ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সমঅধিকারের লড়াই, রামধনু মিছিলে ইতিহাসের সুর
LGBTQ+ Community: আমেরিকান শিল্পী গিলবার্ট বেকার সমকামী মানুষের অধিকারের প্রতীক হিসাবে আঁকেন রামধনু পতাকা। ২৫ জুন ১৯৭৮ LGBTQ+ মানুষের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে রামধনু পতাকা প্রথম প্রকাশ পায়। এই পতাকা আশ্রয়, ভরসার প্রতীক হয়ে নিজের স্বভাব, মন, মেজাজ, মর্জি ও মুক্তির প্রকাশ হয়ে রাজপথ দখলের কর্মসূচিতে গোটা পৃথিবীতে জনপ্রিয় সংস্কৃতির চেহারায় হাজির হতে চায়।
উত্তরের কোল ঘেঁষে থাকা পুরানো কলকাতার বনেদি বাড়ির খড়খড়ি ওঠা মলিন জানালা, পেল্লাই ইমারতের পাশ ঘেঁষে যে বড় রাস্তা উত্তর-দক্ষিন কলকাতাকে সেতুর মতো জুড়েছে— সেই রাজপথে মিছিল। কলকাতার রাজপথ বহু মিছিলের সাক্ষী। বিভিন্ন রকম পতাকা, নানাবিধ দাবির উচ্চারণ এই শহরকে থমকে দিয়েছে। ভাবিয়েছে, কাঁদিয়েছে, রাগ-ঘৃণার যজ্ঞ বেদি গড়ে আগুন জ্বলেছে; আবার প্রতিদিনের ব্যস্ত ভিড়ে একাকার হয়ে মিশে গেছে।
২১ ডিসেম্বর ২০২৫, রামধনু পতাকার মিছিল। LGBTQ+ প্রতিনিধিদের বিচিত্র সাজসজ্জার সমারহে বিশাল এক ট্যাবলো নিয়ে রাজপথের দু’পাশের উপস্থিতিকে অবাক করে মর্যাদার দাবি, সমান অধিকারের দাবি, স্বাধীনতার দাবি ও সেই সাথে SIR বিরোধী স্লোগান উচ্চারণে এই মিছিল এগিয়েছে। ইংরেজি ও হিন্দি লিফলেট হাতে হাতে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
এ’দেশের সমাজ-আইন হাত ধরাধরি করে লিঙ্গ ভেদাভেদের তীব্র বিষাক্ত শ্লেষ ছুঁড়ে দিতে চায় চোখের ইশারায়; শব্দ-কথায় বারুদ দেগে তীব্র আক্রামণাত্মক ভঙ্গিতে– তখন আত্মগোপনের কর্মশালা ত্যাগ করে এ’ভাবেই অধিকার প্রতিষ্ঠা উদযাপনে পাগুলি একে একে মিলে যেতে চায়। বাংলা শব্দবন্ধ অনুসারে ভিন্ন যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয়– কিন্নর, মোহিনী, হিজরে-সহ আরও অনেক নাম পরিচয় ঘোষণা করে থাকে। সেই সঙ্গে তাঁদের অধিকারকে জীবনের রাস্তায় প্রতিষ্ঠা করতে এই রামধনু মিছিল। আবার জীবন ও সম্পর্কের ঘোষিত উদযাপনও বটে।
কলকাতা শহরে প্রথম ১৯৯৯ সালে, পার্কসার্কস ময়দানে উদযাপিত রামধনু মিছিলে ১৫ জন পা মিলিয়ে ছিলেন। পরের চার বছর মিছিল বন্ধ থাকলো। এই শহরের দু’ই ভ্রুর মাঝখানে কুঞ্চিত ভাব উপেক্ষা করে পঞ্চাশ জন পা মেলালেন ২০০৩ সালে। তারপর প্রতি বছরে বেড়েছে পায়ে পায়ে সেই সংখ্যা। রক্ষণশীল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকের চোখে নারী-পুরুষের মিলিত শরীর, মনের একত্রিত এই সত্তা– সামাজের বিভিন্ন স্তরে সহজ, স্বাভাবিক ভাবে প্রকাশিত হওয়ার ঘটনাটি নির্দ্ধারিত শালীনতার মাপকাঠি অতিক্রম করে যাওয়া একটি সামাজিক অপরাধ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। তারা (ব্রিটিশ শাসক) আইন করে এলজিবিটিকিউ গোষ্ঠীর সামাজিক উপস্থিতিকে লাগাম দেয়। সেঁটে দেয় অপরাধীর তকমা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Koovagam Koothandavar Temple : কুবগম কুত্থন্দবর মন্দিরের এই উৎসব সমগ্র এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তৃতীয় লিঙ্গের উৎসব। একইসঙ্গে মহাকাব্য, ও তৃতীয় লিঙ্গের একত্র দৈবিক সহবস্থান এই মন্দির।
সামাজিক মর্যাদায় জাত-ধর্ম সমীকরণের বাইরে LGBTQ+ উপস্থিতি এদেশের জলবায়ুতে ছিল স্বাধীনতায়-মর্যাদায়। মহাকাব্য ‘মহাভারত’-এর আখ্যান চরিত্র মোহিনী। প্রাচীন ভারতের পরম্পরা অনুসারে, তাদের শরীরিক-মানসিক উপস্থিতিকে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর কুভাগ্রাম আনুষ্ঠানিক বিবাহের মধ্যে দিয়ে মান্যতা দিয়ে থাকে। এই রীতি হিন্দু ধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে প্রাচীন সাংস্কৃতিক পরম্পরা। প্রকাশ্যে উৎযাপিত উৎসব-আনন্দ-অনুষ্ঠান। চারপাশের গ্রাম থেকে আসা অতিথি-বন্ধু-স্বজনের উপস্থিতিতে আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বৈবাহিক অঙ্গীকারের ঘোষণা। বিবাহের গোটা পর্বটাই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা ‘আরাভান’কে সাক্ষী করে স্বাধীন আত্মপ্রকাশের পক্ষে সাওয়াল করে থাকা।
সেই দেশে ঔপনিবেশিক সম্ভ্রমের ফতোয়া এক নিমিষে অপরাধী করে তোলার কারণে LGBTQ+ স্বাধীন অস্তিত্ব-জীবন-জীবিকা সবটাই রাতারাতি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয়। ঔপনিবেশিক রুচি ও চাহিদার তালিমে অভ্যস্ত হয়ে আমরা এ’দেশের মানুষেরা দ্রুত শিখে নিলাম স্বাধীন এই অস্তিত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কৌশল। ফিসফাসে জানিয়ে দিলাম আগামী প্রজন্মকে– এরা অন্ধকার দুনিয়ার প্রতিনিধি। জোট বেঁধে চলাফেরা করা, উগ্র সাজসজ্জা, নাচ-গানের স্বাভাবিক দক্ষতাকে ভিত্তি করে নবজাতক-জাতিকাদের আশীর্বাদ করাটাই তাদের নির্ধারিত জীবিকা হয়ে দাঁড়ালো। ঠাট্টা-বিদ্রুপে বিদ্ধ হয়ে সংখ্যালঘু অস্তিত্ব নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাটাই যেন তাঁদের একমাত্র ভবিষ্যৎ।
সমাজ ও সংস্কার নির্ধারিত অনুশাসনর বাইরে তাঁদের (LGBTQ+) প্রতিদিনের জীবনে রাস্তায়, হাটে-বাজারে, হাসপাতালে যাতায়াত করাটাই চূড়ান্ত লজ্জার। সমাজিক ভাবে বয়কট হয়ে থাকেন আচার-অনুষ্ঠান, উৎসবে-পার্বণে। সমাজ ও জীবনের প্রতিটি অধ্যায় থেকে বঞ্চিত নিপীড়িত হয়ে সম-লিঙ্গভিত্তিক গোষ্ঠীতে ঠাঁই নিয়ে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল তাঁদের রপ্ত করে নিতে হয়। ছিন্ন হতে হয় তাঁদের অতীত জীবন ও সম্পর্কের আঙ্গিনা থেকে। বলা ভালো, সামাজিক এই নির্বাসন মেনে নিতে এক তরফা বাধ্য থাকতে হয়।
এরই মাঝে সামাজিক ক্ষমতা অথবা রাষ্ট্র শক্তি তাঁদের অপরাধ জগতের সাথে সরাসরি জড়িয়ে নিতে নেপথ্যে কারিগরের ভূমিকা পালন করে থাকে। খুব বেশি দিনের ঘটনা নয়। ভারতের রাজধানী শহর দিল্লির অভিজাত, সম্ভ্রান্ত এলাকা চিত্তরঞ্জন পার্কে সদ্য প্রস্তুত পোশাক বিপনীতে দামি গাড়িতে চড়ে বেশ বড়সড় একটি দল চড়াও হয়। প্রকাশ্যে মন্ত্রী, আমলা, পুলিশ-প্রশাসনের হয়ে বিশাল অঙ্কের তোলা তোলার কাজে একতরফা এই দলগুলি ব্যবহার হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ভয়কে কাজে লাগানো ছাড়াও সামাজিক ভাবে নিগৃহীত করার কাজে আজও তাঁরা কলের পুতুলের মতো ব্যবহৃত হয়ে থাকেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hijra Language Ulti Bhasha: হিজড়েদের এই গোপন ভাষাটি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মুসলিম হিজড়েদের মধ্যে হিজড়া ফারসি এবং হিন্দু হিজড়েদের মধ্যে 'গুপ্তি ভাষা' বা 'উল্টি ভাষা' নামে পরিচিত।
এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে, শারীরিক-মানসিক ভাবে ভিন্ন খাতে বইতে থাকা নারী-পুরুষের এই বন্ধন প্রকৃতিগত ভাবে কতটা শক্তিশালী সেই আন্দাজ বিলক্ষণ টের পেয়েছিলেন ঔপনিবেশিক শাসকরা। ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতিকে কব্জা করতে শক্তির অন্যতম ভারসাম্য (LGBTQ+)-কে সমাজ বিচ্ছিন্ন করে কালি লেপে দিয়ে শাসক তার ক্ষমতাকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা কি করতে চায়নি? নির্ভেজাল ভিক্টোরিয়ান এথিক্সের ফলোয়ার বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো যুক্তিহীন শাসক কিন্তু ব্রিটিশেরা ছিলেন না। সমাজে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ জিইয়ে রাখার কেরামতি যেমন ক্ষমতার মানদন্ডকে নিশ্চিত করে তেমনই LGBTQ+ গোষ্ঠীকে অন্ধাকারে নির্বাসিত করে মানুষের যৌথবদ্ধ থাকার সম্ভাবনাকে হত্যা করতে চায়।
অনিশ্চিত জীবন, মর্যাদাহীন শরীর-মনের ধারাবাহিক নিস্পেষণ ও বঞ্চনার গতি-প্রকৃতি নেশা ও অপরাধ জগতের ফাঁদে আটকে যেতে চায়। সামাজিক নিয়মের অমানবিক পাঁচিলগুলি ভেঙে ফেলার ভিতরে স্বাধীনতার স্বীকৃতি আদায় করার দাবিতে পথ হাঁটতে চায় রামধনু মিছিল। এই মিছিল সতন্ত্র পরিচয়কে উদযাপনের আঙ্গিক হিসাবে বেছে নিতে চেয়েছে। অর্থনীতি-জাত-ধর্মকে উপেক্ষা করে রামধনু মিছিলে পা মেলানো প্রতিটি মানুষের মর্যাদার উপস্থিতি– মাথার উপর রামধনু আশ্রয়ের নিশানা উড়িয়ে দেয়। আমেরিকান শিল্পী গিলবার্ট বেকার সমকামী মানুষের অধিকারের প্রতীক হিসাবে আঁকেন রামধনু পতাকা। ২৫ জুন ১৯৭৮ LGBTQ+ মানুষের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে রামধনু পতাকা প্রথম প্রকাশ পায়। এই পতাকা আশ্রয়, ভরসার প্রতীক হয়ে নিজের স্বভাব, মন, মেজাজ, মর্জি ও মুক্তির প্রকাশ হয়ে রাজপথ দখলের কর্মসূচিতে গোটা পৃথিবীতে জনপ্রিয় সংস্কৃতির চেহারায় হাজির হতে চায়।
সূর্য দিনের শেষ উত্তাপটুকু নিয়ে অন্ধকারে ঢাকা পড়লে ট্যাবলো জুড়ে কৃত্রিম আলোর ফোয়ারা আর ডিজে সাউন্ড সিস্টেমের উত্তেজক গানের উন্মাদনায় সমলিঙ্গের শরীরগুলি প্রকাশ্যে কাছাকাছি পাশাপাশি চলে আসে। তাঁরা তাঁদের হাত-পা উদ্যাম ভাবে ছুঁড়ে দিয়ে কোমড়ের ভাঁজে হাজার সমুদ্রের তুফান তুলে এমন আগলখোলা নাচও যে নাচা যেতে পারে, সেই সাক্ষী করে দিলেন কলকাতার রাজপথকে।
ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে পাক্কা শিকারির মতো তাঁদের শরীরে লেগে থাকা যৌবনের সবটুকু নিলর্জ্জের মতো বন্দি করে নিতে– ক্যামেরা হাতে কি নির্মম লোভের প্রতিযোগিতা। খোলা আকাশের নিচে, প্রকাশ্য রাস্তায় সৃষ্টির চোরাকারবারিরা ক্যামেরা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সীতার অগ্নি পরীক্ষার মতো এই সমাজের মাথাদের কাছে শরীর-মন রাধা ভাবে ঠিক কতটা আচ্ছন্ন সেই প্রমান দিতে ঢালাও নিবেদনের ঝড় ওঠে। প্রশ্ন হলো, এই ঝড়ের ঠিকানা ঠিক কোথায়?
রামধনু মিছিলের উজ্বল রঙ রাজপথের কালো অন্ধকারে কুয়াশায় ভিজে আবছা হয়ে, ধোঁয়া ধুলোর গোলক ধাঁধাঁয় বেবাক মিশে গেলেও– অধিকারের দরাজ দাবির প্রতিধ্বনি নিঝুম ঘুমে আচ্ছন্ন হতে চায় না। তবুও একটা সময়ে রামধনু পতাকার নিচে পাগুলো সময়ের সঙ্গে বিশেষ করে ২০২২-এর পর থেকে কমে আসে। কিন্তু কেন? রামধনু মিছিলের স্লোগান ও চরিত্রকে ক্ষমতার রাজনীতি সূক্ষ্ম মেজাজে আধিপত্যবাদের পপুলার সংস্কৃতির ডাইসে নিজেকে গড়ে নিতে চাইছে কি? যুক্তির চোরা বালি দিয়ে ঢাকতে বহু মিছিলের সাথী ও রামধনু মিছিলের অন্যতম উদ্যোগী অনুরাগ মৈত্রীকে বলতে হয় মণিপুরে আসাম রাইফেলসের ঘাঁটি। সেখানকার সেনাদের দ্বারা বর্বরচিত ভাবে থাংজাম মনোরমার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাটি ঘটে। এর প্রতিবাদে মায়েদের নগ্ন শরীরের প্রতিবাদ আমাদের স্বস্তি দিয়েছিল কি?
অফুরন্ত সময় হাতে থাকলেও অঙ্কের মেধাবী ছাত্র উর্মি এই রামধনু মিছিলে পা মেলাতে রাজি নয়। ছাত্র অবস্থা থেকে শহর ও মফস্বলের বহু মিছিলে অধিকারের দাবি নিয়ে পা মিলিয়ে স্লোগান তুলে থাকা উর্মি কিন্তু রামধনু মিছিলের পপুলার আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির একতরফা মেজাজে স্বস্তি হারায়, ভরসা হারায়। সেইসঙ্গে গলায় ক্ষোভের স্বর বেড়ে ওঠে। তাঁদের অধিকার আন্দোলনের রাজনীতি রামধনু পতাকা হয়ে নীল আকাশের উচ্চতায় মিশে গিয়ে মিছিল হতে চেয়েছিল। সেখানে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকা উত্তেজক গান-নাচের চোরা স্রোতে রামধনু মিছিল ভেসে পড়তে চায়– তখন ট্রাফিক কন্ট্রোলে থাকা শীতের শহরের সমানে মরীচিকার প্রহেলিকা। পিছনে ফুটপাতের উনুন থেকে ফুটে ওঠা দুধ চায়ের জমাট বাষ্পে আটকে থাকা ফ্যাকাশে জীবন মলিন রঙ চটা চাদরটাকে টেনে নিয়ে আরও একবার শেষ বেলার শহরটাকে দেখে নিতে চায়।








