ইন্দোনেশিয়ার পুতুলনাচ ‘ওয়ায়াং’-এর উৎস লুকিয়ে আছে ভারতেই?

Indonesian puppet show : পুতুল তৈরির জন্য তিন ধরনের চামড়া ব্যবহার করা হয়: হরিণ, দাগযুক্ত হরিণ ও ছাগল। হরিণের ত্বক শক্তিশালী এবং প্রতিরোধকারী। তাই এগুলো যোদ্ধা ভীম ও দশানন রাবণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

Jana Bandyopadhyay
২ মিনিট
ইন্দোনেশিয়ার পুতুলনাচ ‘ওয়ায়াং’-এর উৎস লুকিয়ে আছে ভারতেই?

সভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষ নিজেদের বিনোদন ও সৃজনশীলতার ঐতিহ্য বহনের জন্য বিভিন্ন মাধ্যম অবলম্বন করেছে। সেইসব মাধ্যমের মধ্যে নৃত্য, গীত, অভিনয়, থিয়েটার ছাড়া পুতুলনাচও ছিল। এই শিল্পগুলিকে 'পারফর্মিং আর্টস'-ও বলা হয়।

ওয়ায়াং পুতুলনাচ

জাভা বা ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ছায়া পুতুল নাচ ‘ওয়ায়াং’ নামে খ্যাত। চামড়ার তৈরি পুতুলদের পর্দার পেছনে আলো ফেলে তার প্রতিবিম্ব দর্শকদের দেখানো হয়। এক্ষেত্রে অনেক ধরনের পুতুল আছে যা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন আকার, আকৃতি, উচ্চতার দিক দিয়ে অনন্য শৈলীতে নির্মিত হয়। একটি কাঠের লাঠি বা রড সাধারণত পুতুলের পেছনে সংযুক্ত, সেগুলোকে নাট্যানুষ্ঠানের সময় কাজে লাগানো হয়। কখনো-কখনো একক অনুষ্ঠানের জন্য পাঁচশোটি পুতুলের একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে, এমন তথ্যও জানা যায়! এই পুতুলগুলো বিভিন্ন পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনিকে উপস্থাপন করে। এবং পুতুলগুলোর মধ্যে দিয়ে সেই নাট্যরূপ মঞ্চে উপস্থাপিত করা হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শক্তিমান থেকে আলিফ লায়লা, আরতি পালের মাটির পুতুল কেন এত জনপ্রিয়?

Arati Pal : আশি ও নব্বই দশকে দূরদর্শনে সম্প্রচারিত জনপ্রিয় ধারাবাহিকের চরিত্রগুলোকে নির্ভর করে আরতি পাল পুতুল তৈরি করেছেন। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল:  শক্তিমানের পুতুল।

ওয়ায়াং কুলিত নিঃসন্দেহে একটি জনপ্রিয় বিনোদন শিল্প। এটি গল্প বলার একটি প্রাচীন ধরন, যা বিস্তৃত পুতুলনাচ ও সংগীত শৈলীর জন্য পরিচিত।

'ওয়ায়াং' শব্দটি ইন্দোনেশিয়ান শব্দ, যার অর্থ 'ছায়া'। এর দুটি প্রকার ভেদ হল: ওয়ায়াং কুলিত ও ওয়ায়াং গোলক। প্রথমটি চামড়ার পুতুল দ্বারা এবং দ্বিতীয়টি কাঠের ত্রিমাত্রিক পুতুল দ্বারা পরিবেশিত হয়। ওয়ায়াং কুলিত পরিবেশনাগুলি সাধারণভাবে বিশেষ অনুষ্ঠানে বা উৎসবে আয়োজন করা হয়। প্রধানত, রামায়ণ, মহাভারত এবং স্থানীয় কিংবদন্তির গল্প এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এই নাট্য পরিবেশনায় সাধারণত 'গ্যামলান অর্কেস্ট্রা' নামক বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়, যা ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবেশন করে। গ্রামীণ শিশু, কিশোর, যুবক সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই পুতুল নাচ খুবই জনপ্রিয়। মানুষের মতো করে, পুতুলগুলো হাসি, কান্না, আনন্দ, বেদনা, রাগ, দু:খ ইত্যাদির অভিনয় করে দর্শকের প্রশংসা পায়।

ইন্দোনেশিয়ায়র পুতুলনাচ

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মেঘলা দিনের রথের মেলা আজও রঙিন মাটির পুতুলে

Clay Doll : বলাই চিত্রকরের তৈরি পুতুলের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুল। দুই খোল ছাঁচের এই পুতুলের শরীরের ভেতরটা ফাঁপা।

পুতুল নাচ হল নাটকীয় অভিব্যক্তির একটি রূপ। এটি লোকনাট্যের প্রাচীন মাধ্যম। ইংরেজিতে একে বলা হয় 'পাপেট শো' বা ' পাপেট থিয়েটার'। ইন্দোনেশিয়ার পুতুল নাচ বিনোদনের ক্ষেত্রে অন্ধ্রপ্রদেশের 'থোলু বোম্মালতা' থিয়েটারের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। 'থোলু'-র অর্থ চামড়া, ' বোমলতা-র অর্থ পুতুল। আক্ষরিক অর্থ, চামড়ার পুতুলের নাচ। যারা গ্রামে-গ্রামে গিয়ে লোকগান গায়, ভাগ্যবিচার করে, তাবিজ বিক্রি করে, এরকম মানুষজনও নাট্যানুষ্ঠানে অংশ নেয়। রেডিও, টেলিভিশনের যুগের বহু আগে থেকেই এরা সংস্কৃত মহাকাব্য ও স্থানীয় লোককাহিনি সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করে আসছে। মহাকাব্যের বিভিন্ন গল্পগুলো আসলে এইসব নাট্যানুষ্ঠানের উৎস।

পুতুল তৈরির জন্য তিন ধরনের চামড়া ব্যবহার করা হয়: হরিণ, দাগযুক্ত হরিণ ও ছাগল। হরিণের ত্বক শক্তিশালী এবং প্রতিরোধকারী। তাই এগুলো যোদ্ধা ভীম ও দশানন রাবণের জন্য ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য সমস্ত পুতুলগুলো সাধারণত ছাগলের ত্বক থেকে তৈরি, স্থানীয়ভাবে যা সহজেই পাওয়া যায়। তবে রাবণের জন্য একাধিক চামড়ার প্রয়োজন হয়: একটি শরীরের জন্য, একটি পায়ের, একটি প্রতিটি বাহুতে!

ওয়ায়াং-এর পুতুল

থোলু বোম্মালতা অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার একটি প্রাচীন ছায়াপুতুলের নাট্যরূপ। এই শিল্প দু-হাজার বছরের পুরনো। অন্ধ্রপ্রদেশের লোক লোকসংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ হল রামায়ণ, মহাভারত আশ্রিত চামড়ার পুতুল নাচ। একে অনেকেই ইন্দোনেশিয়ার ছায়া পুতুল নাচের অন্যতম উৎস বলেছেন। ইন্দোনেশিয়ার এই শিল্পকলা মালএশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস প্রভৃতি দেশেও ইতিহাস প্রসিদ্ধ। তাই বলা যায় যে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার পুতুল নাচের সংস্কৃতিতে ভারতীয় সংস্কৃতির স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?