দূষণে দিল্লিকে টেক্কা কলকাতার
Kolkata Pollution: ২০২৫-এর শেষ দিক এবং ২০২৬-এর শুরুর দিকের পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। কলকাতার বায়ুদূষণ নিয়ে যে তথ্যগুলো সামনে আসছে, তা রীতিমতো উদ্বেগের। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংলগ্ন মনিটরিং স্টেশনে, AQI প্রায়শই ৪০০ ছুঁইছুঁই, ক্যাটাগরিক্যালি দেখলে যা 'বিপজ্জনক' বা 'খুবই খারাপ' (Very Poor)।
কলকাতা, তিলোত্তমা নগরী। এই শহরের ধমনী যদি হয় তার রাস্তাঘাট, তবে তার ফুসফুস হল 'ময়দান'। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সাদা মার্বেলের আভিজাত্য, ফোর্ট উইলিয়ামের গাম্ভীর্য, আর দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ঘাস—ময়দান মানেই এক টুকরো মুক্তির শ্বাস। কিন্তু আজ সেই মুক্তির শ্বাসই বিষাক্ত। একসময় যে ময়দানকে বলা হতো 'Lungs of the City', আজ তা ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে শহরের অন্যতম বড় 'হেলথ হ্যাজার্ড' বা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
কিছুদিন পর পরই সংবাদের শিরোনাম দখল করে দিল্লির বায়ুদূষণ। আর তাই, দিল্লির দূষণ নিয়ে আমরা সকলেই ভীষণ চিন্তিত। কিন্তু আমাদের মহানগরের কী অবস্থা? ডিসেম্বরের বেশ কিছু দিন কলকাতার দূষণ মাত্রা দিল্লির দূষণকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। ২০২৫-এর শেষ দিক এবং ২০২৬-এর শুরুর দিকের পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। কলকাতার বায়ুদূষণ নিয়ে যে তথ্যগুলো সামনে আসছে, তা রীতিমতো উদ্বেগের। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংলগ্ন মনিটরিং স্টেশনে, AQI প্রায়শই ৪০০ ছুঁইছুঁই, ক্যাটাগরিক্যালি দেখলে যা 'বিপজ্জনক' বা 'খুবই খারাপ' (Very Poor)।
আবার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা বা PM 2.5-এর নিরাপদ মাত্রা যেখানে হওয়া উচিত ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ১৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি কিউবিক মিটার, সেখানে ময়দান চত্বরে তা প্রায়ই ৩০০-৩৫০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
যেখানে কলকাতার মানুষ প্রাণভরে শ্বাস নিতে আসে দূষণের ভিড়ে, সেখানে এটাই আজকের ময়দানের বাস্তব। আজও বহু প্রাতঃভ্রমণকারী ময়দানে এসে বুক ভরে শ্বাস নেন, কিন্তু তাঁরা জানেনই না, তাঁরা অমৃত ভেবে যে শ্বাস নিচ্ছেন, তা আসলে বিষ। এই বাতাসে শ্বাস নেওয়া দিনে ১০-১২ টা সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রাস্তার ধারের ঘাসগুলোর রং আর সেই সতেজ সবুজ নেই। কেমন যেন খয়েরি, ধূসর। পরিবেশবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ব্রাউন ডাস্ট’। ময়দানে শীতের ভোরে যাকে আমরা কুয়াশার চাদর ভাবি, তা আসলে ধূলিকণা আর বিষাক্ত গ্যাসের চাদর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
La Nina Effect: উত্তর ভারতে নভেম্বর থেকেই শীতল প্রবাহ শুরু হয়েছে। এর পিছনের কারণ হলো ‘পোলার ভর্টেক্স’। মেরু অঞ্চলে ঘূর্ণায়মান অত্যন্ত শীতল বাতাসের যে বলয় থাকে, তাকেই পোলার ভর্টেক্স বলা হয়।
কিন্তু কিছুদিন আগেও যে ময়দানকে আমরা দূষিত মহানগরের মধ্যিখানে অবস্থিত এক টুকরো দূষণমুক্ত শ্বাস নেওয়ার জায়গা ভাবতাম, তাহলে তার হঠাৎ কী হলো? কী কারণে দূষণের মাত্রা এতটা বেড়ে গেল?
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে ঘন ধোঁয়াশায় আবছা হয়ে যাওয়া প্রাতঃভ্রমণকারীদের ছবি
এর নেপথ্যে একটি না, রয়েছে একাধিক কারণ—
ময়দানের কাছেই চলছে জোকা-বিবাদী বাগ মেট্রো প্রকল্পের কাজ। আর তাই, সেখানে বিশাল সব ক্রেন, মাটি খোঁড়া, আর খোলা ট্রাকে করে আবর্জনা বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে। পরিবেশকর্মীদের হাজারো বারণ সত্ত্বেও, জল না ছিটিয়েই নির্মাণ কাজ চলছে অনেক সময়। কাজেই সেইসব সূক্ষ্ম ধুলো মিশছে বাতাসে, যা ময়দানের বাতাসকে ভারী করে তুলছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
cop 30: যেসব কর্পোরেশন পৃথিবীর জলবায়ু সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী, তারা একইসঙ্গে জলবায়ু আলোচনার নীতি প্রভাবিত করার সুযোগ পাচ্ছে।
ময়দান মানেই দিগন্তজোড়া ঘাস। কিন্তু বছরের পর বছর মেলা, উৎসব, ফুটবল খেলা, মানুষের পায়ের চাপে অনেক জায়গারই ঘাস মরে গিয়ে মাটি আলগা হয়ে গেছে। ফলে শীতের শুকনো হাওয়ায় আলগা মাটি ধুলো হয়ে বাতাসে উড়ছে। একে বলা হয় ‘রি-সাসপেনশন অফ ডাস্ট’।
ময়দানের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ি পরিবেশবিদদের মতে, ঘোড়ার দৌড়াদৌড়িতে যেমন ধুলো ওড়ে, তেমনই ঘোড়ার শুকিয়ে যাওয়া মলমূত্র বাতাসের সঙ্গে মিশে তৈরি করে বিষাক্ত ‘বায়ো-এরোসল’, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তাছাড়া, ঘোড়ার দৌড়ানোর ফলে মাটি আলগা হয়ে তার ধুলো বাতাসে ওড়ে।
রেড রোড দিয়ে ছুটে চলা বাস আর লরির কালো ধোঁয়া সকালের ভারী বাতাসে উপরে উঠতে পারে না। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘Temperature Inversion’। শীতকালে 'ইনভারশন'-এর ফলে এই ধোঁয়া উপরে উঠতে পারে না, মাটির কাছাকাছি স্তরে আটকে থাকে। ঠিক আমাদের নাকের উচ্চতায়। রেড রোড, হসপিটাল রোড এবং ক্যাজুয়ারিনা অ্যাভিনিউ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে। পুরনো গাড়ির ধোঁয়া, বিশেষ করে ডিজেল চালিত গাড়ির ধোঁয়া সরাসরি ময়দানের বাতাসে মিশছে।
রেড রোড দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে যাওয়া বাস এবং পাশে মেট্রো কনস্ট্রাকশনের ধুলো
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এখনও অনেকেই সকালে শরীরচর্চার জন্য ময়দানে যান। যারা সুস্বাস্থ্যের আশায় ভোরে ময়দানে হাঁটতে যান, তাঁরা যদি এখন ডাক্তারের কাছে গিয়ে ময়দানে মর্নিং ওয়াকের কথা বলেন, তাহলে হয়তো শুনবেন, "আর ভোরবেলা ময়দানে যাবেন না। শরীর ভালো করতে গিয়ে শরীর খারাপ করে আসবেন। হিতে বিপরীত হবে।" শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। শরীরচর্চার সময় আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। ফলে আমরা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বাতাস ফুসফুসে টেনে নিই। আর ময়দানের এই বিষাক্ত বাতাসে বেশি শ্বাস নেওয়া মানেই শরীরে বেশি পরিমাণে বিষের প্রবেশ। সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ দূষিত বাতাস এবং PM 2.5 কণা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে এর মাধ্যমে। এর ফলে, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, এমনকি হার্ট অ্যাটাক, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
কিন্তু এই বায়ুদূষণ ঠেকাতে কী করণীয়?
ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT) এবং কলকাতা হাইকোর্ট একাধিকবার ময়দানের দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সেনাবাহিনী (যাদের অধীনে ময়দান) এবং রাজ্য সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।
মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষকে ধুলো আটকাতে আরও আধুনিক ‘ডাস্ট ব্যারিয়ার’ বা স্প্রিংকলার ব্যবহার করতে হবে এবং তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ১৫ বছরের পুরোনো গাড়িগুলোকে ময়দান চত্বরে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো, ময়দানের হারানো সবুজ ফিরিয়ে আনা। আলগা মাটি ঢাকতে ঘাসের আস্তরণ তৈরি করা আবশ্যিক।
ময়দান শুধু সেনাবাহিনীর সম্পত্তি নয়, ময়দান কেবল এক টুকরো জমি নয়, ভিক্টোরিয়ার সৌন্দর্য নয়—এটি কলকাতার আবেগ।
আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই আর্টিকেলের শিরোনাম পাল্টে লিখতে হবে—"একদা এখানে একটি ময়দান ছিল, যেখানে মানুষ শ্বাস নিত।"






