দক্ষিণ ভারতের যে মন্দিরে দেবতাকে বিবাহ করে তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের মানুষেরা

Koovagam Koothandavar Temple : কুবগম কুত্থন্দবর মন্দিরের এই উৎসব সমগ্র এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তৃতীয় লিঙ্গের উৎসব। একইসঙ্গে মহাকাব্য, ও তৃতীয় লিঙ্গের একত্র দৈবিক সহবস্থান এই মন্দির।

inscript
৩ মিনিট
দক্ষিণ ভারতের যে মন্দিরে দেবতাকে বিবাহ করে তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের মানুষেরা

তামিলনাড়ুর কাল্লাকুরিচি জেলার উলুন্দরপেট্টাই তালুকে অবস্থিত কুবগম কুত্থন্দবর মন্দিরটির (Koovagam Koothandavar Temple) নানা গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বাস, পরিচয় এবং মিথের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই মন্দির। মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র অর্জুনের পুত্র হলেন আরাভান। এই আরাভানকে 'কুত্থন্দবর' নামেও পূজা করা হয়ে থাকে। অর্জুন-পুত্র আরাভানের প্রতি উৎসর্গীকৃত কুত্থন্দবর মন্দিরে চৈত্র মাসে আঠারো দিনের জন্য এক বার্ষিক উৎসব পালিত হয়। এই উৎসব তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ!

আসলে, এই উৎসবের মূলে রয়েছে মহাভারতের এক মর্মস্পর্শী কাহিনি। আরাভান, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের বিজয় নিশ্চিত করতে দেবী কালীর কাছে স্বেচ্ছায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। আত্মত্যাগের আগে, তিনি একটি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন– তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল একদিনের জন্য বিবাহিত জীবনের স্বাদ গ্রহণ করা। যেহেতু এই ধরনের আত্মত্যাগের জন্য কোনো নারী আরাভানকে বিবাহ করতে রাজি ছিলেন না, তাই তখন শ্রীকৃষ্ণ মোহিনীরূপ ধারণ করে আরাভানকে একদিনের জন্য বিবাহ করেন। পুরুষের নারীরূপ ধারণ এবং ভালোবেসে আরাভানেক বিবাহ করার উদাহরণটি কুত্থন্দবর উৎসবের মূল অনুপ্রেরণা এবং আচারের কেন্দ্রবিন্দু!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন আজও অস্বীকৃত সমলিঙ্গ বিবাহ? ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে প্রান্তিকদের লড়াই?  

Same Sex Marraige in India: অসমবয়সী বিবাহ বলি কি? নিদেনপক্ষে নারী-পুরুষ বিবাহ কথাটি কি কোথাও আলাদা করে উল্লিখিত হয়? তাহলে কেন 'সমকামী বিবাহ' শব্দবন্ধের প্রয়োজন রয়ে গেল আমাদের সমাজে?

কুবগম কুত্থন্দবর মন্দির

কুবগমের বার্ষিক এই উৎসবটি বিশেষভাবে তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ ভারতে তৃতীয় ভারতের মানুষেরা 'আরাভানি' বা 'থিরুনাঙ্গাই' নামে পরিচিত। শ্রীকৃষ্ণের আরাভানের জন্য লিঙ্গ পরিবর্তন এবং মোহিনীরূপ ধারণ, দক্ষিণ ভারতের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিজেদের সঙ্গে লৌকিক মিথের একটি সংযোগের সূত্র দেয়। ফলে, তাঁদের কাছে এই মন্দির ও মন্দিরকে ঘিরে উৎসবটির বিশেষ মাহাত্ম রয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোন আচরণ সঠিক কোনটা ভুল ঠিক করে দেবে কে?

Rights of LGBTQ: নারীর 'পুরুষালি' আচরণ এবং কোনও পুরুষের 'মেয়েলি' স্বভাব তো আজকের নয়। সভ্যতার আদিকাল থেকেই রয়েছে। তাহলে তা বৃহত্তর সমাজ আজও মেনে নিতে পারল না কেন?

বিধবা-পোশাকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা

কুত্থন্দবর মন্দিরের উৎসবের ১৪ তম দিনে একটি অভিনব ঘটনার সাক্ষী হন উৎসবের দর্শনার্থীরা। ওই দিন, তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের মানুষেরা মোহিনীরূপে সেজে, এক অপূর্ব ভঙ্গিমায় মন্দিরে সমবেত হন এবং প্রতীকীভাবে ভগবান কুত্থন্দবরকে বিবাহ করেন। এই বিবাহপ্রথা আসলে, মহাভারতে আরাভান ও মোহিনীর সেই পবিত্র মিলনকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়। এবং ঠিক এর পরের দিন, উৎসবের সুর বিষাদে ভরে যায়। সেদিন তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের অন্তর্গত মানুষেরা আরাভানের মৃত্যুতে শোক পালন করেন। সেই শোক পালনের দৃশ্যটি এত জীবন্ত যে তা দেখতে পাওয়া এক অভিজ্ঞতা! তারা সাদা শাড়ি পরে, মঙ্গলসূত্র খুলে, চুড়ি ভেঙে শোক প্রকাশ করতে থাকেন। বৈধব্যের নানান চিহ্নগুলি ব্যবহার করে এই প্রথা এক অর্থে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের এক মানবিক স্বীকৃতি দেয়। যে-সমাজ তাঁদের নারীমনকে অস্বীকার করেছে, তাচ্ছিল্য করেছে, অপমান করেছে, সেই নারীমনই সমাজের তথাকথিত পুরুষদের ছেড়ে বিবাহ করছে এক দেবতাকে। এই বিবাহের মধ্যে যেমন একটা আত্মস্বীকৃতি রয়েছে, তেমনই বৈধব্যের নিয়ম পালনেও রয়েছে অস্তিত্বের আরেক স্বীকৃতি!

শুধু তাই নয়, এই উৎসবে চলতে থাকে, নানান সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যকলাপ। রূপচর্চা ও সংগীতের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাও থাকে এখানে। খুব জরুরি একটি পদক্ষেপ এই উৎসব বিগত বেশ কিছু বছর ধরে নিয়ে আসছে, তা হল, এখানে উৎসব চলাকালীন তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায়ের মানুষদের অধিকার ও তাঁদের স্বাস্থ্য-বিষয়ক নানা রকমের সেমিনারের ব্যবস্থা করা হয়।

কুবগম কুত্থন্দবর মন্দিরের এই উৎসব সমগ্র এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তৃতীয় লিঙ্গের উৎসব। একইসঙ্গে মহাকাব্য, ও তৃতীয় লিঙ্গের একত্র দৈবিক সহবস্থান এই মন্দির। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সমাজ অবজ্ঞার চোখে দেখলেও, ভারতের মতো দেশে যখন তা পূজার উৎসবে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ-সম্পর্কে বোধের উদয় হয়। এবং এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, এই উৎসব নিজেদের স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের এক বিশেষ দেবতা-মঞ্চ উপহার দিয়েছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।