‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর মহসিনা, আপনি আজও অনন্য!
Huma Qureshi : প্রথম সিনেমার সেই প্রাথমিক মুগ্ধতা পেরিয়ে দর্শক তখন খানিক চিনতে শুরু করেছেন হুমা কুরেশি নামের এই নতুন আলোমেঘটিকে। সিনেমার দ্বিতীয় পার্টটি ফয়জলের, সিনেমার দ্বিতীয় পার্টটি আপনারও।

মেয়েটা ঠিক মেয়েসুলভ না, মেয়েটা কি ভালো– শান্ত, পেলব, নিরীহ। ভারতীয় নারী নিয়ে ভারতীয় পুরুষের সংকট চিরকালীন। আমাদের সাহিত্য আমাদের সংস্কৃতি সেই সংকটকে কখনও সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, কখনও বেআব্রু। নতুন সহস্রাব্দের ঠিক এক যুগের মাথায় বোম্বে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আসছে অধুনা ইতিহাস হয়ে যাওয়া ছবি ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে ‘চিরকালীন’ হয়ে যাওয়া সেই ছবির টাইটেল কার্ডের পরের দৃশ্যেই সিলভার স্ক্রিনে আপনি– গুটিসুটি মেরে বসে আছেন পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে। চোখে-মুখে ভয়, উৎকণ্ঠা। শুরুর সেই দৃশ্যে আপনাকে চোখে পড়ে কি তেমন? নাহ!
নবাগতা আপনার প্রথম ছবিতে স্ক্রিন টাইম মেরে-কেটে মিনিট কুড়ি! ওপেনিং সিনের পরপরই, প্রিলিউডে চলে যাওয়া সেই ছবিতে আপনি পর্দায় ফিরছেন একেবারে শেষ কোয়ার্টারে। ‘ইসকে আগে কি আব দাস্তা মুঝ সে শুন’— দানিশ-সামা-র নিকাহ-র আসরে শুধু ফয়জল খানরূপী নওয়াজুদ্দিন নয়, মুগ্ধতায় এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে এই উপমহাদেশের আপামর চলচ্চিত্রপ্রেমী। নেশা ও বলিউডে বুঁদ হয়ে থাকা ফয়জলের আপনার প্রতি যে মুগ্ধতা– তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন। ফয়জলের সানগ্লাসের পালটায় চোখ ঢেকে নিচ্ছেন সানগ্লাসে। ওই স্ক্রিন প্রেজেন্স, ওই ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস— ফয়জলের একদম সম্মুখে গালে হাত দিয়ে আপনার বসা, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি— অধমের সীমিত শব্দ ভাণ্ডারে এমন কোনও বিশেষণ নেই যা দিয়ে মহসিনা বর্ণনা করা যায় আপনাকে!

দৃশ্য: 'পারমিশন লেনি চাহিয়ে'
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Film Reviewer and Film Critic : ফিল্ম রিভিউয়ার কোনো সিনেমা সম্পর্কে তাঁর মতামত জানান, সেই সিনেমাটি রিলিজের পরপরই। তাঁর সেই মতামতের মধ্যে থাকে সিনেমাটি সম্পর্কে এক তাৎক্ষণিক আলোচনা।
কালো দুই চোখ যেন ডেকে নিয়ে যায়
তার গভীর ঠোঁট
রৌদ্রদিন শেষে স্থিতধী বিকেলের মায়া
এমন নায়িকা আমার এই ক-বছরের সিনেমা দর্শনে আসেনি কখনও! তার আগেও এসেছিল কি? কাট টু নেক্সট সিন— কচুরিপানা জর্জরিত এক পুকুর। জলাধারের পাড়ে বসে আপনি ও ফয়জল। ‘আপকো পারমিশন লেনি চাহিয়ে’— ফয়জল আপনার হাত ছুঁয়েছিল কিচ্ছুটি না বলে; জিজ্ঞাসা না করে। আপনার রিঅ্যাকশন, বিরক্তি, অবাক হওয়া মিলেমিশে একাকার। কিন্তু সব ছাপিয়ে সেই প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস, নিজেকে ধারণ করা, ‘আপকো পুছনা চাহিয়ে না? হাঁ, পুছ কে রাখিয়ে হাত, কোয়ি মানা থোড়ি হ্যায়! পারমিশন লেনি চাহিয়ে!’ আগুন আর জলের এমন সহজ স্বতঃস্ফূর্ত সহবস্থান শেষ কবে দেখেছে ভারতীয় সিনেমা? একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর ২’-এ জঙলা ফুলের মতো ফুটে উঠছেন আপনি – সুন্দর ও সবল! নায়কের তালে তাল মেলানো যার কাজ না। যে নিজেকে ধরে রাখতে জানে, বিষণ্ন বিকেলে যে হঠাৎ ফুটে ওঠে ফুল অথবা জোনাকির মতো। ‘জুতে খাও গে? – ফয়জলকে ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দেওয়া, 'তো আপনি আম্মাকে কে সাথ হি যাও না, হামারা ক্যায়া জরুরত হ্যায়!'— ফয়জলের ভালোমানুষির পালটায় আপনার সপাট থাপ্পড়! একই সঙ্গে তেজ ও লাস্যের, নিষেধ ও প্রশ্রয়ের তুমুল হাঁটাচলা, আনাড়ি সিনেমাদর্শক থেকে মগ্ন কবি— কত সহজে আপনি আছন্ন করে ফেলেন সম্পূর্ন বিপরীত ও সমান্তরাল কিছু প্রজন্মকে!

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Anjan Dutt Interview; জার্মানিতে পুব-পশ্চিম মিলিয়ে অজস্র থিয়েটার দেখে প্রথমেই আমার যেটা মনে হয়েছিল— ওইর’ম স্কেলে ওইভাবে আমরা ভাবতে পারি না। থিয়েটারে এত খরচা হচ্ছে!
প্রথম সিনেমার সেই প্রাথমিক মুগ্ধতা পেরিয়ে দর্শক তখন খানিক চিনতে শুরু করেছেন হুমা কুরেশি নামের এই নতুন আলোমেঘটিকে। সিনেমার দ্বিতীয় পার্টটি ফয়জলের, সিনেমার দ্বিতীয় পার্টটি আপনারও। পুরুষতান্ত্রিক ঘরানার এই ক্রাইম থ্রিলারের প্রতি মুহূর্তে বদলে যাওয়া কাহিনিচিত্রে, দুর্দান্ত বাঁকে নাগমা আর দুর্গা ছাড়া গোদা অর্থে কোনও নারী চরিত্রেরই বিশাল কিছু করার ছিল না। আপনারও কি করার ছিল খুব কিছু? কিন্তু আপনি স্ক্রিনে এলেই ম্যাজিক! সে আপনার নিকাহ-র দিনের গানের আসর হোক, বা বাজার চলতি ফয়জলকে ‘বুড়ো’ বলে দেগে দেওয়া হোক! কখনও লক-আপের ওপার থেকে জেলবন্দি ফয়জলকে দেহাতি গান, আবার কখনও ফোনে বলিউডি গান শোনানো কিংবা জেল মুক্তির দিনে কালো অ্যাভিয়টরে চোখ ঢেকে ফয়জলকে ফিরিয়ে আনতে যাওয়া, প্রথম পার্ট থেকে জন্মদাগের মতো লেগে থাকা সানগ্লাস পরিয়ে দেওয়া, খানিক গর্বে খানিক ভালবাসায়! আপনি কি যাবেন মহসিনা – আনোখা বৃষ্টিদিনে সাত সুমুদ্দুর পাড়?

মহসিনা ও ফয়জল
‘তুখোড়’ - এই বোধহয় আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বিশেষণ। আল্পসের কোলে বা কাশ্মীরের বরফে নায়কের হাত ধরে না নেচে, কাঁচা ইমোশনে না ভিজিয়ে, আদ্যন্ত অপরাধ জগতের পুরুষপ্রধান এই সিনেমায় নবাগতা আপনি যে এভাবে বদলে দেবেন ভারতীয় সিনেমার নারী চরিত্র ও তার সৌন্দর্য, কমনীয়তা ও আবেদনের প্রথাগত রেখচিত্র— তা কি আপনি নিজেও জানতেন?
এভাবে সকাল আসে
ডেকে নিয়ে যায়
আলো পেরিয়ে আলোর দিকে
চলে যায় যাপিত অন্ধকার
ভালবাসা ইথারে ভাসে
মুছে-মুছে যায়…
দুর্দান্ত অপরাধী ফয়জলের ভিতররের আদরপ্রত্যাশী ক্রন্দনরত শিশুটাকে কী বিপুল মমতায় আগলে রেখেছেন আপনি! কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও হারিয়ে যেতে দেননি নিজেকে! জীবনকে কীভাবে সেলিব্রেট করতে হয় তা খানিক শিখে নেওয়া যায় আপনাকে দেখে। একবার মাত্র, একবারই ফয়জলকে আটকাতে চেয়েছিলেন, অনাগত সন্তানের জন্য। না ফয়জল শোনেনি।
শেষ দৃশ্য– নাসির, আপনি, আপনার সন্তান। না হাসি থামেনি আপনার– থামেনি আপামর চলচ্চিত্রপ্রেমী ও না-প্রেমীর আচ্ছন্নতা– ঘোর! শুভ জন্মদিন বর্ষাদিনের স্পর্ধিত রোদ– ভালোবাসা নেবেন!







