ইউরোপে আগুন ঝরছে আকাশ থেকে! রেকর্ড ভাঙা দাবদাহে মৃত ১৩০০-এর বেশি
Europe Heat Wave: খালি চোখে একে সাধারণ গরম মনে হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন—এ হলো গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর ফল। প্রকৃতি যেন এবার এক চরম সতর্কতা জারি করল।
ইউরোপ বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মনোরম আবহাওয়া, বরফে ঢাকা পাহাড় কিংবা চমৎকার সব ঐতিহাসিক শহর। তবে এই মুহূর্তে আপনি যদি ইউরোপে বেড়াতে যান, তাহলে দেখতে পাবেন ছবিটা কিন্তু একেবারে উল্টো। এক রেকর্ড ভাঙা ভয়ঙ্কর দাবদাহে পুড়ছে পুরো পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপ। তীব্র গরমে ইতিমধ্যেই বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের থার্মোমিটারে পারদ এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যা ইউরোপের ইতিহাসে এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
খালি চোখে একে সাধারণ গরম মনে হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন—এ হলো গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর ফল। প্রকৃতি যেন এবার এক চরম সতর্কতা জারি করল।
এবারের গরমের তীব্রতা বোঝাতে কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক তাপমাত্রার দিকে নজর দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে:
জার্মানি: দেশের আবহাওয়া দপ্তরের (DWD) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার পূর্ব জার্মানির 'ড্রেউইটজ' স্টেশনে তাপমাত্রা পৌঁছয় ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কিন্তু প্রকৃতির তাণ্ডব এখানেই থামেনি। এর ঠিক দু-দিন পরেই, ২৮ জুন 'কোশেন' (Coschen) এলাকায় তাপমাত্রা পৌঁছয় ৪১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
যুক্তরাজ্য (UK): সাধারণ গরমেই যেখানে ব্রিটিশদের নাভিশ্বাস ওঠে, সেখানে এবার টানা তিন দিন ধরে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙল। দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের সাফোকের 'স্যান্টন ডাউনহাম'-এ তাপমাত্রা ৩৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকে। এর আগে ১৯৭৬ সালে জুন মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হয়েছিল ৩৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে টিকে থাকা সেই রেকর্ড এবার ভাঙল।
চেক প্রজাতন্ত্র ও ডেনমার্ক: চেক প্রজাতন্ত্রের 'ডোকসানি'-তে তাপমাত্রা ৪০.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে ডেনমার্কেও পারদ ছুঁয়েছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৮৭৪ সালের পর অর্থাৎ গত দেড়শো বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে গরম দিন!
অন্যান্য দেশ: ফ্রান্স, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, পোল্যান্ড কিংবা হাঙ্গেরি—সব দেশেই তাপমাত্রা এখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। অবস্থা এতটাই খারাপ যে, ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রক রোম, মিলান, ভেনিস ও ফ্লোরেন্সসহ ১৮টি বড় শহরে 'রেড অ্যালার্ট' বা সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
কেন এই অস্বাভাবিক গরম?
হঠাৎ করে ইউরোপের আকাশ এত আগুন ঢালছে কেন? আবহাওয়াবিদরা এর পিছনে 'ওমেগা ব্লক' (Omega Block) নামের একটি বিশেষ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে দায়ী করছেন। গ্রিক অক্ষর ওমেগা (Ω)-র মতো দেখতে একটি বায়ুমণ্ডলীয় অবয়ব তৈরি হয়েছে ইউরোপের আকাশে। এটি একটি বিশাল গরম বাতাসের কুণ্ডলী বা বেলুনকে নির্দিষ্ট কিছু দেশের উপর শক্ত করে আটকে রেখেছে। ফলে ভিতরের গরম বাতাস বাইরে বেরোতে পারছে না, আর বাইরের ঠান্ডা বাতাসও ভিতরে ঢুকতে পারছে না। দিনের পর দিন এই গরম বাতাস একই জায়গায় স্থির থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, আজ থেকে মাত্র কুড়ি বছর আগেও জুন মাসে রাতের বেলা এমন দমবন্ধ করা গরম থাকার কথা কেউ ভাবতেই পারত না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Europe heatwave 2026: শীতপ্রধান ইউরোপে হঠাৎ এত ভয়াবহ তাপপ্রবাহ কেন? কেন প্যারিসের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছেছে? জেট স্ট্রিম, ওমেগা ব্লক, সাহারা থেকে আসা উষ্ণ বাতাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে কী সম্পর্ক?
চিত্রঋণ: সুরভি মজুমদার
বাড়ছে মৃত্যু
এই তীব্র দাবদাহে সবচেয়ে বেশি খেসারত দিতে হচ্ছে মানুষকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং স্থানীয় রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২১ জুনের পর থেকে তীব্র গরমে ইতিমধ্যেই ইউরোপ জুড়ে ১৩০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়েছে। এদের মধ্যে একটা বড় অংশই শিশু এবং বয়স্ক মানুষ। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর এসেছে ফ্রান্স ও ইতালি থেকে।
গরমের চোটে ইউরোপের চিরপরিচিত পরিকাঠামোও ভেঙে পড়ার মুখে।
তীব্র রোদে পিচের রাস্তা ফেটে যাচ্ছে, ট্রেনের লাইন বেঁকে যাচ্ছে।
ঝুঁকি এড়াতে জার্মানির জাতীয় রেল সংস্থা 'ডয়চে বান' দূরপাল্লার যাত্রীদের বিনামূল্যে টিকিট বাতিল করার সুযোগ করে দিয়েছে।
ফ্রাঙ্কফুর্টের বিখ্যাত 'আয়রনম্যান ট্রায়াথলন'-এর মতো আন্তর্জাতিক খেলাধুলার প্রতিযোগিতাও ছোট করে দিতে বাধ্য হয়েছেন আয়োজকরা।
বহু জায়গায় ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দর্শনীয় স্থানগুলি বন্ধ রাখা হয়েছে। পর্যটনের মরসুমেও রাস্তাঘাট ফাঁকা।
সাধারণ ঘরবাড়ি যেন 'উনুন'
ইউরোপের এই তীব্র গরমে কষ্টের পিছনে আর একটি বড় কারণ হলো ওখানকার বাড়িঘর তৈরি করার কৌশল। বিশেষ করে উত্তর ইউরোপের ঘরবাড়িগুলি এমনভাবে তৈরি, যাতে শীতকালে ভিতরের গরম ভাবটা বাইরে বেরিয়ে যেতে না পারে। অর্থাৎ, এই বাড়িগুলি ঘরের ভিতরে তাপ ধরে রাখে।
যেহেতু সেখানে গরমের দিন খুবই কম থাকে, তাই সাধারণ মানুষের বাড়িতে না থাকে এসি, না থাকে ভালো ফ্যান। এখন যখন বাইরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি পার করে যাচ্ছে, তখন ওই বাড়িগুলি যেন উনুন হয়ে উঠেছে। ঘরের ভিতরের মানুষগুলি আক্ষরিক অর্থেই সেদ্ধ হচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে এশিয়ার এসি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি থেকে হুহু করে এসি এবং ফ্যান আমদানি করা হচ্ছে ইউরোপে।
বিপন্ন চাষবাস, শুকোচ্ছে নদী
এই দাবদাহের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে কৃষিক্ষেত্রে। জুন মাস হলো ফসলের বেড়ে ওঠার সময়। কিন্তু জলশূন্যতা আর ৪০ ডিগ্রির উপর তাপমাত্রার কারণে মাঠের ফসল মাঠেই শুকিয়ে যাচ্ছে।
ফসলের ক্ষতি: ভুট্টা, সূর্যমুখী, সয়াবিন, আলু আর টমেটোর মতো গ্রীষ্মকালীন ফসলগুলি গরমে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত তাপে লেটুস বা ব্রাসিকা জাতীয় সবজি অকালে পেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা আর বাজারে বিক্রি করার যোগ্য থাকছে না।
নদীর জলস্তর হ্রাস: ইতালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ 'পো' (Po) নদী তীব্র গরমে শুকিয়ে কাঠ। ফলে চাষের জমিতে জল দেওয়ার কোনো উপায় নেই। দক্ষিণ ফ্রান্সেও মাটির আর্দ্রতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছে। স্পেন ও ফ্রান্সে গমের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পশুপালনে ধাক্কা: অতিরিক্ত গরমে গরু, ভেড়া বা মহিষের মতো গবাদি পশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের দুধ দেওয়ার ক্ষমতা কমে গিয়েছে, ওজন কমে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষিক্ষেত্রে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে, কারণ আগামী দিনগুলিতে শাকসবজি ও খাদ্যশস্যের দাম অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে এই চরম দাবদাহ পশ্চিম ইউরোপ থেকে কিছুটা কমতে শুরু করবে। তবে স্বস্তির পাশাপাশি এই বৃষ্টি নতুন চিন্তাও নিয়ে আসছে—শুকনো মাটিতে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হলে বন্যা বা হড়পা বানের মতো দুর্যোগ তৈরি হতে পারে।
তাছাড়া, পশ্চিম ইউরোপ থেকে গরম কমলেও স্বস্তি পাচ্ছে না পুরো মহাদেশ। এই ওমেগা ব্লকের গরম হাওয়া এবার পূর্ব দিকে সরে গিয়ে মধ্য ইউরোপ এবং বলকান অঞ্চলের দেশগুলিকে গ্রাস করতে চলেছে।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর ফলে ইউরোপের মতো উন্নত মহাদেশও যদি প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনার সামনে এভাবে অসহায় হয়ে পড়ে, তবে পৃথিবীর বাকি অংশগুলির জন্য আগামী দিনগুলি যে আরও কতটা কঠিন হতে চলেছে, তা সহজেই অনুমেয়।






