বড় মিডিয়া নয়, রাম রহিমকে ধরিয়ে দিয়েছিল ছোট সংবাদমাধ্যমই

Ram Rahim journalist case: গুরমিত রাম রহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার ক্ষেত্রে ছোট সংবাদপত্রগুলির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল? বড় সংবাদমাধ্যম যখন প্রভাবশালী ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে খবর প্রকাশে সতর্ক ছিল, তখন ‘পুরা সচ’, ‘লেখা-জোখা’র মতো কাগজ কীভাবে সাহসের সঙ্গে সত্য সামনে এনেছিল?

Tanvia Barua
৮ মিনিট
বড় মিডিয়া নয়, রাম রহিমকে ধরিয়ে দিয়েছিল ছোট সংবাদমাধ্যমই

গুরমিত রাম রহিম সিং আবার জেলের বাইরে। ২৫ অগাস্ট রোহতকের সুনারিয়া জেল থেকে ২১ দিনের জন্য বেরিয়েছেন ডেরা সচ্চা সৌদার প্রধান। ২০১৭ সালে দুই মহিলা শিষ্যকে ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার পর এ নিয়ে ২০২০ সাল থেকে তাঁর ১৭তম অস্থায়ী মুক্তি। সাম্প্রতিক এই মুক্তি নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনই ফিরে দেখা দরকার সেই সময়টাকে, যখন রাম রহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনও আদালতের বিচারাধীনও হয়নি। তখন কীভাবে বিষয়টি মানুষের সামনে এসেছিল? সেই ইতিহাসে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

আইনের চোখে নির্দিষ্ট শর্তে প্যারোল বা ফার্লো পাওয়ার সুযোগ বন্দিদের রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই ব্যক্তিকে বারবার এবং এত ঘন ঘন অস্থায়ী মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ এবং এর পিছনে কী যুক্তি কাজ করছে?

রাম রহিমের কারাদণ্ডের রায়ের পর হরিয়ানা ও পঞ্চকুলায় তার সমর্থকদের হিংসাত্মক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। কমপক্ষে ২৮ জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষ আহত হয়। রাম রহিমের জেলযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর বিপুল সামাজিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব।

২০২০ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয় এই অস্থায়ী মুক্তির পর্ব। প্রথম দিকে মায়ের অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তাকে অল্প সময়ের জন্য জেল থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের অক্টোবরে এক দিনের জন্য এবং ২০২১ সালের মে মাসে কয়েক ঘণ্টার জন্যও বাইরে ছিল। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২১ দিনের ফার্লো পায়। সেই সময় থেকেই তার অস্থায়ী মুক্তির পরিমাণ ও ঘনঘন জেল থেকে বেরনো নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে শুরু করে।

২০২২ সালের জুনে তার ৩০ দিনের প্যারোল পায়। এরপর অক্টোবর মাসে আবার ৪০ দিনের প্যারোল দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪০ দিনের জন্য জেলের বাইরে ছিল। ওই সময় উত্তরপ্রদেশের বাগপতের বরনাওয়া আশ্রমে থেকে ডেরা সচ্চা সৌদার বিভিন্ন কর্মসূচিতে ভার্চুয়ালি যোগ দেয়। তার অস্থায়ী মুক্তির সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ভিডিও ও বার্তাও প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে প্যারোলের আইনি উদ্দেশ্য এবং বাস্তবে সেই সময়ের ব্যবহারের মধ্যে ফারাক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৩০ দিনের এবং নভেম্বর মাসে ২১ দিনের জন্য তাকে আবার অস্থায়ী মুক্তি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আবার ৫০ দিনের প্যারোল পায়। একই বছরের অক্টোবরে হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাকে আরও ২০ দিনের জন্য জেল থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। সেই সময় নির্বাচন কমিশন প্যারোলের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত দিয়েছিল। তার হরিয়ানায় প্রবেশ, রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।

২০২৫ সালেও এই ধারার কোনো পরিবর্তন হয়নি। জানুয়ারিতেও ৩০ দিনের প্যারোল পায়। এপ্রিল মাসে ২১ দিনের ফার্লো দেওয়া হয়। অগাস্টে আবার ৪০ দিনের প্যারোল পায়। আর এবার ২০২৬ সালের অগাস্টে আরও ২১ দিনের অস্থায়ী মুক্তি। জেলে থাকার সময়ের তুলনায় বারবার অল্প সময়ের জন্য হলেও বাইরে থাকার ঘটনা এত ঘন ঘন ঘটছে যে বিষয়টি এখন স্বাভাবিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সীমা ছাড়িয়ে জনপরিসরের বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ধর্ষণ কাণ্ডে ফের যাবজ্জীবন 'ধর্মগুরু' আসারামের, ১০ বছর আগের ওইদিন ঠিক কী ঘটেছিল?

Asaram Bapu Life Imprisonment : আপাতত কারাগারে গারদের ওপারেই রয়েছে আসারাম। নতুন করে এই অভিযোগ ফের ১০ বছর আগের সেই ঘটনাকে সামনে আনে।

এই বিতর্কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, প্যারোল এবং ফার্লোর পার্থক্য। দুটিই বন্দির অস্থায়ী মুক্তির ব্যবস্থা হলেও উদ্দেশ্য ও আইনি কাঠামো এক নয়। ফার্লো সাধারণত নির্দিষ্ট সময় জেলে থাকার পর বন্দিকে সাময়িকভাবে পরিবারের সঙ্গে দেখা করা বা সামাজিক কারণে বাইরে থাকার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে, প্যারোল সাধারণত বিশেষ কারণ বা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু রাম রহিমের ক্ষেত্রে একের পর এক অস্থায়ী মুক্তির ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই ব্যবস্থাগুলি কি সত্যিই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে তা প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠছে?

একজন সাধারণ বন্দি যদি প্যারোলের জন্য আবেদন করে, তার আবেদন কীভাবে বিবেচনা করা হয়? একই ধরনের অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অন্য বন্দিরাও কি একই ধরনের সুযোগ পায়? যদি পায়, তাহলে রাম রহিমের ক্ষেত্রে এত বেশি সংখ্যক অস্থায়ী মুক্তি নিয়ে প্রশ্ন কেন উঠছে? আর যদি না পায়, তাহলে তাঁর ক্ষেত্রে প্রশাসন কী বিশেষ যুক্তি দেখাচ্ছে?

এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ রাম রহিম ডেরা সচ্চা সৌদার প্রধান এবং তার বিপুল সংখ্যক অনুসারী রয়েছে। তার বাইরে আসার প্রতিটি ঘটনা তাই সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে। অতীতে তার প্যারোলের সময় ডেরার বিভিন্ন কর্মসূচি, অনলাইন অনুষ্ঠান এবং তার প্রকাশ্য বার্তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ফলে তার অস্থায়ী মুক্তিকে নিছক ব্যক্তিগত ছুটি হিসেবে দেখা কঠিন।

এই কারণেই এবারও তার প্যারোল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিখ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আকাল তখত এবং শিরোমণি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির পক্ষ থেকেও রাম রহিমকে বারবার প্যারোল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, একদিকে রাম রহিমের মতো একজন দণ্ডিত ব্যক্তি বারবার অস্থায়ী মুক্তি পাচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে জেলে থাকা বহু শিখ বন্দি প্যারোল বা মুক্তির জন্য সমস্যার মুখে পড়ছে। তাদের বক্তব্যে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’-এর অভিযোগ উঠে এসেছে।

অবশ্য প্যারোল পাওয়া মানেই সাজা মকুব হয়ে যাওয়া নয়। রাম রহিম এখনও তার ২০ বছরের কারাদণ্ডের সাজা ভোগ করছে। অস্থায়ী মুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তাকে আবার জেলে ফিরে যেতে হয়। তাই আইনগতভাবে প্যারোলকে ‘মুক্তি’ বলা ঠিক নয়। কিন্তু একই ব্যক্তিকে বারবার এই সুযোগ দেওয়ার ফলে যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, সেটিকে শুধুমাত্র আইনি সংজ্ঞার মধ্যে আটকে রাখা যায় না।

আরও একটি বিষয় এখানে মনে রাখা জরুরি। ২০১৭ সালে রাম রহিমের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলায় আদালতের রায় ঘোষণার সময় তার বিপুল সংখ্যক অনুসারী পঞ্চকুলায় জড়ো হয়েছিল। রায়ের পর যে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে, তাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়ছিল এবং ব্যাপক সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছিল। অর্থাৎ তার অনুসারীদের সংগঠিত ক্ষমতা সম্পর্কে প্রশাসন আগে থেকেই অবগত। ফলে তার অস্থায়ী মুক্তির সময় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০০২ সালে গুরমিত রাম রহিমের বিরুদ্ধে এক সাধ্বী যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। সেই অভিযোগ নিয়ে একটি বেনামি চিঠি প্রকাশ্যে আসে। বড় সংবাদমাধ্যমের অনেকেই সেই চিঠি প্রকাশ করতে পিছিয়ে গিয়েছিল। কারণ অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল এমন একজন ধর্মগুরু, যার প্রভাব ছিল বিপুল। হরিয়ানা, পঞ্জাব এবং আশপাশের অঞ্চলে তার লক্ষ লক্ষ অনুসারী ছিল। এমন একজন শক্তিশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করা যে কোনো সাংবাদিকের কাছেই বড় ঝুঁকির বিষয় ছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেবল রামদেবই নন, মেয়েদের নিয়ে বারবার অশালীন মন্তব্য করেছেন এই ধর্মগুরুরা

Ramdev Comments on Women: যোগগুরু রামদেব এর আগেও মেয়েদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। সেই 'ট্র্যাডিশন'-এর সঙ্গী আরও অনেকে...

সেই সময় সিরসা থেকে প্রকাশিত ছোট দৈনিক ‘পুরা সচ’-এর সম্পাদক ছিলেন রামচন্দ্র ছত্রপতি। অন্যরা যখন পিছিয়ে গেলেন, তখন তিনি সেই বেনামি চিঠি প্রকাশ করেন। চিঠিতে ডেরা সচ্চা সৌদার ভিতরে এক সাধ্বীর উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছিল। এরপর থেকেই গোটা ঘটনাটি আরও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। একজন স্থানীয় সাংবাদিকের হাতে থাকা ছোট সংবাদপত্র হঠাৎ করে এমন একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, যা পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম আলোচিত মামলায় পরিণত হয়।

সেই খবর প্রকাশের মূল্যও ছিল অত্যন্ত বড়। রামচন্দ্র ছত্রপতিকে গুলি করা হয়। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর হত্যার ঘটনা জাতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মতোই সাহস দেখানো আরও একটি ছোট সংবাদপত্রের কথা তখন ততটা সামনে আসেনি। সেটি ছিল ফতেহাবাদ থেকে প্রকাশিত সন্ধ্যার কাগজ ‘লেখা-জোখা’। তারাও একই বেনামি চিঠি প্রকাশ করেছিল। অভিযোগ ওঠে, এর পর ডেরা-সমর্থকেরা সংবাদপত্রটির অফিস এবং ছাপাখানা পুড়িয়ে দেয়।

‘লেখা-জোখা’র সাংবাদিকেরা ডেরার বিরুদ্ধে এফআইআর করেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে সেই অভিযোগও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করতে হয় বলে নিউজলন্ড্রির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার ডেরা-সমর্থক প্রশাসনকে হুমকি দিয়েছিল, ডেরার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তারা রাস্তা অবরোধ করবে। অর্থাৎ একটি ছোট সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে হামলার পরেও প্রশাসনের উপর যে চাপ তৈরি করা হয়েছিল, তা ছিল বিশাল।

এই সময়ে ডেরা-বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সমাজকর্মী সুদেশ কুমারী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ফতেহাবাদে জন সংঘর্ষ মঞ্চের উদ্যোগে সাধ্বীর পক্ষে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়। সেই আন্দোলনের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনে থাকা মহিলাদের পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হয়, পুরুষদের মারধর করা হয় এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা করা হয়। বহু প্রতিবাদকারীকে গ্রেফতার করে প্রায় দেড় মাস জেলে রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘হরিয়ানা জনাদেশ টাইমস’ ২০০৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনার খবর প্রথম পাতায় বড় করে প্রকাশ করেছিল। ফলে শুধু সাধ্বীর অভিযোগ নয়, সেই অভিযোগের প্রতিবাদে যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, তাঁদের উপর কী ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল, সেই ছবিও মানুষের সামনে আসে।

এর পাশাপাশি ‘হরিভূমি’ও গুরমিত রাম রহিমের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে খবর প্রকাশ করেছিল। ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় ‘দ্য ট্রিবিউন’ এবং হিন্দির ‘অমর উজালা’ও নিয়মিত ডেরা-বিরোধী খবর এবং সাধ্বীর পক্ষে আন্দোলনের খবর প্রকাশ করেছিল। ধীরে ধীরে ছোট এবং আঞ্চলিক সংবাদপত্রের একটি অংশ ঘটনাটিকে জনসমক্ষে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল।

একটি সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব কি তার পাঠকসংখ্যা, বিজ্ঞাপনের আয় কিংবা টেলিভিশনের দর্শকসংখ্যাই কি সাংবাদিকতার শক্তির একমাত্র মাপকাঠি? গুরমিত রাম রহিমের বিরুদ্ধে প্রাথমিক লড়াইয়ের ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে।

২০০২ সালের সংবাদমাধ্যম আজকের মতো ছিল না। টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমও তখন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে আজকের মতো বড় কর্পোরেট সংস্থার ব্যাপক একত্রীকরণ এবং অধিগ্রহণও ঘটেনি। ‘দৈনিক ভাস্কর’ বা ‘দৈনিক জাগরণ’-এর মতো বড় বড় ব্র্যান্ডও সেই সময় অনেক বেশি স্থানীয় চরিত্র নিয়ে কাজ করত। ফলে স্থানীয় সাংবাদিকদের হাতে কিছুটা হলেও বেশি স্বাধীনতা ছিল।

ডেরা-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সুদেশ কুমারী জানিয়েছিলেন, আন্দোলনকারীরা যখন সিবিআই তদন্তের দাবিতে বিপুল সংখ্যায় স্বাক্ষর সংগ্রহ করছিলেন, তখন সংবাদপত্রগুলি সেই খবর প্রকাশ করত। অর্থাৎ সংবাদপত্রগুলি মানুষের সামনে প্রশ্নকে জিইয়ে রাখত।

এই ধারাবাহিক সংবাদপ্রকাশ শেষ পর্যন্ত বিষয়টিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। দীর্ঘ আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়ার পর ২০১৯ সালে রাম রহিমকে ওই সাংবাদিক হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। যদিও ২০২৬ সালের মার্চে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট সেই মামলায় তাকে খালাস দিয়েছে।

ছত্রপতির মৃত্যুর পর হরিয়ানা প্রেস অ্যাসোসিয়েশনও তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি কে বি পণ্ডিত ঘোষণা করেন, সংগঠনের বিমা প্রকল্প থেকে তাঁর পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। তাঁর ছেলে অংশুলকে সিরসায় একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদদাতা হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছত্রপতির স্মৃতিতে রাজ্যস্তরের সাংবাদিকতা পুরস্কার চালুর কথাও ঘোষণা করা হয়েছিল।

আজকের দিনে সাংবাদিকদের উপর নানা ধরনের চাপের কথা যখন বারবার সামনে আসে, তখন এই ইতিহাস আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ গুরমিত রাম রহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ বিচার আদালত করেছে। কিন্তু সেই বিচারপ্রক্রিয়ার অনেক আগে কয়েকটি ছোট সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল—তারা অভিযোগটিকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছিল। ‘পুরা সচ’, ‘লেখা-জোখা’, ‘হরিয়ানা জনাদেশ টাইমস’-এর মতো সংবাদপত্র এবং ‘হরিভূমি’, ‘দ্য ট্রিবিউন’, ‘অমর উজালা’র মতো আঞ্চলিক ও বড় সংবাদমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রতিবেদন সেই সময়ের ঘটনাকে মানুষের সামনে ধরে রেখেছিল।

প্রসঙ্গত, রাম রহিমের সাম্প্রতিক ২১ দিনের প্যারোল আসলে গত কয়েক বছর ধরে ঘনঘন চলতে থাকা অস্থায়ী মুক্তির একটি ধারাবাহিকতারই অংশ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন যদি বন্দিকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্যারোলের অধিকার দেয়, তাহলে সেই অধিকার অবশ্যই আইনের আওতায় প্রয়োগ করা উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সকল বন্দির ক্ষেত্রে সমান মানদণ্ড প্রয়োগ করা। বিশেষ করে কোনো বন্দি যদি অত্যন্ত প্রভাবশালী হন, তাঁর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত আরও বেশি স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

টোকিওর জিম্বোচো: বইয়ের শহরে পাঠকের খোঁজে

Tokyo book market: কফিহাউজ যেমন কলেজস্ট্রিটের প্রাণকেন্দ্র, তেমনই জিম্বোচোতে রয়েছে একাধিক কিস্‌সাতেন—শান্ত নিঝ্‌ঝুম কফির দোকান। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো কিস্‌সাতেনের নাম সাবোরু।

জার্মানিতে ফের যেভাবে বাড়ছে নাৎসি রাজনীতির ছায়া

AfD Rise in Germany: জার্মানিতেই এখন আবার এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে, যার বক্তব্যে অভিবাসীবিরোধিতা, জাতিগত জাতীয়তাবাদ, ইসলামবিদ্বেষ এবং ‘জার্মান পরিচয়’ রক্ষার নামে বহিষ্কারের রাজনীতি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। দলটির নাম অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি।

পেপার চাই, মান পরে: শিকারি জার্নালের বাজার তৈরি করে কে?

Predatory Journals: ইউজিসি-র ২০১৬ সালের বিধিতে থিসিস জমা দেওয়ার আগে অন্তত একটি রেফার্ড জার্নালে পেপার প্রকাশ বাধ্যতামূলক ছিল। ২০২২ সালে নতুন পিএইচডি বিধি এনে আগের নিয়ম খারিজ করা হয় এবং থিসিস জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশ জুড়ে পেপার প্রকাশের সেই বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবু নিয়ম বদলালেই কি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ‘প্রকাশ করো, নইলে মরো’ (publish or perish) সংস্কৃতি রাতারাতি বদলে যায়?

গাজার মানুষ থাকবে গাজাতেই, স্বাধীন প্যালেস্টাইনের পক্ষে দিল্লি ঘোষণাপত্র

BRICS Delhi Declaration: দিল্লিতে শেষ হওয়া ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাধীন, সার্বভৌম ও কার্যকর প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছে। সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১৯৬৭ সালের সীমারেখা। গাজা ও পশ্চিম তীরকে সেই ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে ধরে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করার কথাও বলা হয়েছে।

ব্রিকস সম্মেলনে ভারত কী পেল, কী পেল না?

BRICS Summit 2026: ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলন থেকে ভারত ঠিক কী পেল? কূটনীতি, বাণিজ্য, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবাদ ও গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ভারতের কতটা লাভ হলো? চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতার মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে ভারত নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারল, আর কোন প্রত্যাশাগুলি পূরণ হলো না?

জেন-জির হাত ধরে যেভাবে বদলে যাচ্ছে রাজনীতির মানচিত্র

Gen Z politics: ‘জেন-জি’ (Gen Z) সমাজমাধ্যমকে শুধু আড্ডা বা ছবি দেওয়ার জায়গা হিসেবে দেখেনি; বরং শাসকের অন্যায়, সামাজিক বৈষম্য আর রাজনৈতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে।

নাগা সন্ন্যাসীরা কি শুধুই ধর্মীয় তপস্বী ছিলেন? ইতিহাস কী বলছে?

History of naga sadhus: প্রয়াগরাজের শাহী স্নানে ছাইমাখা নাগা সন্ন্যাসীরা আজও লক্ষ ভক্তের ভিড়ে প্রথম ডুব দেন। কিন্তু এই জটাজুটের আড়ালে লুকিয়ে আছে রক্তপাত, টাকা, ভূমি-রাজনীতি, দাসত্ব আর সাম্প্রদায়িক হিংসার দীর্ঘ ইতিহাস। অনুপগিরি গোসাঁই থেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কুম্ভমেলা দখল—উইলিয়াম পিঞ্চ ও ধীরেন্দ্র ঝার গবেষণায় উঠে এসেছে, ইতিহাসের সেই অজানা অধ্যায়।

৭.৮% জিডিপি বৃদ্ধি, সত্যিই এতটা ভালো আছে ভারতের অর্থনীতি?

India GDP Growth: সরকারের দাবি অনুযায়ী ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৮%—কিন্তু এই পরিসংখ্যান কতটা বাস্তব? ভিত্তিবর্ষ বদল, নমিনাল ও রিয়াল জিডিপির হিসাব এবং সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা কি নিছক রাজনৈতিক বিতর্ক? চাকরি, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের দুর্বল ছবির সঙ্গে ৭.৮% বৃদ্ধির এই হিসাব কি সত্যিই সামঞ্জস্যপূর্ণ?