পারমাণবিক বসন্ত: ঋত্বিক ঘটকের ফিয়ার

Ritwik Ghatak Short Film Fear: ঋত্বিক ঘটক দিল্লির একটি সংবাদপত্রে শ্রূতকীর্তি চলচ্চিত্রকার ইংগমার বার্গম্যানকে আক্রমণ করেছিলেন তাঁর 'খ্রিস্টান বুজরুকির' জন্য। নায়ার সাহেব সেই লেখা পড়েছিলেন।

Sanjay Mukherjee
৩ মিনিট
পারমাণবিক বসন্ত: ঋত্বিক ঘটকের ফিয়ার

একথা এক ঝলক দখিন হাওয়ার মতো যে, পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের ১৯৬৫ সালে তোলা ছাত্রদের ডিপ্লোমা ছবি 'ফিয়ার' পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং তা এখন সমুদ্রতীরস্থ তরুণীর মতোই উজ্জ্বল। এই প্রসঙ্গে ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভের প্রাণপুরুষ পি.কে. নায়ারকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে উপায় নেই। আজ যে দেশে চলচ্চিত্র সংরক্ষণের জন্য একটি সচেতনতা তৈরি হয়েছে তাতে আমরা সকলেই — শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর থেকে সাধারণ পদাতিক — নায়ার সাহেবের উদ্যোগকে স্মরণ করছি। আর প্রয়াত নায়ার সাহেবের প্রাণে এই উৎসাহটুকু একদা সঞ্চারিত করেছিলেন একমেবাদ্বিতীয়ম ঋত্বিক ঘটক। তিনি তখন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের উপাধ্যক্ষ।

একটি অবান্তর কথায় যাই। হয়েছিল কী, ঋত্বিক ঘটক দিল্লির একটি সংবাদপত্রে শ্রূতকীর্তি চলচ্চিত্রকার ইংগমার বার্গম্যানকে আক্রমণ করেছিলেন তাঁর 'খ্রিস্টান বুজরুকির' জন্য। নায়ার সাহেব সেই লেখা পড়েছিলেন। এমন হলো যে, কয়েকদিন বাদে পুনেতে ফিরে ঋত্বিক মনস্থ করলেন যে তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে একটি বার্গম্যান বিষয়ক ভাষণ দেবেন। স্বভাবতই সেই যুগের ছোট্ট পুনে শহরে হইহই রইরই। অনেকেই এলেন অডিটোরিয়ামে, যাঁরা পুনের ছাত্রও নন। নায়ার সাহেব তো ছিলেনই। ঋত্বিক বলতে উঠে জানালেন, ইংগমার বার্গম্যান একজন মহত্তম পর্যায়ের চলচ্চিত্র স্রষ্টা। শ্রোতৃবৃন্দ তো শুনে থ! বিশেষত নায়ার সাহেব। তিনি আঙুল তুললেন। ঋত্বিক প্রথমে নায়ারকে পাত্তা দেননি। কিন্তু ক্রমাগত আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে থাকায় বিরক্ত হয়ে অবশেষে জানতে চাইলেন, "নায়ার, আপনার কি কিছু বলার আছে?” নায়ার সাহেব সবিনয়ে উত্তর দিলেন, “সেদিন একটি ইংরেজি সংবাদপত্রে আপনিই বলেছেন বার্গম্যান একটি বুজরুক, আর আজ আপনি বলছেন তিনি মহত্তম?” ঋত্বিক, ঈষৎ থেমে, জবাব দিলেন, “Well, That is between me and Bergman. For you he is great.”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'ভাবা প্র্যাকটিস' নয়, আজ ঋত্বিককে ভুলতে পারলেই কেন সুবিধা বাঙালির?

Ritwik Ghatak: ঋত্বিক তাঁর সময়ের থেকে এগিয়েছিলেন প্রায় এক দশক। আর তার জন্যই ঋত্বিকের অন্ধকার, অসম্পূর্ণ জায়গাগুলো দুনিয়ার কাছে আজও আলোচনার, রহস্যের।

আমার পাঠকরা কৌতূহলী হয়ে উঠবেন যে, ফিয়ার ছবিটির ধানভানা প্রসঙ্গে বার্গম্যানের মতো শিবের গীত গাওয়ার যুক্তি কী? আমার কাছে, সবচেয়ে জরুরি হলো, এই ছাত্রদের জন্য টিউটোরিয়াল নির্মাণ বস্তুত ঋত্বিক ও বার্গম্যানের মধ্যে অজান্তেই এক তাত্ত্বিক তর্কের অবতারণা করেছে। বস্তুত, ১৯৫৬ সালের দ্য সেভেন্থ সিল ছবিটি থেকে ১৯৬২-র উইন্টার লাইট পর্যন্ত বার্গম্যান ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর চূড়ান্ত সংঘর্ষ চালিয়ে গেছেন, যাকে ঋত্বিক শ্রদ্ধা সত্ত্বেও দার্শনিকভাবে অনুমোদন করতে পারেননি। এমনকী আমরাও ভুলতে পারি না যে, উইন্টার লাইট ছবিতে আত্মহত্যার ঘটনাটি অনুষ্ঠিত হয় চৈনিক পারমাণবিক বিস্ফোরণের আতঙ্কে এবং বার্গম্যান তখনই অনুপস্থিত ঈশ্বর এবং জড় হৃদয় সম্পর্কে, নিষ্প্রাণ গির্জায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এরকম মর্মান্তিক শূন্যতা, চলচ্চিত্র আর প্রত্যক্ষ করেনি বিশ শতকে। বার্গম্যান বলতে চান, এই শূন্যতা একটা আয়না — "I see myself feel fear and loathing”। এই আতঙ্ক আধুনিক অস্তিত্বের রেখাচিত্র।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সত্যজিৎ, ঋত্বিক নন; মধ্যবিত্ত সমাজকে থাপ্পড় কষিয়েছিলেন মৃণাল সেনই!

Mrinal Sen: ১৯৮২ সালে মৃণাল সেন তৈরি করলেন ‘খারিজ’। অনেকের মতে এই ছবি নাকি তৎকালীন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভিত্তিটাকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল।

ফিয়ার ছবিটির কৃতিত্ব যে, তা তো কোনও ছবি নয়, অল্প বাজেটে মেকআপ, কস্টিউম ছাড়া, কোনও দৃশ্যসজ্জা ছাড়া একটা ভাবনার কাঠামো। ছাত্রদের ঋত্বিক ঘটক বোঝাতে চাইছিলেন চলচ্চিত্রের উপজীব্য কী হওয়া উচিত। আমরা সকৌতুকে লক্ষ্য করি, এখানে বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে অভিনয় করছেন পরবর্তীকালে মুম্বই চলচ্চিত্রে যিনি প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে উঠবেন, সেই সুভাষ ঘাই! স্থিতধী মানুষের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে যাঁকে, সেই আশরানিও পরবর্তীকালে মুম্বই পর্দায় তাঁর আসন পেতে নেবেন। অথচ ঋত্বিক কী শেখাচ্ছিলেন ছাত্রদের? একটি পারমাণবিক বাঙ্কারে মানুষের হৃদয়ের প্রস্থচ্ছেদ। এখানে স্পষ্টতই বোঝা যায়, কিছু 'পতিত' মানুষ — মৃত্যুর থেকে যারা পরিত্রাণ চেয়েছে মিথুনে, যারা হতবিহ্বল, যারা আত্মবিস্মৃত, তাদের কয়েকটি মুহূর্ত। মুখের ক্লোজআপ সমূহ যেন আত্মার অভ্যন্তরে অভিযান চালিয়েছে। আলো ও ছায়া, সাদা ও কালোর কী অসামান্য অনুপাত! সিঁড়িটি তো অভিব্যক্তিবাদদের চূড়ান্ত অভিজ্ঞান। এই ছবি যদি ঋত্বিক স্বয়ং পূর্ণদৈর্ঘ্যের করতেন তাহলে আমার ধারণা, তা বুনুয়েলের এক্সটার্মিনেটিং অ্যাঞ্জেলের মতো আটকে পড়া একদল মানুষকে ধরত অথবা তারকোভস্কির স্যাক্রিফাইস ছবিতে দণ্ডিত মানুষের অন্তিম উচ্চারণ লিপিবদ্ধ করার সমান্তরাল প্রস্তাব দিত। ঋত্বিকের সেই সুযোগ ছিল না এই ছোট ছবিতে। তিনি শুধু ছাত্রদের শেখাতে চেয়েছিলেন চেতনার বিন্যাস, যে কীভাবে মহৎ ছবি তার উপাদান সংগ্রহ করতে পারে। মৌলিক বিষাদের মতো ভয় আমাদের চেতনাকে কোন মোহাবরণে মুড়ে রাখে?

আজ যখন ছবিটিকে দেখলাম, তার আলোকসম্পাত, মুখাবয়ব ও অধোগামী সিঁড়ি — তখন কেন জানি না, একজন চলচ্চিত্রশিক্ষক হিসেবে আবার নিজের অকিঞ্চিৎকরতা উপলব্ধি করলাম। আমরা তো ভাবতেই পারি না, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে, কে না জানে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাক সীমান্ত রেখায় আগুন এবং বারুদের বিস্তারের কথা — তবু ঋত্বিক ঈশ্বরবিহীন অন্ধকারে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করলেন, সুবর্ণরেখার অনুক্রমে "আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়" গানটির প্রয়োগ আমাদের জানিয়ে গেল, এই নির্মল শিশিরে ভোরের আলোয় সমস্ত আকাশ টোড়ির মতো। মানুষের মৃত্যু নেই। না, যদি তিনি শিল্পী না হয়ে শুধু চলচ্চিত্রশিক্ষকই হতেন তাহলেও আসমুদ্রহিমাচল তাঁর পায়ে শতবর্ষের প্রণামই রাখত। জীবনানন্দকেই মনে পড়ে — “আজীবন কেবলই বিপন্ন হয়ে চলে/ তারপর যে বিপদ আসে/ জানি হৃদয়ঙ্গম করার জিনিস।" আজ যখন ভারত পাক সীমান্ত রেখা আবার মেঘলা হয়ে উঠেছে তখন ফিয়ার ছবিটির গুরুত্ব অন্যরকম।

লিখেছেন
Sanjay Mukherjee
Sanjay Mukherjee
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।