বাড়িতে নেই কোনো ডাস্টবিন: যেভাবে পাঁচ বছর ধরে বর্জ্যহীন জীবন কাটাচ্ছেন সোনিকা
গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর বাড়িতে কোনো ডাস্টবিন বা আবর্জনার বালতি নেই! শুনলে অবাক লাগাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের বুকেই এক ফোঁটা আবর্জনা না জমিয়ে সম্পূর্ণ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন জীবন কাটানো যে সম্ভব, তা হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই মিডিয়া কর্মী।
কোলে একটা ছোট্ট সন্তান এসেছে সোনিকার। তাই এখন মোবাইল ফোন জুড়ে শিশু সম্বন্ধীয় সব খবর। একদিন ফোন ঘাঁটতে গিয়ে একটা অজানা কথা জেনে চক্ষু চড়কগাছ সোনিকার। তিনি ছেলের জন্য যে ডায়াপার ব্যবহার করেন, তা শত শত বছর ধরে পড়ে থাকে আবর্জনার স্তূপে, সেগুলি পচে না গিয়ে পড়ে থাকে সেখানে এবং সেখান থেকে ক্ষতিকারক রাসায়নিক নির্গত হয়। বাকি সব বাবা-মায়ের মতো সোনিকাও তাঁর ছেলেকে একটা ভালো পৃথিবীতে রাখতে চান, যেখানে দূষণ একটু কম থাকবে। কিন্তু বাকি সব বাবা-মায়ের মতো এই প্রতিবেদন পড়েও তিনি এড়িয়ে যাননি এই ভেবে যে আমি একা কী করতে পারব? তাই শুরুটা করলেন নিজে। ঘরটাকে পরিবেশ-বান্ধব করে তুলতে চাইলেন। ছেলের জন্য কাপড় দিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ডায়াপার ব্যবহার করা শুরু করলেন।
সেই শুরু। তারপর সোনিকা দেখলেন আমাদের আশেপাশের জিনিসপত্র দিয়েই আমারা খুব সহজেই পরিবেশ-বান্ধব জীবন যাপন করতে পারি চাইলেই। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর বাড়িতে কোনো ডাস্টবিন বা আবর্জনার বালতি নেই! শুনলে অবাক লাগাই স্বাভাবিক, কিন্তু ব্যস্ত শহরের বুকেই এক ফোঁটা আবর্জনা না জমিয়ে সম্পূর্ণ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন জীবন কাটানো যে সম্ভব, তা হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই মিডিয়া কর্মী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
House without AC cooling: চেম্বুর এলাকার একটা বাড়ি যেন এক টুকরো ম্যাজিক! বাইরের তাপমাত্রা যখন ফুটছে, এই বাড়িটি তখন কোনো এসি বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই চারপাশের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ঠান্ডা থাকছে।
সোনিকার দিনের শুরুটা হয় ভারী সুন্দর একটা ছন্দে। রান্নাঘরে আনাজ কাটার সময় খোসাগুলি ফেলার জন্য রাখা থাকে একটা বড় পাত্র। সন্ধে হলেই সেই ভিজে বর্জ্যগুলি চলে যায় বারান্দার একটা মাটির পাত্রে বা কম্পোস্টারে। সোনিকা একে বলেন প্রকৃতির নিজস্ব জাদুবিদ্যা। সময়, অণুজীব আর ঘরের চেনা ভিজে-শুকনো আবর্জনার সঠিক ভারসাম্যেই তৈরি হয় কুচকুচে কালো উর্বর সার। সোনিকার ভাষায়, এটাই হলো প্রকৃতির ‘কালো সোনা’। এই সারে পুষ্টি পেয়েই তাঁর বারান্দার খুদে বাগানে প্রাণ ভরে হাসে তরতাজা তুলসী, পুদিনা, টমেটো, লেবু আর কারিপাতা। রান্নার জিনিস রান্নাঘরেই ফিরে আসে, প্রকৃতির সুন্দর বৃত্তটা সম্পূর্ণ হয় আর ছোট্ট আবির দু'চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে রোজ এই জাদুর পাঠ শেখে।
তবে সোনিকার এই লড়াই শুধু বাগানেই থমকে নেই। বর্জ্য কমানোর অভ্যাসটাকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন জীবনের প্রতিটা কোণায়। প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ বা ইলেকট্রনিক বর্জ্যের মতো শুকনো জিনিসগুলি জমানোর জন্য তাঁর রয়েছে একটা আলাদা ব্যাগ। প্রতি দুই সপ্তাহ পর পর একটি রিসাইক্লিং সংস্থা এসে এগুলি নিয়ে যায়। কিন্তু স্যানিটারি প্যাড বা টিস্যু পেপারের মতো জিনিস, যা রিসাইকেল করা যায় না, তার কী হবে? সোনিকা খুব সহজ সমাধান খুঁজে নিয়েছেন— টিস্যুর বদলে কাপড়ের ন্যাপকিন, আর পিরিয়ডসের দিনগুলিতে মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা পিরিয়ড প্যান্টি। ফলে বাড়ি থেকে একটাও বাতিল বর্জ্য বাইরে যাওয়ার সুযোগই পায় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র একটা কটন টি-শার্ট তৈরি করতে জল লাগে প্রায় ২,৭০০ লিটার! খুব সহজ হিসাবে—আপনি সারাদিনে যে পরিমাণ জল পান করেন, সেই হিসাবে আপনার পুরো আড়াই থেকে তিন বছরের (প্রায় ৯০০ দিনের) খাওয়ার জল স্রেফ একটা টি-শার্টের পিছনে শেষ হয়ে যায়।
এমনকী বাজার করার চেনা অভ্যাসটাও বদলে ফেলেছেন তিনি। প্যাকেটজাত বা প্লাস্টিকে মোড়া জিনিস কেনা একেবারেই বন্ধ। পাড়ার মুদি দোকান থেকে খোলা চাল-ডাল-সদাই কেনেন তিনি, আর তার জন্য বাড়ি থেকে নিয়ে যান নিজস্ব কাপড়ের থলি আর কৌটো। ঘন ঘন জামাকাপড় কেনার পুরনো শখ বদলে এখন তাঁর আলমারি সাজে থ্রিফট স্টোর বা সেকেন্ড হ্যান্ড পোশাকে। ঘর মোছার রাসায়নিক ফ্লোর ক্লিনারের বদলে সোনিকা নিজেই ঘরে তৈরি করে নিয়েছেন ম্যাজিক তরল ‘বায়ো-এনজাইম’। ফলের ফেলে দেওয়া খোসা, গুড় আর জলের একটা সহজ অনুপাত (৩:১:১০) মিশিয়ে এক মাস রেখে দিলেই তৈরি হয়ে যায় চমৎকার সুগন্ধী ক্লিনার। কমলালেবু, আনারস বা গরমকালে আমের খোসা দিয়ে তৈরি এই তরল যেমন সস্তায় ঘর পরিষ্কার করে, তেমনই ঘর মোছার পর সেই জলটুকু গাছের গোড়ায় দিলে তা কাজ করে চমৎকার প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে! সঙ্গে এর সুবাস ঘরের কাজ করার জন্য এক অদ্ভুত ইচ্ছে জাগায় মনে।
সোনিকার এই সুন্দর জীবনযাত্রা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন তাঁর বন্ধু স্বপ্না মেলওয়ানি। সোনিকার বাড়িতে এসে বর্জ্যহীন জীবনের গল্প শুনে স্বপ্নাও এখন নিজের পরিবারে প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো, রিসাইকেল করা আর বাচ্চাদের বেলুন ছাড়া পরিবেশ-বান্ধব জন্মদিনের পার্টি করার মতো অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। সোনিকার সহকর্মী দিব্যা হরিহরণও এখন ব্যাগে সবসময় কাপড়ের ছোট তোয়ালে আর জলের বোতল রাখতে ভোলেন না।
শুধুমাত্র বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীরা না, সমাজ মাধ্যমে তাঁর পোস্ট দেখেও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন অনেকে। এমনই একটা ছোট পোস্ট বদলে দিয়েছে এলিনা সান্যাল ব্যানার্জির সংসার। শিশুদের জন্য তৈরি কৃত্রিম ভিজে টিস্যুর (ওয়েট ওয়াইপস) ক্ষতিকর দিক নিয়ে সোনিকার লেখা পড়ে এলিনা গত তিন বছর ধরে নিজের বাড়ির সমস্ত ভিজে আবর্জনা দিয়ে ঘরেই সার বানাচ্ছেন। এমনকী এই জীবনযাত্রার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে তাঁর খুদেটিও। এলিনার ছেলে একটা জন্মদিনের পার্টি থেকে ফিরে এসে তাঁকে জানায় পার্টিতে টিস্যু পেপার ব্যবহার করতে তার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল! সেদিন একজন মা হিসেবে বুকটা গর্বে ভরে উঠেছিল, মনে হয়েছিল সোনিকার হাত ধরে অন্তত একটা ভালো শিক্ষা ছেলেকে দিতে পেরেছেন তিনি।
সোনিকার এই পাঁচ বছরের পথচলা আমাদের একটা মস্ত বড় সত্যি মনে করিয়ে দেয়। পরিবেশ বাঁচানোর জন্য আমাদের জীবনযাত্রাকে রাতারাতি ওলটপালট করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা যদি শুধু প্রতিদিনের কেনাকাটায় একটু সচেতন হই, প্লাস্টিকের প্যাকেট বা একবার ব্যবহারযোগ্য জিনিস বর্জন করি, আর রান্নাঘরের আবর্জনাটুকু মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিই— তবে এই ছোট ছোট পদক্ষেপেই একটু ভালো পৃথিবী তৈরি হবে।






