৩০-৫০ লক্ষ টাকায় প্রশ্ন বিক্রি! AIPMT থেকে NEET প্রশ্নফাঁসের এক দশক
NEET timeline: গত এক দশকে AIPMT থেকে NEET—ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলি বারবার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়েছে। কোথায় কী ঘটেছিল, কীভাবে তদন্ত এগিয়েছে এবং কেন দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে এত বড় প্রশ্ন উঠেছে?
দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবনের সামনে— যে দৃশ্য দেখা গেল, তা শুধুই পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে ক্ষোভ নয়। এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর আস্থা হারানো লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর প্রতিবাদ। নিট-সহ একাধিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়েছে। সেই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে অনশনে বসেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক। দীর্ঘ অনশনের পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও আন্দোলনের আগুন থামেনি। প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার একই ঘটনা ঘটছে? কেন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় গত এক দশকের ইতিহাসের দিকে।
ভারতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সঙ্গে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা সরকারি চাকরির স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপই হলো এই পরীক্ষাগুলি। কিন্তু গত এক দশকে বারবার প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা বাতিল, পুনরায় পরীক্ষা এবং তদন্তের ঘটনায় সেই আস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে। ২০১৫ সালের অল ইন্ডিয়া প্রি-মেডিক্যাল টেস্ট (AIPMT) থেকে শুরু করে ২০২৪ এবং ২০২৬ সালের NEET-UG বিতর্ক—একের পর এক ঘটনায় উঠে এসেছে ভারতের পরীক্ষা পরিচালনা ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতা।
২০১৫ সালের AIPMT বা অল ইন্ডিয়া প্রি-মেডিক্যাল টেস্ট কেলেঙ্কারি এই সমস্যাকে জাতীয় স্তরে সামনে নিয়ে আসে। সেই সময় অভিযোগ ওঠে, পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই প্রশ্নপত্র অননুমোদিতভাবে বাইরে পৌঁছে গিয়েছিল। প্রযুক্তির সাহায্যে পরীক্ষার্থীদের উত্তরও পাঠানো হচ্ছিল। তদন্তে একাধিক রাজ্যের যোগসূত্র সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট পরীক্ষাটি বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কয়েক লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে আবার পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল।
এরপর ২০১৬ সালে AIPMT-এর পরিবর্তে চালু হয় ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা NEET। উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশে একক ও স্বচ্ছ ভর্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রথম কয়েক বছর বড় ধরনের বিতর্ক এড়ানো গেলেও ধীরে ধীরে বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে অনিয়ম, ভুয়ো পরীক্ষার্থী এবং অসাধু চক্রের সক্রিয়তার অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে। যদিও সেগুলি সর্বভারতীয় প্রশ্নফাঁসের আকার নেয়নি, তবু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ বা CBSE-র দ্বাদশ শ্রেণির অর্থনীতি এবং দশম শ্রেণির গণিতের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। বহু পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়। যদিও এটি NEET-এর ঘটনা ছিল না, তবুও জাতীয় স্তরের পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে মানুষের আস্থা নড়বড়ে হয়ে যায়। এরপর থেকেই পরীক্ষার নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরদার হয়।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ২০২৪ সালের NEET-UG পরীক্ষা ঘিরে। ৫ মে পরীক্ষা হওয়ার পরপরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসে। বিহারের পাটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ ছিল, কয়েকজন পরীক্ষার্থী আগেই প্রশ্নপত্র পেয়ে গিয়েছিলেন এবং তার জন্য ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। তদন্তে আরও অভিযোগ ওঠে, সংঘবদ্ধ দালালচক্র পরীক্ষার আগের দিন থেকেই প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonam Wangchuk hunger strike: সোনাম ওয়াংচুকের অনশন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে। রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আল জাজিরা, বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান এই আন্দোলনকে কীভাবে দেখছে, দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপ, আইনি লড়াই, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন কীভাবে উঠে এসেছে?
একই সময়ে গুজরাটের গোধরার একটি পরীক্ষাকেন্দ্রেও অনিয়ম ধরা পড়ে। অভিযোগ ছিল, কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা এক শিক্ষক পরীক্ষার্থীদের আশ্বাস দেন যে তারা না জানলেও উত্তর পরে পূরণ করে দেওয়া হবে। তদন্তে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিভিন্ন রাজ্যের পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে এই চক্রের যোগাযোগের তথ্য সামনে আসে।
শুধু প্রশ্নফাঁস নয়, ২০২৪ সালে ফল প্রকাশ নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই ফল প্রকাশ, অস্বাভাবিক নম্বর, একাধিক পূর্ণ নম্বরপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থী এবং গ্রেস মার্কস নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছায়। কেন্দ্র সরকার তদন্তের দায়িত্ব সিবিআইকে দেয় এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির কার্যপ্রণালী নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়। যদিও সুপ্রিম কোর্ট সর্বভারতীয়ভাবে পরীক্ষা বাতিল করেনি, আদালত স্বীকার করে যে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল এবং তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
২০২৬ সালে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। NEET-UG পরীক্ষা হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে বিভিন্ন রাজ্যে সক্রিয় একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান মেলে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি পুরো পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়। পরে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়, যাতে ২০ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী আবার অংশ নেন। পরীক্ষাকেন্দ্রে বিমানবন্দরের মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক যাচাই, মেটাল ডিটেক্টর এবং বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এই পুনঃপরীক্ষা লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর উপর বাড়তি মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অনেকে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েও আবার নতুন করে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন। শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, শুধু প্রশ্নপত্র সুরক্ষিত রাখলেই হবে না, পুরো পরীক্ষা পরিচালনা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
এই ঘটনাগুলির ফলে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা NTA-র ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা পরিচালনা করা। কিন্তু গত কয়েক বছরে প্রশ্নফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, পরীক্ষাকেন্দ্রে অনিয়ম এবং ফল প্রকাশ সংক্রান্ত বিতর্কের কারণে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সমালোচকদের মতে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে মুদ্রণ, পরিবহণ এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছনো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
ভারতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গুরুত্ব এত বেশি যে একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস শুধু একটি পরীক্ষা নয়, লক্ষ লক্ষ পরিবারের স্বপ্নকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। একটি মেডিক্যাল আসনের জন্য কয়েক লক্ষ পরীক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বহু পরিবার বছরের পর বছর কোচিং, পড়াশোনা এবং অন্যান্য খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
গত এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু দোষীদের গ্রেফতার করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবস্থা, কঠোর নজরদারি, প্রশ্নপত্র পরিবহণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, পরীক্ষাকেন্দ্রে আরও কার্যকর তদারকি এবং দ্রুত তদন্ত—এই সব কিছুর সমন্বয়েই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করা সম্ভব। কারণ ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্নফাঁসের এই ঘটনাগুলির মধ্যে একটি মিল রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্তে উঠে এসেছে সংগঠিত চক্রের অস্তিত্ব। কখনও প্রিন্টিং প্রেস, কখনও পরীক্ষা কেন্দ্র, কখনও প্রযুক্তির অপব্যবহার, আবার কখনও অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে। অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন বিক্রি, পরীক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া কিংবা উত্তর সরবরাহ—এমন নানা অভিযোগ প্রায় প্রতিটি বড় কেলেঙ্কারিতেই দেখা গিয়েছে।
প্রতিবারই সরকার তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। কখনও সিবিআই তদন্ত, কখনও বিশেষ তদন্তকারী দল, কখনও নতুন আইন—একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নফাঁস রুখতে কেন্দ্র সরকার কঠোর আইনও এনেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও যদি বারবার একই অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সমস্যার মূল কারণ কোথায়?
এই কারণেই বর্তমান আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষা নিয়ে নয়। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারের লড়াই। তাঁদের দাবি, পরীক্ষা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দোষীদের গ্রেফতার করলেই হবে না, এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্নফাঁসের সুযোগই না থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের পক্ষে কথা বলা ওয়াংচুক মনে করেন, পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।








