‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর মহসিনা, আপনি আজও অনন্য!

Huma Qureshi : প্রথম সিনেমার সেই প্রাথমিক মুগ্ধতা পেরিয়ে দর্শক তখন খানিক চিনতে শুরু করেছেন হুমা কুরেশি নামের এই নতুন আলোমেঘটিকে। সিনেমার দ্বিতীয় পার্টটি ফয়জলের, সিনেমার দ্বিতীয় পার্টটি আপনারও।

Sandip Dhara
৩ মিনিট
‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর মহসিনা, আপনি আজও অনন্য!

মেয়েটা ঠিক মেয়েসুলভ না, মেয়েটা কি ভালো– শান্ত, পেলব, নিরীহ। ভারতীয় নারী নিয়ে ভারতীয় পুরুষের সংকট চিরকালীন। আমাদের সাহিত্য আমাদের সংস্কৃতি সেই সংকটকে কখনও সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, কখনও বেআব্রু। নতুন সহস্রাব্দের ঠিক এক যুগের মাথায় বোম্বে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আসছে অধুনা ইতিহাস হয়ে যাওয়া ছবি ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে ‘চিরকালীন’ হয়ে যাওয়া সেই ছবির টাইটেল কার্ডের পরের দৃশ্যেই সিলভার স্ক্রিনে আপনি– গুটিসুটি মেরে বসে আছেন পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে। চোখে-মুখে ভয়, উৎকণ্ঠা। শুরুর সেই দৃশ্যে আপনাকে চোখে পড়ে কি তেমন? নাহ!

নবাগতা আপনার প্রথম ছবিতে স্ক্রিন টাইম মেরে-কেটে মিনিট কুড়ি! ওপেনিং সিনের পরপরই, প্রিলিউডে চলে যাওয়া সেই ছবিতে আপনি পর্দায় ফিরছেন একেবারে শেষ কোয়ার্টারে। ‘ইসকে আগে কি আব দাস্তা মুঝ সে শুন’— দানিশ-সামা-র নিকাহ-র আসরে শুধু ফয়জল খানরূপী নওয়াজুদ্দিন নয়, মুগ্ধতায় এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে এই উপমহাদেশের আপামর চলচ্চিত্রপ্রেমী। নেশা ও বলিউডে বুঁদ হয়ে থাকা ফয়জলের আপনার প্রতি যে মুগ্ধতা– তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন। ফয়জলের সানগ্লাসের পালটায় চোখ ঢেকে নিচ্ছেন সানগ্লাসে। ওই স্ক্রিন প্রেজেন্স, ওই ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস— ফয়জলের একদম সম্মুখে গালে হাত দিয়ে আপনার বসা, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি— অধমের সীমিত শব্দ ভাণ্ডারে এমন কোনও বিশেষণ নেই যা দিয়ে মহসিনা বর্ণনা করা যায় আপনাকে!

দৃশ্য: 'পারমিশন লেনি চাহিয়ে'

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিদানন্দ দাশগুপ্ত থেকে অনুপমা চোপড়া ফিল্মরিভিউয়ার আর ফিল্মক্রিটিক আলাদা কোথায়?

Film Reviewer and Film Critic : ফিল্ম রিভিউয়ার কোনো সিনেমা সম্পর্কে তাঁর মতামত জানান, সেই সিনেমাটি রিলিজের পরপরই। তাঁর সেই মতামতের মধ্যে থাকে সিনেমাটি সম্পর্কে এক তাৎক্ষণিক আলোচনা।

কালো দুই চোখ যেন ডেকে নিয়ে যায়

তার গভীর ঠোঁট

রৌদ্রদিন শেষে স্থিতধী বিকেলের মায়া

এমন নায়িকা আমার এই ক-বছরের সিনেমা দর্শনে আসেনি কখনও! তার আগেও এসেছিল কি? কাট টু নেক্সট সিন— কচুরিপানা জর্জরিত এক পুকুর। জলাধারের পাড়ে বসে আপনি ও ফয়জল। ‘আপকো পারমিশন লেনি চাহিয়ে’— ফয়জল আপনার হাত ছুঁয়েছিল কিচ্ছুটি না বলে; জিজ্ঞাসা না করে। আপনার রিঅ্যাকশন, বিরক্তি, অবাক হওয়া মিলেমিশে একাকার। কিন্তু সব ছাপিয়ে সেই প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস, নিজেকে ধারণ করা, ‘আপকো পুছনা চাহিয়ে না? হাঁ, পুছ কে রাখিয়ে হাত, কোয়ি মানা থোড়ি হ্যায়! পারমিশন লেনি চাহিয়ে!’ আগুন আর জলের এমন সহজ স্বতঃস্ফূর্ত সহবস্থান শেষ কবে দেখেছে ভারতীয় সিনেমা? একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর ২’-এ জঙলা ফুলের মতো ফুটে উঠছেন আপনি – সুন্দর ও সবল! নায়কের তালে তাল মেলানো যার কাজ না। যে নিজেকে ধরে রাখতে জানে, বিষণ্ন বিকেলে যে হঠাৎ ফুটে ওঠে ফুল অথবা জোনাকির মতো। ‘জুতে খাও গে? – ফয়জলকে ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দেওয়া, 'তো আপনি আম্মাকে কে সাথ হি যাও না, হামারা ক্যায়া জরুরত হ্যায়!'— ফয়জলের ভালোমানুষির পালটায় আপনার সপাট থাপ্পড়! একই সঙ্গে তেজ ও লাস্যের, নিষেধ ও প্রশ্রয়ের তুমুল হাঁটাচলা, আনাড়ি সিনেমাদর্শক থেকে মগ্ন কবি— কত সহজে আপনি আছন্ন করে ফেলেন সম্পূর্ন বিপরীত ও সমান্তরাল কিছু প্রজন্মকে!

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
থিয়েটারের অঞ্জন : বার্লিন, ব্রেখট আর মৃণাল সেন

Anjan Dutt Interview; জার্মানিতে পুব-পশ্চিম মিলিয়ে অজস্র থিয়েটার দেখে প্রথমেই আমার যেটা মনে হয়েছিল— ওইর’ম স্কেলে ওইভাবে আমরা ভাবতে পারি না। থিয়েটারে এত খরচা হচ্ছে!

প্রথম সিনেমার সেই প্রাথমিক মুগ্ধতা পেরিয়ে দর্শক তখন খানিক চিনতে শুরু করেছেন হুমা কুরেশি নামের এই নতুন আলোমেঘটিকে। সিনেমার দ্বিতীয় পার্টটি ফয়জলের, সিনেমার দ্বিতীয় পার্টটি আপনারও। পুরুষতান্ত্রিক ঘরানার এই ক্রাইম থ্রিলারের প্রতি মুহূর্তে বদলে যাওয়া কাহিনিচিত্রে, দুর্দান্ত বাঁকে নাগমা আর দুর্গা ছাড়া গোদা অর্থে কোনও নারী চরিত্রেরই বিশাল কিছু করার ছিল না। আপনারও কি করার ছিল খুব কিছু? কিন্তু আপনি স্ক্রিনে এলেই ম্যাজিক! সে আপনার নিকাহ-র দিনের গানের আসর হোক, বা বাজার চলতি ফয়জলকে ‘বুড়ো’ বলে দেগে দেওয়া হোক! কখনও লক-আপের ওপার থেকে জেলবন্দি ফয়জলকে দেহাতি গান, আবার কখনও ফোনে বলিউডি গান শোনানো কিংবা জেল মুক্তির দিনে কালো অ্যাভিয়টরে চোখ ঢেকে ফয়জলকে ফিরিয়ে আনতে যাওয়া, প্রথম পার্ট থেকে জন্মদাগের মতো লেগে থাকা সানগ্লাস পরিয়ে দেওয়া, খানিক গর্বে খানিক ভালবাসায়! আপনি কি যাবেন মহসিনা – আনোখা বৃষ্টিদিনে সাত সুমুদ্দুর পাড়?

মহসিনা ও ফয়জল

‘তুখোড়’ - এই বোধহয় আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বিশেষণ। আল্পসের কোলে বা কাশ্মীরের বরফে নায়কের হাত ধরে না নেচে, কাঁচা ইমোশনে না ভিজিয়ে, আদ্যন্ত অপরাধ জগতের পুরুষপ্রধান এই সিনেমায় নবাগতা আপনি যে এভাবে বদলে দেবেন ভারতীয় সিনেমার নারী চরিত্র ও তার সৌন্দর্য, কমনীয়তা ও আবেদনের প্রথাগত রেখচিত্র— তা কি আপনি নিজেও জানতেন?

এভাবে সকাল আসে

ডেকে নিয়ে যায়

আলো পেরিয়ে আলোর দিকে

চলে যায় যাপিত অন্ধকার

ভালবাসা ইথারে ভাসে

মুছে-মুছে যায়…

দুর্দান্ত অপরাধী ফয়জলের ভিতররের আদরপ্রত্যাশী ক্রন্দনরত শিশুটাকে কী বিপুল মমতায় আগলে রেখেছেন আপনি! কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও হারিয়ে যেতে দেননি নিজেকে! জীবনকে কীভাবে সেলিব্রেট করতে হয় তা খানিক শিখে নেওয়া যায় আপনাকে দেখে। একবার মাত্র, একবারই ফয়জলকে আটকাতে চেয়েছিলেন, অনাগত সন্তানের জন্য। না ফয়জল শোনেনি।

শেষ দৃশ্য– নাসির, আপনি, আপনার সন্তান। না হাসি থামেনি আপনার– থামেনি আপামর চলচ্চিত্রপ্রেমী ও না-প্রেমীর আচ্ছন্নতা– ঘোর! শুভ জন্মদিন বর্ষাদিনের স্পর্ধিত রোদ– ভালোবাসা নেবেন!

লিখেছেন
Sandip Dhara
Sandip Dhara
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।