অমিল প্রাপ্য বোনাস, ছুটি! অন্যের বাড়ির বাসন সামলে যেভাবে কাটে পরিচারিকাদের পার্বণ
Durgapuja 2022 of maids: কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে! তাই পাড়ার মণ্ডপে প্রতিমার আরাধনা শুরু হলেও সুচিত্রা, রানি, আলোদের কাজ থামেনি, কাজ চলেছে নিজের ছন্দে, উৎসব চলেছে নিজস্ব তালে।

কাকভোরে উঠে বাড়ির কাজ কোনওরকমে সেরেই ছুটতে হয় কাজের বাড়ি। নাহলে ওই বাড়ির মানুষগুলো খাবে কী! অন্য আরেক বাড়িতে বাসন মেজে, ঘরদুয়ার পরিষ্কার করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর দেড়টা দুটো বেজেই যায়। টাইমের কলের জল। তাই বাড়ি ফিরে দু’দণ্ড বিশ্রাম না নিয়েই সারতে হয় ছড়িয়ে থাকা সংসারের সমস্ত কাজ। এভাবেই দিন কাটে আলো দাসের। দুর্গাপুজোর ক’টা দিন রান্নার বহর বাড়ে। ফাইফরমাশ মতো রান্না করে বিকেলে আর শরীর দেয় না প্যান্ডেল ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখার। তাই পুজোর দিনগুলোতে ছুটে যান ছোট্ট নাতির মুখ দেখতে। “একার পেট তাই কোনওভাবে কেটে যায় দুর্গাপুজো”, বলেন আলো।
দুপুর সাড়ে বারোটা। চার বাড়িতে কাজ সেরে এসে খানিক বসেছেন রানি বড়ুয়া। মেয়েকে সকালে স্কুলে পাঠিয়ে, সংসারের যাবতীয় সেরে কাজে যেতে প্রায় ন’টা বেজে যায়। স্বামী, শাশুড়ি, মেয়ে আর তিনি- পরিবার বলতে এই চারজন। আজ প্রায় ন’বছর ধরে পরিচারিকার কাজ করেন রানি। বাড়ির কাছেই এক বাড়িতে রান্না, দু’বাড়ির বাসন মেজে আর একটি বাড়িতে ঘর পরিষ্কার করে বেলায় বাড়ি ফেরেন। পুজোর সময় তিন বাড়িতে নবমী দশমী ছুটি দিলেও যে বাড়িতে রান্না করেন তাঁরা ছুটি দিতে নারাজ। ছুটি চাওয়ায় উল্টে বলেছেন, “তুমি না এলে পুজোর দিনগুলো আমরা খাবো কী?” তাই পুজোর দিনগুলোতেও অগত্যা কাজে যেতে হয়েছে তাঁকে। তাহলে পুজোতে ঠাকুর দেখা? তাঁর কথায়, “শুধুমাত্র নবমীতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলাম। অন্যদিন যেমন কাজ করতে যাই তেমনই গেছি।” পুজোর বোনাসের কথা উঠতেই অভিযোগের সুরে বলতে শুরু করেন রানি, “চার বাড়ির দুই বাড়িতে যা মাইনে সেই টাকাই বোনাস হিসেবে পেয়েছি। একবাড়িতে তিন হাজার টাকা মাইনে কিন্তু বোনাস দিয়েছে দু’হাজার টাকা। তাঁরা বলছেন আমরা কোথায় পাবো?” অন্য আরেকজন মাস মাইনে দিলেও পুজোর প্রাপ্য বোনাস এখনও দেননি। তবে রানি বড়ুয়ার কথায়, “বলেছে এই মাসেই বোনাস দিয়ে দেবে। দুটো আলাদা আলাদা দেবে বলেছে।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Lakshmi Puja Pattachitra: ত্রয়োদশ শতকে পটশিল্প বিস্তার লাভ করেছিল। আরও পরে পনেরো শতকে গাজীর পট জনপ্রিয় হয়েছিল। ষোড়শ শতকে চৈতন্যদেবের বাণী প্রচারের জন্য পটের ব্যবহার হত।
সোনারপুর অঞ্চলের ক্ষুদিরাম পল্লীর বাসিন্দা সুচিত্রা মাইতি। সকাল পাঁচটায় সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যান কাজের জন্য। সাইকেল করে কাজের বাড়ি পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট। তিন বাড়ির কাজ সেরে তবে বাড়ি ফেরেন। সব বাড়িতেই একবেলা করে কাজ করেন সুচিত্রা। পুজোর সময় সব বাড়ি থেকেই তিনদিন করে ছুটি পেয়েছেন। ষষ্ঠী, অষ্টমী আর দশমী- এই তিনদিন তাই পুজোর আনন্দ গা ভাসিয়েছেন। “কাজের বাড়ি থেকে আমাকে বলেছিল ছুটি নিতে কিন্তু আবার তো লক্ষ্মীপুজোতে ছুটি নিতে হবে। তাই আর ছুটি নিই নি,” দ্বিধাহীন গলায় বলে যান সুচিত্রা। তবে বাকি দিনগুলো আর পাঁচটা দিনের থেকে আলাদা কিছুই নয়। সুচিত্রার কথায়, “ষষ্ঠীর দিন যেমন সন্তানের জন্য পুজো করতে হয় তেমন করেছি। সন্ধ্যেবেলা ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছি। অষ্টমীতে অঞ্জলি দিয়েছি। আর দশমীতে তো পাড়ায় সিঁদুর খেলেছি।” আর অন্যান্য দিনগুলোতে কাজ সেরে বাড়িতে রান্না করে সন্ধ্যেবেলা ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন পরিবারের সঙ্গে। প্রাপ্য বোনাসের কথা উঠতেই বেশ আনন্দের সঙ্গে সুচিত্রা ইনস্ক্রিপ্টকে জানালেন, “যে বাড়িগুলিতে কাজ করি তাঁরা পুজোতে বোনাসও দিয়েছে আবার নতুন শাড়িও দিয়েছে। এমনকী বিজয়া দশমীর পর মিষ্টির প্যাকেটও দিয়েছে।”
পুজোর দিনগুলিতে ঠাকুর দেখতে যাওয়া বা পাড়ার মণ্ডপে বসে আড্ডা দিতে কে না পছন্দ করেন! তাই গৃহকর্ত্রীরাও কোনওরকমে রান্নাটুকু সেরে বেরোতে পারলেই স্বস্তি বোধ করেন। এ প্রসঙ্গে পরিচারিকাদের অধিকার রক্ষায় ‘সেবা’ সংগঠনের কর্মী মৌমিতা চক্রবর্তী বলেন, “পুজোর সময় পরিচারিকাদের ছুটি নিয়ে একটা সমস্যা আজও রয়েছে। উল্টে এসময় কাজ আরও বেড়ে যায়। তবে এতদিন ওঁদের কাজের বোনাসের দিকটা নিশ্চিত করা গেছে। অন্তত ৬০ শতাংশ পরিচারিকা বোনাস পাচ্ছেন। অনেকেই অর্ধেক টাকা দেন বা একটা শাড়ি ধরিয়ে দেন, এটা কিন্তু কোনওভাবেই ওঁদের চাহিদা নয়। তবে যেখানে কাজ করতে হয় সেখানে মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলে কোনও একটা দিন ছুটি নেওয়ার চেষ্টা করেন বা দু’বেলার পরিবর্তে একবেলা কাজ করেন।” “তবে এক্ষেত্রে অনেক সময়েই দেখা যায় বোনাসের ভয়ে পুজোর মাসখানেক আগে অনেকেই পরিচারিকাদের কাজ ছাড়িয়ে দেন। সোজাসুজি জানিয়ে দেন আর এখন লোকের দরকার নেই আমাদের,” জানান মৌমিতা চক্রবর্তী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Lakshmi Puja 2022: শত অন্ধকার সত্ত্বেও সঠিক রাস্তা খুঁজে বার করতে পারে পেঁচা। এই কারণেই পেঁচাকে মনে করা হয় জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার প্রতীক। এই সমস্ত গুণাবলীর কারণে লক্ষ্মী বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছেন পেঁচাকে।
‘সেবা’ সংস্থা মুর্শিদাবাদের বহরমপুর, লালগোলা এলাকাতে বহুকাল ধরেই কাজ করেছে। সদ্য দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুর এলাকাতেও কাজ শুরু করেছে। নিউ আলিপুর এলাকাতেই পরিচারিকাদের পুজোর আগে কাজ ছাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করেছে এই সংস্থা। তবে বহরমপুরে এই ঘটনা খুবই কম। তাঁর কথায়, “আমরা বহরমপুরে ‘মাই ফেয়ার হোম’ নামে একটা ক্যাম্পেইন করি। তাতে পরিচারিকা এবং মালিক পক্ষের মধ্যে সমস্যা থাকলে সামনাসামনি কথা বলার সুযোগ রয়েছে। তাই ছাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা এখানে অনেকটা কম।” তবে কাছাকাছি এলাকা থেকে যাঁরা কাজে আসেন তাঁরা যে ন্যায্য মজুরি পান না একথা তিনিও মেনে নিয়েছেন। ঠিক এমনটাই কলকাতার বুকে ঘটে চলেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহু মহিলাই প্রতিদিন কলকাতায় আসেন কাজের খোঁজে। তাঁদের অনেকেই পেট চালানোর তাগিদে কম মাইনের কাজেই ঢুকে পড়েন। সারাদিনের চরম খাটনির পরে ট্রেন ধরে ফিরে যান বাড়ি। পুজোর সময়ও ছুটি নেই। সন্তান, স্বামী, পরিবারের সদস্যরা হাঁ করে বসে থাকেন উৎসবের দিনে একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারার আশায়।
কলকাতার ‘পরিচিতি’ সংস্থার কর্মী কাকলি দেবের কথাতেও উঠে এল একই কথা। পুজোর দু’ একমাস আগে থেকেই খবর আসে পরিচারিকাদের কাজ ছাড়িয়ে দেওয়ার। তাঁর কথায়, “এখন পরিচারিকাদের মধ্যে বোনাস নিয়ে কোনও দ্বিধা বোধ নেই, বরং পরিষ্কারভাবেই সেকথা বাড়ির মালিককে জানিয়ে দেন। আগের বছর লকডাউনের কারণে অনেকেই বোনাস পাননি। তবে এবছর কিন্তু তেমন ঘটনা খুব বেশি আমাদের কাছে আসেনি। আমরা এমন ঘটনার কথা জানতে পারলে খোঁজ নিয়ে দেখি, কিছু বাড়ির মানুষদের এমন প্রবণতার ইতিহাস রয়েছে। অর্থাৎ এর আগেও তেমন কাজ ঘটিয়েছেন। আর ছুটির বিষয়টা অনেকটা বোঝাপড়ার দিক থেকে কাজ করে। মানে একদিন দু’দিন বা একবেলা কাজ করে চেষ্টা করেন ছুটি নেওয়ার।”
সারাদিন সংসার, পরিবার, অন্যের বাড়ির কাজ সেরে পুজোর আনন্দের কাছে হার মানে পেটের খিদে। কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে! তাই পাড়ার মণ্ডপে প্রতিমার আরাধনা শুরু হলেও সুচিত্রা, রানি, আলোদের কাজ থামেনি, কাজ চলেছে নিজের ছন্দে, উৎসব চলেছে নিজস্ব তালে।








