না আছে ব্লুটুথ, না আছে ব্যাটারি—মাটির কলসিই হয়ে উঠল শক্তিশালী স্পিকার
Clay Speaker: কোনো তার নেই, কোনো ব্লুটুথ কানেকশন নেই, এমনকী চার্জ দেওয়ারও ঝক্কিও নেই। শুনতে একটু অবিশ্বাস্য হলেও, কেরলের এক প্রতিভাবান শিল্পী ঠিক এই জাদুটিই বাস্তবে ঘটিয়ে দেখিয়েছেন।
ভাবুন তো, একটা মাটির পাত্রে আপনার মোবাইল ফোনটা রাখলেন, আর অমনি চারপাশ গমগম করে উঠল চমৎকার এক বেস-সমৃদ্ধ সুরে! কোনো তার নেই, কোনো ব্লুটুথ কানেকশন নেই, এমনকী চার্জ দেওয়ারও ঝক্কিও নেই। শুনতে একটু অবিশ্বাস্য হলেও, কেরলের এক প্রতিভাবান শিল্পী ঠিক এই জাদুটিই বাস্তবে ঘটিয়ে দেখিয়েছেন।
তিনি সিভাপ্রকাশ কে। কেরলের নিলম্বুরের এই ভূমিপুত্র মাটির তৈরি এক অভিনব স্পিকার বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে, যার নাম দিয়েছেন ‘কালিমান কোলাম্বি’ বা টেরাকোটা অ্যাকোস্টিক অ্যামপ্লিফায়ার।
সিভাপ্রকাশের বড় হয়ে ওঠা মাটির গন্ধ মেখেই। তাঁর বাবা চামি ছিলেন একজন ঐতিহ্যবাহী কুম্ভকার। বাবার চাক ঘুরোনো আর কাদা মাটি থেকে সুন্দর সুন্দর পাত্র তৈরি হওয়া দেখতে দেখতেই কেটেছে তাঁর শৈশব। তবে প্রথম থেকে সিভাপ্রকাশ মৃৎশিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাননি। কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের একটা চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ভিতরের শিল্পী মন কি আর চার দেওয়ালে আটকে থাকে?
বেশিদিন লাগল না বুঝতে যে তাঁর আসল টান তো মাটিতেই। এই রূপান্তরের পিছনে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর দাদা সিভাদাসন, যিনি নিজে একজন প্রোডাক্ট ডিজাইনার। ২০১৭ সালের একটি ক্রাফট এক্সপো সিভাপ্রকাশের চোখ খুলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, মাটির এই চিলতে দলাটার ভিতরে লুকিয়ে আছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। ব্যস, চাকরি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে বসে পড়লেন বাবার সেই চাকার সামনে।
হাতের চেটোয় পুতুল রাজ্য: মিনিয়েচার পটারি
মাটির কাজে নেমে সিভাপ্রকাশ প্রথমেই নিজের দক্ষতার জানান দিলেন ‘মিনিয়েচার পটারি’ বা অতি ক্ষুদ্র শিল্প দিয়ে। মাত্র ৩ মিলিমিটার থেকে ১ সেন্টিমিটার সাইজের পুচকে সব কাপ, প্লেট, জগ কিংবা ছোট্ট ছোট্ট পশুপাখি তৈরি করতে শুরু করলেন তিনি।
এই কাজ যে কতটা কঠিন, তা কেবল একজন শিল্পীই জানেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
House without AC cooling: চেম্বুর এলাকার একটা বাড়ি যেন এক টুকরো ম্যাজিক! বাইরের তাপমাত্রা যখন ফুটছে, এই বাড়িটি তখন কোনো এসি বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই চারপাশের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ঠান্ডা থাকছে।
প্রখর দৃষ্টিশক্তি আর হাতের আঙুলের সূক্ষ্মতম ভারসাম্য ছাড়া এই কাজ অসম্ভব। কোনো ছাঁচ নয়, কাঠ আর বাঁশের বিশেষ কিছু ছোট ছোট টুলস দিয়ে ফ্রি-হ্যান্ডে তৈরি হয় এই একেকটি খুদে শিল্পকর্ম। প্রতিটি পিস তৈরি করতে সময় লেগে যায় কম করে দু’ঘণ্টা। এরপর সেগুলিকে লাল মাটির প্রলেপ দিয়ে ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার চুল্লিতে (কিলন) পোড়ানো হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই পুতুল রাজ্য নিমেষেই ভাইরাল হয়ে যায়, দেশ-বিদেশের সংগ্রাহকদের কাছ থেকে আসতে থাকে বায়না।
‘কালিমান কোলাম্বি’: বিদ্যুৎ ছাড়া মাটির স্পিকার
তবে সিভাপ্রকাশকে আসল খ্যাতি এনে দিয়েছে তাঁর এক অদ্ভুত আবিষ্কার। একদিন তিনি ইন্টারনেটে বাঁশের তৈরি ন্যাচারাল স্পিকারের কথা পড়েন। বাঁশের ফাঁপা অংশ যেভাবে কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই ফোনের আওয়াজকে বাড়িয়ে দেয়, সেটাই তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি ভাবলেন—বাঁশ দিয়ে যদি হয়, তবে মাটি দিয়ে কেন নয়?
যেমন ভাবা তেমন কাজ। শুরু হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অনেকবার ব্যর্থ হলেন, ফোনের আওয়াজ ঠিকমতো ছড়াচ্ছিল না। কিন্তু দমে যাননি তিনি। অবশেষে মিলল সাফল্য। তৈরি হলো ‘কালিমান কোলাম্বি’। দেখতে অনেকটা কলসি বা ফানেলের মতো।
কীভাবে কাজ করে এটি?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর বাড়িতে কোনো ডাস্টবিন বা আবর্জনার বালতি নেই! শুনলে অবাক লাগাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের বুকেই এক ফোঁটা আবর্জনা না জমিয়ে সম্পূর্ণ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন জীবন কাটানো যে সম্ভব, তা হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই মিডিয়া কর্মী।
এর ভিতরে কোনো ব্যাটারি বা ইলেকট্রনিক্স নেই। এর ভিতরের ফাঁপা অংশটি (acoustic cavity) এমন এক বৈজ্ঞানিক মাপে তৈরি, যা শব্দ তরঙ্গকে ভিতরে আটকে প্রতিধ্বনিত করে। আপনি শুধু আপনার মোবাইল ফোনের স্পিকারের অংশটি এর স্লটে গুঁজে দিন। ব্যস! মাটির প্রাকৃতিক গুণের কারণে শব্দ শুধু জোরেই হবে না, তার সঙ্গে যোগ হবে এক অদ্ভুত সুন্দর গভীর ‘বেস’ (Bass Effect), যা সাধারণত প্লাস্টিকের স্পিকারে পাওয়া যায় না।
কীভাবে তৈরি হয় এই সুরের কলসি?
সিভাপ্রকাশ নিজেই নবাগতদের শেখানোর জন্য এই স্পিকার তৈরির রহস্য ভাগ করে নিয়েছেন।
মাটি তৈরি: প্রথমে স্থানীয় খাঁটি লাল মাটি সংগ্রহ করে তা ভিজিয়ে, ছেঁকে একদম মাখনের মতো নরম ও মসৃণ করা হয়। ভিতরের বাতাস বের করতে মাটি খুব ভালো করে চটকাতে হয়।
কেরালার নিলম্বুর এলাকার ‘আরুভাকোড’ গ্রামটি এমনিতেই মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত। সিভাপ্রকাশ সেই পুরনো ঐতিহ্যকে শুধু বাঁচিয়েই রাখেননি, তাকে আধুনিক যুগের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। প্লাস্টিকের ভিড়ে তাঁর এই মাটির স্পিকার বা পুচকে মিনিয়েচারগুলি পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার এক চমৎকার প্রতীক।
বর্তমানে সিভাপ্রকাশ কোভালামের ‘কেরালা আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস ভিলেজ’ (KACV)-এ কাজ করছেন। তাঁর এই সুন্দর সুন্দর মাটির সৃষ্টিগুলি অনলাইন এবং অফলাইন—দুই মাধ্যমেই দেদার বিক্রি হচ্ছে। তিনি চান নতুন প্রজন্ম এই শিল্পে আসুক, তাই নিয়মিত ওয়ার্কশপ বা ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনাও করছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনস্টাগ্রামে @iam_siva______ কিংবা @clay_hands_pottery হ্যান্ডেলে ঢুকলেই দেখা যাবে তাঁর জাদুকরী হাতের কাজ। মাটির তৈরি একটা স্পিকার আপনার বসার ঘরে রাখলে তা যেমন ঘরের সৌন্দর্য বাড়াবে, তেমনই কোনো দূষণ ছাড়াই আপনার প্রিয় গানগুলিকে দেবে এক মাটির ছোঁয়া, মেঠো সুর।






