই প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে।

নৈহাটির কালীপুজো শুনলেই প্রথমেই বড়মা-র নাম মাথায় আসলেও এই এলাকায় আরও বহু জনপ্রিয় পুজো রয়েছে। ঋষি অরবিন্দ রোডে বড়মা ছাড়াও আরও অনেক পুজো হয়। তার মধ্যে হকার্স কালী অন্যতম। হকার্স সমিতি এই পুজোর আয়োজন করে বলেই এই পুজোর নাম সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে গিয়েছে হকার্স কালী। নৈহাটি স্টেশন থেকে কিছুটা হাঁটা পথে বরোদা ব্রিজ পৌঁছনোর আগেই পৌঁছে যাওয়া যায় গোপাল স্মৃতি সংঘ-র পুজোয়। এই পুজো স্থানীয় মানুষের কাছে দেবু ঘোষের কালীপুজো নামেই পরিচিত। নৈহাটি এলাকার এক জনপ্রিয় প্রতিমা স্থানীয় মানুষের কাছে উনত্রিশ হাত কালী নামেই পরিচিত। প্রতিমার উচ্চতা প্রায় উনত্রিশ হাত হওয়ার কারণেই সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এই নাম ছড়িয়ে পড়েছে। বরোদা ব্রিজ পেরিয়ে কিছুটা হাঁটা পথে এগোলে উনত্রিশ হাত কালীপ্রতিমা দর্শন করা যায়। এছাড়া লোহাঘাটের কালীপুজো, 'আমরা কজন' ক্লাব এই এলাকার জনপ্রিয় পুজোর তালিকায় পড়ে।

নৈহাটির কালীপুজো-পরিক্রমার মাঝে পেটপুজোর জন্য নতুন এবং পুরনো বিভিন্ন খাবারের প্রতিষ্ঠানে ঢুঁ মারা যেতে পারে। স্বল্প দামে বিভিন্ন রকমের খাবার পরিবেশন করার জন্য নৈহাটি স্টেশন থেকে ঢিল ছোড়া দুরত্বে থাকা 'রাজ কেবিন' যথেষ্ঠ সুনাম অর্জন করেছে। স্টেশন থেকে অল্প দূরত্বের মধ্যেই রয়েছে 'রয়্যালস'-এর মতো আধুনিক ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁ এবং ব্ল্যাক হারবার-এর মতো খুবই স্বল্প পরিসরে তৈরি হওয়া ছিমছাম রেস্তোরাঁ। প্রতিমা দর্শন এবং পেটপুজোর মতো দুটো আকর্ষণীয় বিষয়ের টানে কালীপুজোর দিন নৈহাটিতে বহু মানুষের সমাগম হয়।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।