ক্লাব-দেশের জার্সিতে ঠাঁই পাননি বহুদিন, 'আপনা টাইম আয়েগা' মন্ত্রেই বিশ্বাসী ছিলেন এমি মার্তিনেজ
Emiliano Martinez Argentina : আপনা টাইম আয়েগা। বারবার নিজের জীবনে এই মন্ত্রটাই আউড়েছেন ওই গোলরক্ষক, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।

২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গালি বয়’-এর একটি ডায়লগ, এবং একটি গান গোটা ভারতেই বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘আপনা টাইম আয়েগা’ যেন প্রতিটা হেরে যাওয়া মধ্যবিত্ত, পিছিয়ে থাকা মানুষদের মন্ত্র হয়ে গিয়েছিল। মুম্বই থেকে বহু দূরে ইংল্যান্ডের এমিরেটস স্টেডিয়ামেও কি সেই একই মন্ত্র বেজেছিল? জানা নেই। তবে ‘গালি বয়’-এর মুক্তির মাত্র দু’বছর আগে, ২০১৭ সালে ফেসবুক এরকমই একটি পোস্ট দেখেছিল। ফুটবল মাঠে প্র্যাকটিস হচ্ছে, সেখানেই বলের ওপর বসে আছেন এক তরুণ গোলরক্ষক। শরীরী ভাষায় একটু যেন হতাশার ছাপ, কিন্তু চোখ দু’টো উজ্জ্বল। ছবিটির ক্যাপশনে ওই ফুটবলার লিখেছেন, “আমারও দিন আসবে”। আপনা টাইম আয়েগা। বারবার নিজের জীবনে এই মন্ত্রটাই আউড়েছেন ওই গোলরক্ষক, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
২০১৭-র পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। টেমস, অ্যামাজন দিয়ে অনেক জলও গড়িয়েছে। সেদিনের এমি আজ ৩০ বছরের তরতাজা জোয়ান। আরও চনমনে, আরও ক্ষুধার্ত; এবং আরও বিতর্কিত। অবশ্য তাতে আর কিছু যায় আসে না তাঁর। এমির এক হাতে রয়েছে গোল্ডেন গ্লাভ, আরেক হাতে বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর খেলা মুগ্ধ করেছে ফুটবল বিশ্বকে। মাত্র কয়েক বছর আগেও তাঁকে কেউ চিনত না। খবরের শিরোনামে জায়গা পাওয়া দুরস্ত। সেই এমি মার্তিনেজই এখন লাইমলাইটের নিচে। এমবাপেকে নিয়ে ব্যঙ্গ, গোল্ডেন গ্লাভ পাওয়ার পর মঞ্চে দাঁড়িয়ে ওইরকম আচরণ – এর জন্য সমালোচিতও হচ্ছেন। কিন্তু এমি রয়েছেন এমিতেই। এই মুহূর্তগুলোর জন্য এতো দিনের অপেক্ষা। রক্ত জল করা পরিশ্রম।
মার ডেল প্লাটার ছেলেটা ছোট থেকেই ফুটবলের ভক্ত ছিল। আর্জেন্টিনায় ইন্ডিপেনডিয়েন্তের হয়ে একসময় খেলত তাদের স্নেহের ‘ডিবু’। ১৭ বছরের জন্মদিন সমস্ত কিছু বদলে দিল। এমির জন্য সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ডাক এল। বিশ্বখ্যাত ক্লাব আর্সেনাল তাঁকে ট্রায়ালের জন্য ডাকছে, এটা প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি এমি মার্তিনেজের। ইয়ুথ কনট্র্যাক্টে সইও করেন। আর সেখান থেকেই লড়াইটা শুরু। এই লড়াই নিজেকে প্রমাণ করার। এই লড়াই হতাশার, ফিনিক্স হয়ে জিতে আসার স্বপ্ন দেখার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
FIFA World Cup 2022 : ২০২২-এই ছাপিয়েছেন মারাদোনা আর বাতিস্তুতাকে। এরপরও সর্বকালের সেরা তকমা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হবে মেসিকে?
এখন মাঠে এমি মার্তিনেজের পারফরমেন্স দেখে ফুটবল বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ছেলেটির আত্মবিশ্বাস দুর্দান্ত। নিজের প্রতি, নিজের দক্ষতার প্রতি এবং দলের অন্যান্য খেলোয়াড়দের প্রতি তাঁর বিশ্বাস তুঙ্গে। সেই ছাপই পড়ে তাঁর খেলায়। আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স, তার ওপর বিশ্বকাপ ফাইনাল। ফাইনালের পেনাল্টি শ্যুট আউটের পাহাড়প্রমাণ চাপেও এমির খেলা ছিল একেবারে নিজের মতো। বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করা, অঙ্গভঙ্গি হোক বা কথা যে কোনও প্রকারে পরিস্থিতি নিজের দিকে নিয়ে আসা – টাই ব্রেকারে এমি মার্তিনেজ মানেই এমন ছবি। শট বাঁচিয়ে দেওয়ার পর তাঁর সেলিব্রেশন এবং আর্জেন্টিনার দর্শকদের সঙ্গে মেলবন্ধনও দেখার মতো। ফাইনালের শ্যুট আউটে তাঁকে হলুদ কার্ডও দেখান রেফারি। তবুও এতটুকুও ঘাবড়াননি তিনি। আগেই বলেছিলেন, মেসির জন্য বিশ্বকাপ জিততে হবে। তারজন্য প্রয়োজনে নিজের জীবনও দিয়ে দেবেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
FIFA World Cup 2022 : আলো এখন আরও বেশি উজ্জ্বল। আর্জেন্টিনা যেন দিশাহারা হয়ে গিয়েছে। একটাই মন্ত্র, মেসি! মেসি! মেসি!
এই তুমুল কনফিডেন্স, নিজের দক্ষতার প্রতি এই বিশ্বাস, এই সাহস একদিনে আসেনি। বরং পরিস্থিতি এমিকে তৈরি করে নিয়েছে। ১৭ বছর বয়সে আর্সেনালে যোগ দেওয়ার পর জীবনটা একেবারে বদলে যেতে পারত। বদলে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তখন সেই জল বইছিল একেবারে অন্য খাতে। অন্যান্য ছোট দলগুলিতে লোনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এমি মার্তিনেজকে। অক্সফোর্ড ইউনাইটেডের হয়ে খেলছেন তিনি, ভবিষ্যৎ আদৌ আছে কিনা জানেন না। পরে আর্সেনালে ফিরে এলেও তাঁর বরাবরের জায়গা ছিল ডাগ আউটে। সেজনি, ফাবিয়ান্সকি, পরের দিকে পিটার চেক, ওসপিনা, লেনোর মতো গোলরক্ষকদের ভিড়ে হারিয়ে যেতে থাকেন এমি। তার মধ্যেই দু’বার আর্সেনালের জার্সি গায়ে দেন। লিগ কাপে রিডিং আর কোভেন্ট্রি সিটির বিরুদ্ধে গোলের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন এমি মার্তিনেজ। কিন্তু তারপর ফের লোনে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হল অন্য ক্লাবে।
প্রায় ৭-৮ বছর এমন ছবিই দেখে এসেছেন এমি মার্তিনেজ। জাতীয় দলের হয়েও ডাক পাচ্ছেন না। তাঁর হিরো মেসি তখন ফুল ফোটাচ্ছেন। গোলের নিচে রোমেরো, আরমানি। এমি মার্তিনেজের নামটাও ঠিকভাবে শোনেনি ফুটবল বিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে যে কোনও ফুটবলারের মনোবল ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু হল ঠিক উল্টোটা। এই পরিস্থিতিই তৈরি করল আজকের এমি মার্তিনেজকে। প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিস আর প্র্যাকটিস। নিজের চেষ্টায়, নিজেকে প্রমাণ করার পরিশ্রমে এতটুকুও ঘাটতি রাখেননি তিনি। বিশ্বাস রেখেছিলেন, আর্জেন্টিনা আর আর্সেনালের গোলপোস্টের নিচে একদিন তিনি দাঁড়াবেনই। তখন দেখিয়ে দেবেন বিশ্বকে। আপনা টাইম আয়েগা…
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Emiliano Martinez Argentina: বিশ্বকাপের ফাইনালে আগে এই মার্টিনেজ বলেছিলেন, "এমবাপের ফুটবল জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে।"
এবং, একদিন এলও। ২০১৯-২০ মরসুম বদলে দিল এমি মার্তিনেজকে। সেই সময় আর্সেনালের প্রথম পছন্দ ছিল গোলরক্ষক বার্নড লেনো। কিন্তু তিনি চোট পেয়ে যাওয়ায় মার্তিনেজের দরজা খুলে যায়। প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের হয়ে মাঠে নামেন, এবং দুরন্ত পারফরমেন্স করেন। কমিউনিটি শিল্ডে শক্তিশালী লিভারপুলকে পেনাল্টি শ্যুট আউটে থামিয়ে দেন তিনি। এবং সামনে আসে এফএ কাপ ফাইনাল। উল্টোদিকে চেলসি। অভূতপূর্ব কিছু সেভ করলেন এমিলিয়ানো। শেষমেশ চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপ জিতল আর্সেনাল। কান্নায় ভেঙে পড়লেন এমি। মাঠের মধ্যেই বসে পড়েন। হল তাহলে! স্বপ্ন পূরণ হল!
কিন্তু তখনও অনেকে এমিকে চিনত না। লেনো চোট সারিয়ে ফিরে আসার পর ফের ডাগ আউটে চলে যান আর্সেনাল। এমি ঠিক করলেন, এভাবে হবে না। ক্রমাগত ম্যাচে না খেললে তিনি তৈরি হতে পারবেন না। আর্সেনাল ছেড়ে চলে গেলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আরেকটি ক্লাব অ্যাস্টন ভিলায়। সেখানে গিয়েই দুর্ধর্ষ পারফরমেন্স উপহার দিলেন। অ্যাস্টন ভিলার ফ্যানদের কাছে এমি ‘ডিবু’ মার্তিনেজ তখন প্রিয় একটি নাম। একটি মরসুমে ১৫টি ক্লিন শিট করে ব্র্যাড ফ্রিডেলের রেকর্ডও স্পর্শ করলেন।
কিন্তু এত সবের মাঝে তিনি লক্ষ্য করলেন না, দূর থেকে আরও একজন তাঁর দিকে সমানে নজর রেখে যাচ্ছেন। তিনি লিওনেল স্কালোনি। আর্জেন্টিনার যে খেলোয়াড়রা বিদেশের অন্যান্য ক্লাবে ভালো খেলছেন, তাঁদের দিকে নজর রেখেছিলেন নীল সাদা ব্রিগেডের কোচ। এমি মার্তিনেজকে দেখে তাঁকে দলে ডেকে নেন স্কালোনি। জাতীয় দলে সুযোগ পেলেন ২০১৯ সালে।
তারপর ২০২১। ফিফা বিশ্বকাপ যোগ্যতা নির্ধারণের ম্যাচ থেকে কোপা আমেরিকা – এমি নিজের জাত চেনালেন। কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টি বাঁচালেন, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ফাইনালে দুরন্ত খেলা – এই প্রথম এমিকে ব্যাপকভাবে চিনল বিশ্ব। আর আজ? আজ তিনি ইতিহাসের অঙ্গ। আর্জেন্টিনার ভক্তরা বলছেন, বহুদিন পর দেশ এমন একজন গোলরক্ষক পেল। যিনি অপ্রতিরোধ্য, বিতর্কিত, হার না মানা, প্রবল আত্মবিশ্বাসী এক দস্যি। এক পাগল। ‘আপনা টাইম আয়েগা’ – এমি, শুনতে পাচ্ছেন আপনার সেই মন্ত্র?







