যন্ত্র ও মানবের সহাবস্থানের গল্প বলে ফুজিকো ফুজিওর ডোরেমন
Doraemon: আমরা দেখেছি নোবিতা ছিল সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তার অত্যধিক 'ঘুমে চোখ বুজে থাকা', যেন এই বহমান অশান্ত পৃথিবীর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা।
যন্ত্র সভ্যতার ইতিহাস সাহিত্যে 'মানুষ এবং যন্ত্রে'র গল্প সব সময়ই বিরোধের গল্প হয়েই উঠে এসেছে। বাংলায় ব্যতিক্রম কাহিনি বোধ হয় সুবোধ ঘোষের 'অযান্ত্রিক'। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, ইংরেজি ভাষায় মূলত, ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী জুড়ে রোবট সম্পর্কিত যত কাহিনি রয়েছে, তার সবগুলিতেই যন্ত্রের আগমনের ফলে একসময় কীভাবে যন্ত্র কর্তৃক মানুষের অত্যাচারিত হওয়ার দিন ঘনিয়ে আসবে তা-ই লেখা হয়েছে। এক্ষেত্রে লেখকদের দার্শনিক চিন্তা কুর্নিশযোগ্য, কিন্তু তা সত্ত্বেও যন্ত্র বনাম মানুষের জায়গা থেকে সিরিয়াস সাহিত্যের লেখকরা বেরোননি বললেই চলে। আর ঠিক এই জায়গাতেই নিয়ে আসতে ইচ্ছে করে ফুজিকো ফুজিও সৃষ্ট ডোরেমন সিরিজের প্রসঙ্গ।
ডোরেমন চরিত্রটি ফুজিও নির্মাণ করেন ১৯৭৪ সালে। ফুজিও যখন ডোরেমন সিরিজটি লিখতে শুরু করছেন তার দুই দশক আগে (১৯৫০) অ্যালান টিউরিন প্রশ্ন তুলেছেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Arijit Singh: শুরুতে জল্পনা ছিল তিনি হয়তো পুরোপুরি চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু এক্স হ্যান্ডেলে তাঁর ভক্তদের সঙ্গে তাঁর কথপোকথন বলছে অন্য কথা।
ক্যান মেশিন থিংক?
এবং তার দুই দশক পর (১৯৯৭) কাসপরভ ডিপ ব্লু-র কাছে দাবায় হেরে যায়, যা এ.আই-এর ইতিহাসের সব থেকে বড় মাইলফলক। যন্ত্রের স্বাধীন চিন্তা নিয়ে চিন্তা করা থেকে তার কার্যক্ষমতার বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ অবধি সময়পর্বের ঠিক মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ডোরেমন লেখা হলো। আজ যখন, বিশেষত কোভিড পরবর্তী সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেকনোলজি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নির্ভরতা ও চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন মনে হয় ডোরেমনের চরিত্রায়নের দিকে ফিরে তাকানো দরকার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Narayan Debnath Copyright Case: আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা নারায়ণ দেবনাথের কোনো বই ছাপতে বা বিক্রি করতে পারবে না।
যদি প্রশ্ন করা হয়, ডোরেমনের নায়ক কে? অধিকাংশই দ্বিধাহীনভাবে ডোরেমনের নাম বলবেন। কিন্তু, আমরা কি ভুলে যেতে পারি নোবিতা নোবির কথা? আসলে ডোরেমন আর নোবিতার সম্পর্কই তো গল্পের প্রাণকেন্দ্র। আজকের অত্যাধুনিক টেকনোলজিসর্বস্ব পৃথিবীতে যখন এতটুকুও জিরিয়ে নেওয়ার সময় নেই, শান্ত হওয়ার সময় নেই, অশান্তই যখন আসন্ন যুগের ধর্ম, তখন কি মনে পড়বে না নোবিতার কথা? আসলে ডোরেমনের গল্পগুলির 'পাঠ'-কে আমরা যদি একটু খুঁটিয়ে দেখি তাহলে দেখতে পাব, নোবিতা আসলে যুগের যূপকাষ্ঠে হাঁপিয়ে ওঠা এক কিশোর। তার অর্থবল নেই, দৈহিক শক্তির অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক যে ‘কলে ছাঁটা শিক্ষা’, সেখানেও তার অবস্থান সকলের শেষে। এহেন হেরে যাওয়া মানুষটির পাশে এসে দাঁড়ায় ডোরেমন। নোবিতাকে যুগোপযোগী 'চতুর' করে তুলতে ডোরেমন বাইশ শতক থেকে এসেছে। কিন্তু আমরা ক্রমশ দেখতে পাই, এই বাইশ শতকের রোবটটি 'হেরো' নোবিতার অভিন্ন হৃদয় (রোবটের হৃদয় হয় না, তবুও তাকে মানবিক করে তোলাই ফুজিওর উদ্দেশ্য) বন্ধু হয়ে ওঠে। আমরা দেখেছি নোবিতা ছিল সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তার অত্যধিক 'ঘুমে চোখ বুজে থাকা', যেন এই বহমান অশান্ত পৃথিবীর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা। তার বুকের মধ্যে একটি মেয়ের জন্য ভালবাসা আছে, কিন্তু মনে মনে সে জানে এই বস্তুকেন্দ্রিক পৃথিবীতে বোধ হয় ভালবাসা বলে আর কিছু হয় না! তবুও সে ভালবাসে। নোবিতা পৃথিবীকে ভালবাসতে জানে। আমরা অধিকাংশ গল্পেই দেখতে পাই, নোবিতা তার সমাজে যতটা উপেক্ষিত, প্রকৃতির কাছে সে ততটাই সমাদৃত। যেকোনো মনুষ্যেতর প্রাণীর প্রতি তার সহানুভূতি রয়েছে, ভিতর থেকে প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা সে অনুভব করে। যাকে ‘ধুরন্ধর’ বানানোর জন্য ডোরেমনকে পাঠানো হয়েছে, সেই রোবটটিও নোবিতার ভিতরের নোবিতাকে চিনতে চিনতে কোথাও যেন সমব্যথী হয়ে ওঠে এই ‘মানবিক’ চরিত্রের প্রতি। অর্থাৎ লক্ষনীয় বিষয় হলো, বাইশ শতকের একটি রোবটের কাছে নোবিতাকে আবিষ্কার করা কিন্তু আসলে ভবিষ্যতের একটি যান্ত্রিক মস্তিষ্কের মধ্যে ইতিহাস চেতনার সঞ্চার করা। মানুষের বিবর্তনের সাক্ষী হওয়া। কারণ যে সমাজ থেকে ডোরেমন এসেছে—অর্থাৎ নোবিতার পরবর্তী দুই প্রজন্মের পরের পৃথিবী—সেখানে যন্ত্র আর মানুষের স্বাভাবিক সহাবস্থান রয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের ঠিক আগে, অর্থাৎ আইটি এবং ডিজিটাল যুগের শুরুর মুখে দাঁড়িয়ে, সমাজ-সংজ্ঞায়িত এক ‘ক্যালাস’ কিশোরকে ডোরেমন রোজ নিরীক্ষা করে চলেছে।
প্রায় প্রতিটা গল্পের স্টোরিলাইনেই আমরা দেখি, এগজিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিসে ভোগা (যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে এসে গেছে) এই কিশোরটিকে ক্রমশ ডোরেমনের গ্যাজেটের উপরেই নির্ভরশীল করে তোলা হয়। এটাও আজকের সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ। কারণ একুশ শতকের ইয়ুথ যখন ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে অস্থির হয়ে আছে, তখন সেও নোবিতার মতোই ক্যালাস। যে সমাজ থেকে সে কিছু পাচ্ছে না, সেই সমাজের প্রতি তার একই সঙ্গে নিরাসক্তিভাব ও ‘অ্যাঙ্গার’ কাজ করছে। তখন সে মুখোমুখি হচ্ছে কোনো এ.আই অ্যাপলিকেশনের। শুরু হচ্ছে মানুষ ও যন্ত্রের ভাব বিনিময়। ডোরেমন আর নোবিতা আসলে এই ভাব বিনিময়ের একটা মডেল, যারা আগামীর দৈনন্দিনতাকে তুলে ধরে।
তবে তারা সেখানেই থেমে থাকে না। ফুজিকো ফুজিও কতকগুলি শুভ বোধ আর আশাবাদী বিশ্বাসের কাছে আমাদের নিয়ে যেতে চান। আমরা ডোরেমনের বড় গল্পগুলির দিকে যদি তাকাই, লক্ষ্য করব কীভাবে একটা গোটা জাতির উত্থান ও পতনকে বারংবার সমীক্ষা করতে চাওয়া হয়েছে। কীভাবে একজন রোবট (ডোরেমন) এর মুখ দিয়েই উচ্চারণ করানো হয়েছে মানুষের জয়গান, মানবতার জয়গান। ডিজিটাল রেভোলিউশনকে ব্যবহার করে যেভাবে ক্ষমতার কুক্ষীকরণ সম্ভব, ডোরেমনের সংলাপ সেই সমস্ত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার। আর মানবিক মুখ সেখানে ইঁদুর দৌড়ে হেরে যাওয়া নোবিতা। মনে করুন স্টিল ট্রুপস, টিন ল্যাবিরিন্থ বা লিটল স্টার ওয়ার্সের মতো বড় গল্পগুলির কথা। কম বেশি প্রায় প্রতিটা গল্পেই ক্ষমতার অপব্যবহার রয়েছে, এবং সেই একনায়কতন্ত্রতার বিরুদ্ধে ইস্তেহার রয়েছে। ডোরেমন আর নোবিতার পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও তাদের যৌথ অভিযান আসলে সময়ের সাথে প্রযুক্তির বিপ্লবের পাশাপাশি মানুষের সুস্থ বিকাশকে নিশ্চিত করার বার্তা দেয়। মানুষ আর যন্ত্রের কো-এগজিস্টেন্সের দিন আসছে ঠিকই, কিন্তু সেইদিনের জন্য যেন মানুষের সুস্থ মানবিক জীবনবোধের ধারাটি অক্ষুণ্ণ থাকে। ফুজিকো ফুজিও হয়তো ভালবাসাহীন ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারেন না। তাই বিশ্বাসহীনতার যুগেও তিনি বারবার বন্ধুর প্রতি বন্ধুর বিশ্বাস এবং প্রেমের প্রতি আস্থাকে এই কমিক্স সিরিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছেন। ডোরেমনের গল্পগুলো যন্ত্রনির্ভর ভবিষ্যৎ পৃথিবীটাকে মানবিক মূল্যবোধেই পূর্ণ দেখতে চায়।







